চুল পড়া বাড়তে পারে শরীরে যেসব ভিটামিন ও পুষ্টির অভাবে
-171f7f-720x405.webp)
চিরুনিতে আগের চেয়ে বেশি চুল উঠছে, গোসলের সময় হাতে একগুচ্ছ চুল চলে আসছে কিংবা মাথার চুল ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যাচ্ছে। এমন সমস্যা নিয়ে অনেকেই প্রথমে নতুন শ্যাম্পু, তেল বা হেয়ার সিরামের খোঁজ করেন। কিন্তু চুল পড়ার কারণ সবসময় বাইরে থেকে ব্যবহার করা কোনো পণ্য নয়। শরীরের ভেতরে প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টির ঘাটতিও চুল পড়া বাড়িয়ে দিতে পারে।
চুলের বৃদ্ধি স্বাভাবিক রাখতে শরীরের পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক এবং কিছু ভিটামিন প্রয়োজন। আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজির (American Academy of Dermatology বা AAD) তথ্য অনুযায়ী, খাবারে আয়রন, জিঙ্ক, প্রোটিন বা বায়োটিনের ঘাটতি থাকলে চোখে পড়ার মতো চুল পড়তে পারে।
তবে শুধু চুল পড়ছে বলেই কোনো নির্দিষ্ট ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। চুল পড়ার পেছনে বংশগত কারণ, হরমোনের পরিবর্তন, থাইরয়েডের সমস্যা, মানসিক চাপ, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন রোগও থাকতে পারে।
আয়রনের ঘাটতি
চুল পড়ার সঙ্গে আয়রনের ঘাটতির সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে সমস্যা হতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে চুল পড়া বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যাদের মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, যারা খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন পান না বা যাদের শরীরে আয়রন শোষণে সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঘাটতির ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
আয়রনের ঘাটতি আছে কি না তা বোঝার জন্য চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করতে পারেন। ফ্যারিটিন পরীক্ষা শরীরে জমা থাকা আয়রনের একটি ধারণা দিতে পারে।
আয়রনের ঘাটতি থাকলে খাবারের তালিকায় মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শাকসবজি ও অন্যান্য আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। তবে পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা না পড়লে নিজের ইচ্ছায় বেশি মাত্রায় আয়রনের ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
ভিটামিন ডি কম থাকলেও কি চুল পড়তে পারে?
ভিটামিন ডি শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রয়োজন। চুলের ফলিকলের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গেও এই ভিটামিনের সম্পর্ক রয়েছে।
কিছু গবেষণায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এবং চুল পড়ার বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও ভিটামিন ডি, আয়রন ও জিঙ্কসহ বিভিন্ন পুষ্টির সঙ্গে চুলের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে সব গবেষণার ফল এক নয়।
তাই চুল পড়লেই ভিটামিন ডি-এর ট্যাবলেট শুরু করার বদলে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করানো ভালো।
জিঙ্কের ঘাটতি
জিঙ্ক শরীরের কোষের বৃদ্ধি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক কাজে ভূমিকা রাখে। চুলের ফলিকলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কার্যক্রমের জন্যও এটি প্রয়োজন।
আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজি বলছে, খাবারে পর্যাপ্ত জিঙ্ক না থাকলে লক্ষণীয় চুল পড়া হতে পারে।
মাংস, মাছ, ডিম, দুধ ও বিভিন্ন বাদাম এবং বীজে জিঙ্ক পাওয়া যায়। তবে জিঙ্কের ঘাটতি না থাকলে বেশি মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
বায়োটিনের ঘাটতি
বায়োটিন বা ভিটামিন বি৭ নিয়ে চুলের যত্নের পণ্যে অনেক প্রচার দেখা যায়। তবে সত্যিকারের বায়োটিনের ঘাটতি তুলনামূলকভাবে বিরল।
তবু শরীরে বায়োটিনের ঘাটতি হলে চুল পাতলা হওয়া বা চুল পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজি বায়োটিনের ঘাটতিকেও চুল পড়ার সম্ভাব্য পুষ্টিগত কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘাটতি না থাকলে অতিরিক্ত বায়োটিন খেলে চুল পড়া বন্ধ হবে এমন প্রমাণ নেই। বরং বেশি মাত্রার কিছু সাপ্লিমেন্ট শরীরের ক্ষতিও করতে পারে।
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি
ভিটামিন বি১২ শরীরে রক্তকণিকা তৈরি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে এর ঘাটতি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চুল পাতলা হওয়ার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষ করে যারা প্রাণিজ খাবার খুব কম খান, তাদের খাবারে বি১২-এর পর্যাপ্ত উৎস আছে কি না সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু চুল পড়ার ওপর ভিত্তি করে বি১২-এর ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করে ঘাটতি আছে কি না দেখা যেতে পারে।
শুধু ভিটামিন নয়, প্রোটিনের ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ
চুলের প্রধান উপাদান কেরাটিন, যা এক ধরনের প্রোটিন। তাই শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
খুব কম ক্যালরি খাওয়া, কঠোর ডায়েট করা বা দ্রুত ওজন কমানোর সময় অনেকের খাবারে প্রোটিনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টির পরিমাণ কমে যায়। আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজিও পর্যাপ্ত প্রোটিন না পাওয়াকে চুল পড়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল, ছোলা, মসুর ডাল, সয়াবিন ও বিভিন্ন বাদাম থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়।
চুল পড়া মানেই কি পুষ্টির ঘাটতি?
