Advertisement

২০ মিনিটের একটি কাজেই কমাতে পারবেন উদ্বেগ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
২০ মিনিটের একটি কাজেই কমাতে পারবেন উদ্বেগ
ছবি : সংগৃহীত

দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা কিংবা মন খারাপ হলে অনেকেই ঘরে বসে থাকতে চান। কিন্তু তখন হয়তো সবচেয়ে সহজ যে কাজটি করা যায়, সেটিই হতে পারে কিছুক্ষণ হাঁটা।

Advertisement

হাঁটার জন্য জিমে যেতে হয় না, দামি কোনো সরঞ্জামও লাগে না। শুধু আরামদায়ক পোশাক পরে বাইরে বেরিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটলেই হয়। আর গবেষণাও বলছে, নিয়মিত হাঁটা শুধু শরীরের জন্য নয়, মনের জন্যও উপকারী হতে পারে।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২০ মিনিটের হাঁটাও মনকে কিছুটা শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বোঝা দরকার। একদিন ২০ মিনিট হাঁটলেই উদ্বেগের সমস্যা পুরোপুরি চলে যাবে, এমন নয়। বরং নিয়মিত হাঁটা মানসিক চাপ ও উদ্বেগের উপসর্গ কমানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে।

হাঁটলে উদ্বেগ কমে কেন?

উদ্বেগের সময় শরীর অনেকটা বিপদের মধ্যে থাকা অবস্থার মতো আচরণ করে। হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যেতে পারে, শরীর টানটান লাগে, মাথায় নানা চিন্তা ঘুরতে থাকে। মন যেন কোনোভাবেই থামতে চায় না।

হাঁটা শরীরকে নড়াচড়া করার সুযোগ দেয়। এর ফলে শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং মস্তিষ্কেও বিভিন্ন ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম মস্তিষ্কের এমন কিছু রাসায়নিকের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে, যা মেজাজ ও মানসিক স্বস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ ছাড়া হাঁটার সময় মন অনেক সময় একই চিন্তার মধ্যে আটকে না থেকে চারপাশের পরিবেশ, রাস্তা, মানুষ, গাছপালা বা নিজের চলাফেরার দিকে মনোযোগ দেয়। এতে কিছু সময়ের জন্য উদ্বেগ তৈরি করা চিন্তার চক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

হাঁটা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। ৭৫টি গবেষণা এবং ৮ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে করা একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা একেবারেই শরীরচর্চা করতেন না, তাদের তুলনায় হাঁটতেন এমন মানুষের উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কম ছিল।

গবেষণায় হাঁটার সময়, স্থান ও ধরনও বিবেচনা করা হয়েছিল। একা হাঁটা, দলবদ্ধভাবে হাঁটা, ঘরের ভেতরে হাঁটা কিংবা বাইরে হাঁটা, বিভিন্ন ধরনের হাঁটার সঙ্গেই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে গবেষকেরা এটাও বলেছেন, হাঁটার কতটা সময়, কী গতিতে এবং কত দিন ধরে হাঁটলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

২০ মিনিট হাঁটলেই কি উদ্বেগ কমে যাবে?

এখানে একটু সাবধান হওয়া দরকার।

২০ মিনিট হাঁটা ভালো একটি শুরু হতে পারে। কিন্তু এটিকে উদ্বেগ কমানোর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চার সময় ও উদ্বেগের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২১ থেকে ৪০ মিনিটের শরীরচর্চার সঙ্গে উদ্বেগের উপসর্গ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ২০ মিনিট বা তার কম সময়ের শরীরচর্চা নিয়ে প্রমাণ তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।

অর্থাৎ ২০ মিনিট হাঁটা অবশ্যই উপকারী অভ্যাস হতে পারে, কিন্তু শুধু ২০ মিনিট হাঁটলেই সবার উদ্বেগ কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

নিয়মিত হাঁটা একদিনের হাঁটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ

ধরুন, আপনি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে একদিন ২০ মিনিট হাঁটলেন। কিছুটা ভালো লাগতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণাগুলোতে নিয়মিত হাঁটার সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাই একদিন অনেকক্ষণ হাঁটার চেয়ে প্রতিদিন বা সপ্তাহের বেশির ভাগ দিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটার অভ্যাস করা বেশি বাস্তবসম্মত।

দ্রুত হাঁটবেন, নাকি ধীরে?

