logo
Advertisement

সাদা চিনি নাকি গুড়, ওজন কমাতে কোনটি ভালো

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
সাদা চিনি নাকি গুড়, ওজন কমাতে কোনটি ভালো
সত্যিই কি চিনির বদ্রল গুড় ওজন কমাতে সাহায্য করে? ছবি: এনডিটিভি

চা, দুধ বা মিষ্টি খাবারে সাদা চিনির বদলে গুড় ব্যবহার করছেন অনেকে। কারণ গুড়কে তুলনামূলক প্রাকৃতিক এবং স্বাস্থ্যকর মিষ্টি হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন এমন অনেকেই মনে করেন, সাদা চিনির বদলে গুড় খেলে বাড়তি ওজন কমানো সহজ হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি গুড় ওজন কমাতে সাহায্য করে? নাকি সাদা চিনির বদলে গুড় খাওয়াটা শুধু একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়া, যার সঙ্গে ওজন কমার সরাসরি সম্পর্ক নেই?

সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুড় বা জাগরি সাদা চিনির তুলনায় কিছু পুষ্টি উপাদান ধরে রাখে। তবে একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট যে গুড় নিজে ওজন কমানোর কোনো বিশেষ খাবার নয়। বরং দুটিই ক্যালরি ও চিনি যোগ করে।

গুড় কীভাবে তৈরি হয়?

গুড় সাধারণত আখের রস বা খেজুরসহ বিভিন্ন তালজাতীয় গাছের রস ঘন করে তৈরি করা হয়। সাদা চিনির মতো এটি দীর্ঘ পরিশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় না। ফলে গুড়ে কিছু খনিজ উপাদান থেকে যেতে পারে।

মূল প্রতিবেদনে ১০০ গ্রাম গুড়ে প্রায় ৩৮৩ ক্যালরি এবং ৯৮ থেকে ৯৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে সামান্য পরিমাণে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাসও থাকতে পারে। তবে গুড়ের পুষ্টিগুণের পরিমাণ উৎপাদনের উৎস ও প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

অন্যদিকে সাদা চিনি মূলত সুক্রোজ। পরিশোধনের কারণে এতে গুড়ের মতো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খনিজ থাকে না।

গুড় ও সাদা চিনির ক্যালরি কি একই?

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মূল প্রতিবেদনে প্রতি ১০০ গ্রাম গুড়ে প্রায় ৩৮৩ ক্যালরি এবং সাদা চিনিতে প্রায় ৩৮৭ ক্যালরি থাকার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ক্যালরির পার্থক্য খুবই সামান্য।

তাই সাদা চিনির বদলে একই পরিমাণ গুড় খেলেই ক্যালরি গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই।

ধরুন, প্রতিদিন চায়ে দুই চামচ চিনি খাওয়ার বদলে দুই চামচ গুড় খাওয়া শুরু করলেন। গুড় তুলনামূলক কম পরিশোধিত হলেও শুধু এই পরিবর্তনের কারণে শরীরের ওজন কমতে শুরু করবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ওজন কমানোর মূল বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদে শরীর যত ক্যালরি ব্যবহার করে, তার তুলনায় খাবার থেকে মোট ক্যালরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা। গুড় এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। মূল প্রতিবেদনেও গুড় খেলে সরাসরি ওজন কমার কোনো ক্লিনিক্যাল প্রমাণ নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে গুড় কি সাদা চিনির চেয়ে ভালো?

কিছু দিক থেকে গুড়ের সামান্য পুষ্টিগত সুবিধা রয়েছে। এতে সাদা চিনির তুলনায় কিছু খনিজ উপাদান থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে গুড়কে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে ইচ্ছেমতো খাওয়া যাবে।

গুড়ে আয়রন, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো কিছু খনিজ থাকতে পারে। কিন্তু এসব পুষ্টি পাওয়ার জন্য বেশি পরিমাণ গুড় খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং আয়রন বা অন্য কোনো পুষ্টির ঘাটতি থাকলে সেই ঘাটতি পূরণের জন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার খাওয়াই বেশি কার্যকর।

অর্থাৎ সাদা চিনির তুলনায় গুড় কিছুটা কম পরিশোধিত এবং কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ধরে রাখতে পারে। কিন্তু এই সুবিধা গুড়কে ওজন কমানোর খাবারে পরিণত করে না।

