খাবারের ওপর কাঁচা লবণ ছিটিয়ে খান, নীরবে বাড়তে পারে যে ঝুঁকি

গরম ভাতের সঙ্গে একটু কাঁচা লবণ। অনেকের খাবারের শুরুতেই এই অভ্যাস। ভাতের সঙ্গে কাঁচা লবণ, কাঁচা মরিচ কিংবা পেঁয়াজের এই স্বাদ বাঙালির খাবারের সঙ্গে বহুদিনের পরিচিত। কিন্তু স্বাদের জন্য খাবারের ওপর আলাদা করে লবণ ছিটিয়ে খাওয়ার অভ্যাসটি নিয়মিত হলে শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম ঢুকে যেতে পারে।
বিষয়টি শুধু কাঁচা লবণের ক্ষেত্রে নয়। রান্নার সময় দেওয়া লবণ, খাবারের ওপর পরে যোগ করা লবণ এবং প্যাকেটজাত খাবারের সোডিয়াম, সব মিলিয়েই দিনের মোট সোডিয়াম গ্রহণ হিসাব করতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ২ হাজার মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম, অর্থাৎ ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয়।
কাঁচা লবণ কি রান্নার লবণের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর?
কাঁচা লবণ আর রান্না করা লবণের মধ্যে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যে রান্নার তাপে লবণের গঠন বদলে গিয়ে সেটি শরীরের জন্য নিরাপদ হয়ে যায়, আর কাঁচা লবণ সরাসরি রক্তে গিয়ে মেশে।

আসল উদ্বেগ হলো খাবারে অতিরিক্ত লবণ যোগ করা। রান্নায় যতটা লবণ দেওয়া হয়েছে, তার ওপর আবার কাঁচা লবণ যোগ করলে দিনের মোট সোডিয়াম গ্রহণ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।
খাবারে আলাদা করে লবণ যোগ করার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির কী সম্পর্ক?
এই বিষয়ে বহুল আলোচিত একটি গবেষণা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংকের ৫ লাখের বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে। গবেষণায় ৫ লাখ ১ হাজার ৩৭৯ জন অংশগ্রহণকারীর খাবারে আলাদা করে লবণ যোগ করার অভ্যাস সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়। প্রায় ৯ বছর অনুসরণের পর ১৮ হাজার ৪৭৪টি অকালমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
গবেষণায় যারা খাবারে কখনো বা খুব কম লবণ যোগ করতেন, তাদের তুলনায় যারা সব সময় খাবারে অতিরিক্ত লবণ যোগ করতেন, তাদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি পরিসংখ্যানগতভাবে ২৮ শতাংশ বেশি ছিল। তবে এটিকে এমনভাবে বলা যাবে না যে কাঁচা লবণ খেলেই একজন মানুষের মৃত্যুঝুঁকি ২৮ শতাংশ বেড়ে যাবে। এটি ছিল একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা এবং খাবারে লবণ যোগ করার অভ্যাস ও অকালমৃত্যুর মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ গবেষণার ফলকে কারণ ও ফলাফলের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
বেশি লবণ খেলে রক্তচাপ বাড়তে পারে
অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রভাবগুলোর একটি হলো রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া। সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখার পরিমাণ বাড়াতে পারে। এর ফলে রক্তনালির ওপর চাপ বাড়ে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের খাবারের ওপর আলাদা করে লবণ ছিটিয়ে খাওয়ার অভ্যাস বিশেষভাবে কমানো দরকার।
কিডনির ওপরও বাড়তি চাপ পড়তে পারে
শরীরে সোডিয়াম ও পানির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে কিডনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নিয়মিত অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, আর দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে কিডনি রোগের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।
তবে কাঁচা লবণ খেলেই কিডনি নষ্ট হয়ে যাবে, এমন কথা বলা ঠিক নয়। ঝুঁকিটি মূলত দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ এবং এর ফলে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
হার্টের ওপর কী প্রভাব পড়ে
বেশি সোডিয়াম গ্রহণের ফলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপ আবার হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
এ ছাড়া খাবারে আলাদা করে লবণ যোগ করার অভ্যাস নিয়ে করা আরেকটি গবেষণায় হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে।
দিনে কতটা লবণ খাওয়া উচিত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত। এর মধ্যে রান্নায় ব্যবহৃত লবণ, খাবারের সঙ্গে আলাদা করে যোগ করা লবণ এবং অন্যান্য খাবার থেকে পাওয়া সোডিয়ামও অন্তর্ভুক্ত। ৫ গ্রাম লবণ মোটামুটি এক চা-চামচের সমান।
তাই শুধু খাবার টেবিলে কাঁচা লবণ কমালেই হবে না। চিপস, চানাচুর, আচার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সস, প্যাকেটজাত খাবার ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকেও সোডিয়াম শরীরে ঢুকতে পারে।
গরম ভাতে কাঁচা লবণ খাওয়ার অভ্যাস কীভাবে কমাবেন?
হঠাৎ করে খাবার থেকে লবণ একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ধীরে ধীরে খাবারের ওপর আলাদা করে লবণ যোগ করার অভ্যাস কমানো যায়।
প্রথম দিকে ভাত বা তরকারি একটু কম নোনতা মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুদিন পর জিহ্বা কম নোনতা স্বাদের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। খাবারের স্বাদ বাড়াতে কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, লেবু বা বিভিন্ন মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রান্নায় কতটা লবণ দেওয়া হচ্ছে এবং খাবারের সঙ্গে পরে আর কতটা লবণ যোগ করা হচ্ছে, দুটো বিষয়ই খেয়াল রাখা।
যাদের আরও বেশি সতর্ক থাকা দরকার
উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা কিডনি রোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সোডিয়াম গ্রহণের বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন থাকা প্রয়োজন। তবে প্রত্যেকের প্রয়োজন এক নয়। চিকিৎসক যদি নির্দিষ্ট পরিমাণে সোডিয়াম বা লবণ সীমিত করতে বলেন, সেই পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
নিজে থেকে লবণ পুরোপুরি বাদ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। সোডিয়াম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। সমস্যা তৈরি হয় মূলত অতিরিক্ত গ্রহণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই সোডিয়াম একেবারে বাদ দেওয়ার কথা নয়, বরং দৈনিক গ্রহণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেয়।
গরম ভাতে একটু কাঁচা লবণ মেখে খাওয়া নিজে থেকেই কোনো বিষক্রিয়া তৈরি করে না। কিন্তু নিয়মিত খাবারের ওপর অতিরিক্ত লবণ যোগ করার অভ্যাসে দিনের মোট সোডিয়াম গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন বেশি সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
তাই কাঁচা লবণ একেবারে বিষ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিদিনের মোট লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা। খাবারে আলাদা করে লবণ দেওয়ার অভ্যাস কমানো সেই লক্ষ্য পূরণের একটি সহজ উপায়।
সূত্র: টিভি ৯ বাংলা