খুব ধীরে হাঁটলেও উপকার হতে পারে। তবে শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী একটু দ্রুত গতিতে হাঁটলে শরীরচর্চার মাত্রা বাড়ে।

এমন গতিতে হাঁটতে পারেন, যাতে হাঁটার সময় কথা বলা সম্ভব হয়, কিন্তু একটানা গান গাওয়ার মতো স্বাচ্ছন্দ্য না থাকে। এটিকে মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রমের একটি সহজ উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়।

তবে যারা দীর্ঘদিন শরীরচর্চা করেননি, তাদের প্রথম দিন থেকেই দ্রুত হাঁটার প্রয়োজন নেই। ধীরে শুরু করে সময় ও গতি ধীরে ধীরে বাড়ানো ভালো।

বাইরে হাঁটলে কি বেশি ভালো?

বাইরে হাঁটার আলাদা একটি সুবিধা থাকতে পারে। বিশেষ করে গাছপালা, খোলা জায়গা বা সবুজ পরিবেশের মধ্যে হাঁটা মনকে আরও শান্ত করতে পারে।

একটি ছোট গবেষণায় সবুজ পরিবেশে হাঁটার পর উদ্বেগ কমার মাত্রা শহুরে পরিবেশে হাঁটার তুলনায় বেশি দেখা গিয়েছিল।

তবে এর মানে এই নয় যে পার্ক ছাড়া হাঁটলে কোনো উপকার হবে না। বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে ঘরের ভেতরে, ছাদে বা নিরাপদ অন্য কোনো জায়গাতেও হাঁটা যেতে পারে।

৭৫টি গবেষণার বিশ্লেষণেও ঘরের ভেতর ও বাইরে বিভিন্ন ধরনের হাঁটার সঙ্গে উদ্বেগ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

হাঁটার সময় ফোন ব্যবহার না করাই ভালো?

হাঁটার সময় ফোনে ব্যস্ত থাকলে হাঁটার মানসিক উপকারের একটি অংশ নষ্ট হতে পারে। কারণ তখন মন চারপাশের পরিবেশ বা নিজের অনুভূতির দিকে না থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বার্তা বা ভিডিওর দিকে আটকে থাকে।

সম্ভব হলে কিছু সময় ফোন পকেটে রেখে হাঁটতে পারেন। চারপাশের গাছপালা দেখুন, বাতাস অনুভব করুন, নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে খেয়াল করুন।

এতে হাঁটা শুধু শরীরচর্চা নয়, মনকে কিছুটা বিরতি দেওয়ার সময়ও হয়ে উঠতে পারে।

হাঁটার সময় নিজের সঙ্গে কথা বলা কি কাজে দেয়?

অনেকের ক্ষেত্রে হাঁটার সময় চিন্তা গোছানো সহজ হয়। ঘরে বসে একই বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করার বদলে হাঁটতে হাঁটতে সমস্যাটিকে একটু দূর থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।

কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তিত থাকলে হাঁটার সময় নিজের চিন্তাগুলো সাজিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

তবে উদ্বেগের সময় ইচ্ছা করে একই নেতিবাচক চিন্তা বারবার ভাবলে উল্টো অস্থিরতা বাড়তে পারে। তাই হাঁটার সময় চারপাশের দিকে মন দেওয়া, ধীরে শ্বাস নেওয়া কিংবা মনকে অন্য কোনো নিরপেক্ষ বিষয়ে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা ভালো।

হাঁটা কি ওষুধের বিকল্প?