গুড় খেলেও রক্তে শর্করা বাড়তে পারে

গুড়কে অনেক সময় সাদা চিনির চেয়ে নিরাপদ মিষ্টি হিসেবে ভাবা হয়। কিন্তু গুড়েও প্রচুর চিনি রয়েছে। ফলে এটি খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে।

গুড়ের শর্করা সাদা চিনির তুলনায় শরীরে কীভাবে এবং কত দ্রুত প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাই গুড়কে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের উপযোগী বিশেষ মিষ্টি হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও গুড়কে চিনির বিকল্প হিসেবে সীমাহীনভাবে খাওয়া নিরাপদ নয়। মূল প্রতিবেদনে গুড় খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।


ওজন কমাতে চাইলে কতটা গুড় খাবেন?

এখানে শুধু গুড়ের পরিমাণ নয়, দিনের মোট চিনি গ্রহণের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের খাদ্যে ফ্রি সুগারের পরিমাণ মোট দৈনিক শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দেয়। আরও কমিয়ে ৫ শতাংশের নিচে আনতে পারলে বাড়তি স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

২০০০ ক্যালরির খাদ্যতালিকার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হলো প্রায় ৫০ গ্রাম ফ্রি সুগার। তবে এটি শুধু চা বা কফিতে দেওয়া গুড়ের হিসাব নয়। মিষ্টি, মিষ্টিজাতীয় খাবার, মিষ্টি পানীয়, প্যাকেটজাত খাবারসহ দিনের অন্যান্য উৎস থেকেও চিনি গ্রহণ হতে পারে।

তাই প্রতিদিন চায়ে গুড় খাচ্ছেন, আবার মিষ্টি, কোমল পানীয় ও অন্যান্য মিষ্টি খাবারও খাচ্ছেন, তাহলে শুধু সাদা চিনি বাদ দেওয়ার মাধ্যমে চিনি গ্রহণ কমবে না।

ওজন কমাতে গুড়ের চেয়ে কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

ওজন কমানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর না করে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

চিনি ও মিষ্টি কমান

চা, কফি, শরবত, মিষ্টি, কেক, বিস্কুট বা মিষ্টি পানীয় থেকে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাদা চিনির বদলে গুড় ব্যবহার করলেও যদি মোট চিনি গ্রহণ একই থাকে, তাহলে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ফলকে মিষ্টির বিকল্প করুন

মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা হলে পরিমাণমতো তাজা ফল খাওয়া যেতে পারে। ফলে প্রাকৃতিক মিষ্টির পাশাপাশি ফাইবার, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি পাওয়া যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত ফল ও সবজি রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।

খাবারে ফাইবার বাড়ান

শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজের মতো খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। এগুলো পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে এবং সামগ্রিকভাবে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

শুধু ক্যালরি নয়, খাবারের মানও দেখুন

ওজন কমাতে গিয়ে শুধু কম খাওয়ার দিকে নজর দিলে হবে না। পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশনাতেও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার, ফল ও সবজি এবং খাদ্যতালিকায় ফাইবার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন

শুধু খাবার পরিবর্তন নয়, নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তাও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শরীরের শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো ওজন নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাহলে সাদা চিনি বাদ দিয়ে গুড় খাবেন?

খেতে চাইলে পরিমিত পরিমাণে গুড় ব্যবহার করা যেতে পারে। সাদা চিনির তুলনায় গুড়ে কিছু খনিজ উপাদান থাকায় পুষ্টিগতভাবে সামান্য সুবিধা রয়েছে। তবে গুড়কে ওজন কমানোর উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গুড়ও মিষ্টি এবং এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি ও ক্যালরি থাকে। তাই সাদা চিনির বদলে গুড় খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু গুড় বেশি খাওয়ার যুক্তি হিসেবে এটিকে স্বাস্থ্যকর বা ওজন কমানোর খাবার ভাবা ঠিক হবে না।

ওজন কমানোর লক্ষ্য থাকলে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মোট ক্যালরি গ্রহণের দিকে নজর দেওয়া, অতিরিক্ত মিষ্টি ও মিষ্টি পানীয় কমানো, পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা।

সোজা কথা, সাদা চিনির তুলনায় গুড় কিছুটা বেশি পুষ্টি ধরে রাখতে পারে, কিন্তু ওজন কমানোর ক্ষেত্রে দুটির মধ্যে এমন কোনো জাদুকরী পার্থক্য নেই যে গুড় খেলেই ওজন কমবে। পরিমাণই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: এনডিটিভি