কফিতে দুধ মেশালে শরীরে কী হয়, জানুন বিশেষজ্ঞদের মত
-3b3c4b-720x405.webp)
সকাল বেলা এক কাপ গরম কফি না পেলে অনেকেরই দিন শুরু হতে চায় না। কেউ পছন্দ করেন কড়া লাল কফি বা ব্ল্যাক কফি, আবার কারও পছন্দ একটু দুধ-চিনি মেশানো দুধ কফি। তবে মাঝেমধ্যেই একটি বিতর্ক কানে আসে, কফিতে দুধ মিশিয়ে খাওয়া কি শরীরের জন্য ভালো নাকি ক্ষতিকর?
অনেকে মনে করেন দুধ কফি খেলে ওজন বাড়ে বা হজমে সমস্যা হয়। আবার অনেকের দাবি, ব্ল্যাক কফির চেয়ে দুধ কফি পেটের জন্য বেশি আরামদায়ক। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিভিন্ন গবেষণার আলোকে চলুন জেনে নেওয়া যাক দুধ দিয়ে কফি খাওয়ার অভ্যাসটি আসলে আপনার স্বাস্থ্যের জন্য কেমন।
কফিতে দুধ মেশানোর উপকারিতা
এসিডিটি এবং পেটের জ্বালাপোড়া কমায়
ব্ল্যাক কফিতে ক্যাফেইন ও এসিডের পরিমাণ বেশি থাকে, যা অনেক সময় খালি পেটে খেলে পেটে গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটি তৈরি করতে পারে। কফিতে দুধ মেশালে দুধের অ্যালকালাইন উপাদান কফির অম্লতা বা এসিডিক প্রভাবকে অনেকটাই প্রশমিত করে। ফলে যাদের কফি খেলে পেটে অস্বস্তি বা এসিডিটি হয়, তাদের জন্য দুধ কফি বেশ উপকারী।
শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন দূর করে
সম্প্রতি ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একটি চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছেন। কফিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা পলিফেনল, আর দুধে রয়েছে প্রোটিন। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন পলিফেনল এবং প্রোটিনের অ্যামিনো এসিড একসঙ্গে মিশে যায়, তখন তা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে এটি শরীরের ভেতরের নানা রকম প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন দূর করতে সাহায্য করে।
পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি পায়
শুধু ব্ল্যাক কফিতে শক্তি পাওয়া গেলেও কোনো বিশেষ পুষ্টি থাকে না। কিন্তু কফির সঙ্গে দুধ যোগ করলে তাতে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন বি১২ যোগ হয়। যারা হাড় শক্তিশালী রাখতে চান, তাদের জন্য দুধ কফি অতিরিক্ত পুষ্টি জোগাতে পারে।
সন্ধ্যায় ঘুমের ব্যাঘাত কমায়
ক্যাফেইন আমাদের মস্তিষ্কে উদ্দীপনা তৈরি করে ঘুম দূর করে। ব্ল্যাক কফির প্রভাব শরীরে দীর্ঘ সময় থাকে। বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে দুধ কফি খেলে ক্যাফেইনের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে, যা রাতের ঘুমে খুব বেশি বিঘ্ন ঘটায় না।
কখন দুধ দিয়ে কফি খাওয়া সমস্যা হতে পারে
দুধ দিয়ে কফি খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনি কী পরিমাণ দুধ, চিনি ও কফি ব্যবহার করছেন।
এক কাপ কফিতে বেশি পরিমাণ চিনি, সিরাপ, ক্রিম বা অন্যান্য মিষ্টি উপাদান যোগ করলে ক্যালরি দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। ফলে নিয়মিত এমন কফি পান করলে ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। কফির স্বাস্থ্যগত প্রভাবও শুধু কফির ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে কী যোগ করা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে দুধ দিয়ে কফি খেলে পেট ফাঁপা, গ্যাস বা পেটের অস্বস্তি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ল্যাকটোজমুক্ত দুধ বা অন্য বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ ছাড়া বেশি ক্যাফেইন খেলে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে। তাই শুধু দুধ মেশানো হয়েছে বলে কফি যত খুশি খাওয়া নিরাপদ হয়ে যায় না।
দুধ কফির ক্ষতিকর দিক
সব কিছুরই যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি কিছু সতর্কতা মেনে চলাও জরুরি। দুধ দিয়ে কফি খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন-
ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা: আপনি যদি কফিতে ফুল-ফ্যাট দুধ এবং অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার করেন, তবে তা আপনার প্রতিদিনের ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। যারা ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য চিনি ও অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত দুধ কফি ক্ষতিকর হতে পারে।
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বা হজমের সমস্যা: যাদের দুধ বা ডেইরি খাবারে অ্যালার্জি আছে অর্থাৎ ল্যাকটোজ হজম হয় না, তাদের দুধ কফি খেলে পেট ফাপা, গ্যাস বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে সাধারণ দুধের বদলে সয়া মিল্ক বা অ্যালমন্ড মিল্ক ব্যবহার করা যেতে পারে।
তাহলে দুধ দিয়ে কফি খাবেন, নাকি ব্ল্যাক কফি?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরিমিত কফি সাধারণত খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। দুধ যোগ করলে কফিতে প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম যুক্ত হয়, তবে একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি ও ক্রিম যোগ করলে পানীয়টির ক্যালরিও বাড়ে।
আবার ব্ল্যাক কফি খেলেই যে তা সবার জন্য বেশি উপকারী হবে, এমনটাও বলা যায় না। দুধ কফির কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণার ফল এখনো মিশ্র।
তাই কফি খাওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো পরিমাণ এবং কীভাবে কফি তৈরি করছেন। কম চিনি দিয়ে পরিমিত দুধ মিশিয়ে কফি খেলে অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য এটি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে অ্যাসিডিটি, ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বা ক্যাফেইনে সংবেদনশীলতা থাকলে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী কফির পরিমাণ কমানো বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আপনার জন্য কোনটি সেরা
ব্ল্যাক কফি বেছে নেবেন যখন: আপনার লক্ষ্য ওজন কমানো, কাজের তীব্র মনোযোগ ধরে রাখা বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা।
দুধ কফি বেছে নেবেন যখন: আপনার এসিডিটির সমস্যা আছে, সন্ধ্যায় কফি খেতে ভালোবাসেন অথবা কফির পাশাপাশি শরীরকে কিছুটা প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম দিতে চান।
দুধ দিয়ে কফি খাওয়া কোনো ক্ষতিকর অভ্যাস নয়, বরং সঠিক উপায়ে খেলে এটি স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী হতে পারে। তবে কফি বানানোর সময় চিনির পরিমাণ কমিয়ে রাখা এবং লো-ফ্যাট দুধ ব্যবহার করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের শরীরের সহ্যক্ষমতা বুঝে কফি উপভোগ করুন।
সূত্র: হেলথলাইন ও টাইমস অব ইন্ডিয়া