না। এটি মনে রাখা খুব জরুরি।
চুল পড়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। বংশগত চুল পড়া, হরমোনের পরিবর্তন, থাইরয়েডের সমস্যা, মানসিক চাপ, অসুস্থতার পর অতিরিক্ত চুল ঝরা, সন্তান জন্মের পরের পরিবর্তন এবং কিছু ওষুধের প্রভাবেও চুল পড়তে পারে।
তাই শুধু ভিটামিন খেয়ে চুল পড়া বন্ধ করার চেষ্টা করলে প্রকৃত কারণটি আড়ালে থেকে যেতে পারে।
স্ট্রেসেও বাড়তে পারে চুল পড়া
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত চাপের পর অনেকের চুল একসঙ্গে বেশি ঝরতে শুরু করে। এই ধরনের চুল পড়াকে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম বলা হয়।
সাম্প্রতিক ভারতীয় একটি স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে পুষ্টির ঘাটতির পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সমস্যা ও চুলের যত্নের কিছু অভ্যাসকেও চুল পড়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ চুল পড়া কমাতে শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না। ঘুম, মানসিক চাপ এবং সামগ্রিক জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।
কখন রক্ত পরীক্ষা করানো দরকার?
চুল পড়া কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে বা ক্রমশ বেড়ে গেলে কারণ খুঁজে বের করা ভালো। বিশেষ করে চুলের ঘনত্ব দ্রুত কমে গেলে, মাথার নির্দিষ্ট অংশ ফাঁকা হতে শুরু করলে বা চুল পড়ার সঙ্গে ক্লান্তি, দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা দিতে পারেন। যেমন আয়রনের মজুত বোঝার জন্য ফ্যারিটিন, রক্তস্বল্পতা বোঝার জন্য সিবিসি, ভিটামিন বি১২ বা ভিটামিন ডি পরীক্ষা করা হতে পারে। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন হবে তা ব্যক্তির বয়স, খাদ্যাভ্যাস, উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
নিজের ইচ্ছায় হেয়ার সাপ্লিমেন্ট খাবেন?
চুল পড়া শুরু হলেই বাজারে পাওয়া হেয়ার ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়।
আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজি সতর্ক করেছে, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিছু পুষ্টি গ্রহণ করলেও উল্টো চুল পড়া বাড়তে পারে। তাই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে শরীরে সত্যিই কোনো পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না জানা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে আয়রন বা অন্যান্য খনিজের বেশি মাত্রা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট নেওয়াই নিরাপদ।
চুল ভালো রাখতে খাবারের তালিকায় কী রাখবেন?
চুলের জন্য আলাদা কোনো জাদুকরি খাবার নেই। বরং প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন ডিম, মাছ, মাংস, দুধ ও দুধজাত খাবার, ডাল ও ছোলা, শাকসবজি, বিভিন্ন ধরনের বাদাম ও বীজ, ফল এবং শস্যজাতীয় খাবার।
সুষম খাবারের মাধ্যমে শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক ও বিভিন্ন ভিটামিন পেতে পারে। সাম্প্রতিক একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও খাদ্য ও পুষ্টির সঙ্গে চুলের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যদিও সব পুষ্টির ক্ষেত্রে প্রমাণের শক্তি এক নয়।
চুল পড়া বেড়ে গেলে শুধু নতুন শ্যাম্পু বা তেলের দিকে নজর না দিয়ে শরীরের ভেতরের কারণগুলোর কথাও ভাবা দরকার। আয়রন, জিঙ্ক, প্রোটিন, বায়োটিন এবং কিছু ভিটামিনের ঘাটতি চুল পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে সব চুল পড়ার কারণ পুষ্টির ঘাটতি নয়। তাই নিজের ইচ্ছায় ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু না করে দীর্ঘদিনের বা অতিরিক্ত চুল পড়ার ক্ষেত্রে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ঘাটতি শনাক্ত করে তারপর চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
সূত্র: এনডিটিভি