না।

হাঁটা মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু কারও যদি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র উদ্বেগ থাকে, ঘুম নষ্ট হয়, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয় বা আতঙ্কের মতো সমস্যা দেখা দেয়, শুধু হাঁটার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাতেও উদ্বেগজনিত সমস্যায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরিকল্পিত শরীরচর্চা বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। তবে এর প্রমাণের মান সীমিত এবং শরীরচর্চাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়নি।

প্রয়োজনে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

হাঁটার আরও কিছু উপকার আছে

উদ্বেগ কমানোর পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা শরীরের জন্যও উপকারী। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

এ ছাড়া নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। কয়েক মিলিয়ন মানুষের তথ্য নিয়ে করা সাম্প্রতিক একটি বড় গবেষণায় অবসর সময়ে করা শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ হাঁটা এমন একটি অভ্যাস, যার উপকার শুধু শরীরের একটি অংশে সীমাবদ্ধ নয়।

কীভাবে হাঁটার অভ্যাস শুরু করবেন?

অনেকেই হাঁটা শুরু করার কথা ভাবেন, কিন্তু প্রথম কয়েক দিন পর আর চালিয়ে যেতে পারেন না। এর একটি কারণ হলো শুরুতেই নিজের ওপর বেশি চাপ দেওয়া।

আপনি চাইলে খুব সহজভাবে শুরু করতে পারেন।

প্রথম কয়েক দিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটুন। স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে সময় বাড়িয়ে ২০ মিনিট করুন। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সময় বাড়ানো যায়।

সকালে, বিকেলে কিংবা রাতে, যখন সময় পাওয়া যায় তখন হাঁটতে পারেন। তবে নিরাপদ জায়গা বেছে নেওয়া জরুরি।

একসঙ্গে ২০ মিনিট সময় বের করা কঠিন হলে ১০ মিনিট করে দুইবার হাঁটাও করা যায়।

হাঁটার সময় কী মনে রাখবেন?

হাঁটার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখলে অভ্যাসটি আরও সহজ হতে পারে।

  • আরামদায়ক জুতা পরুন
  • খুব বেশি খালি পেটে বা খুব ভারী খাবার খাওয়ার পর হাঁটবেন না
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন
  • নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে হাঁটবেন না
  • হাঁটার সময় শরীরে অস্বাভাবিক ব্যথা, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে থেমে যান
  • প্রতিদিন একই সময়ে হাঁটতে পারলে অভ্যাস তৈরি করা সহজ হয়
  • সম্ভব হলে এমন জায়গায় হাঁটুন যেখানে কিছুটা সবুজ পরিবেশ রয়েছে

উদ্বেগ কমানোর জন্য সব সময় জটিল কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো নিয়মিত কিছু সহজ অভ্যাসও অনেকটা সাহায্য করতে পারে। হাঁটা তার মধ্যে অন্যতম।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটার সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কমার সম্পর্ক রয়েছে।

তবে ২০ মিনিট হাঁটাকে কোনো জাদুকরী সমাধান ভাবার কারণ নেই। কারও ক্ষেত্রে হাঁটার পরই মন কিছুটা ভালো লাগতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে নিয়মিত কয়েক সপ্তাহ হাঁটার পর পরিবর্তন বোঝা যেতে পারে।

তাই মন অস্থির লাগলে একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ফোনটা কিছু সময়ের জন্য পাশে রেখে জুতা পরে বাইরে বেরিয়ে পড়ুন। ধীরে ধীরে হাঁটুন। চারপাশ দেখুন। নিজের শ্বাসের দিকে খেয়াল করুন।

হয়তো সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে হবে না। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য মনকে সেই চিন্তার জায়গা থেকে সরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর নিয়মিত করলে সেই ছোট হাঁটাই হয়ে উঠতে পারে নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার একটি সহজ অভ্যাস।

সূত্র: এনডিটিভি