গ্রিন টি থেকে উপকার পেতে এই ৮ ভুল অভ্যাস বদলান

ওজন কমানো থেকে শুরু করে শরীর সুস্থ রাখা, গ্রিন টি নিয়ে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অনেকে নিয়মিত চা বা কফির বদলে গ্রিন টি পান করেন। এতে ক্যাফেইন ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে, আর পরিমিত পরিমাণে পান করা বেশির ভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাধারণত নিরাপদ।
তবে গ্রিন টি মানেই যত বেশি, তত বেশি উপকার, এমনটা নয়। কখন খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন, খাবারের সঙ্গে কীভাবে খাচ্ছেন এবং গ্রিন টি সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করছেন কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অতিরিক্ত পরিমাণে বা ঘন গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অতিরিক্ত গ্রিন টি পান করা
গ্রিন টিতে ক্যাফেইন থাকে। তাই একের পর এক কাপ গ্রিন টি পান করলে অতিরিক্ত ক্যাফেইনের কারণে অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা বা পেটের অস্বস্তির মতো সমস্যা হতে পারে।
কতটা ক্যাফেইন সহ্য করা যায়, তা ব্যক্তি ভেদে আলাদা। তাই গ্রিন টি পান করার পর অস্বস্তি হলে পরিমাণ কমানো ভালো। শুধু স্বাস্থ্যকর মনে হচ্ছে বলে অতিরিক্ত পান করার প্রয়োজন নেই।
খাবারের সঙ্গে গ্রিন টি পান করা
গ্রিন টি বা অন্য চায়ের কিছু উপাদান খাবার থেকে আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে পাওয়া non-heme iron-এর ক্ষেত্রে এই প্রভাব দেখা যায়।
একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, আয়রনযুক্ত খাবারের সঙ্গে একই সময়ে চা পান করলে আয়রন শোষণ কমেছিল। খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা পর চা পান করলে এই বাধা কিছুটা কমে।
তাই যাদের আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতার সমস্যা রয়েছে, তাদের খাবারের সঙ্গে গ্রিন টি পান না করাই ভালো। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার ও চায়ের সময়ের মধ্যে বিরতি রাখা যেতে পারে।
খালি পেটে গ্রিন টি খাওয়ার অভ্যাস
অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে গ্রিন টি পান করেন। কিন্তু সবার শরীর এটি একইভাবে গ্রহণ করে না। ক্যাফেইন ও চায়ের অন্যান্য উপাদান কিছু মানুষের পেটে অস্বস্তি বা বমিভাব তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে গ্রিন টি খেয়ে যদি পেটে জ্বালা, অস্বস্তি বা বমিভাব হয়, তাহলে খালি পেটে না খেয়ে হালকা খাবারের পরে পান করে দেখতে পারেন।
তবে খালি পেটে গ্রিন টি খেলেই সবার ক্ষতি হবে, এমন শক্ত প্রমাণ নেই। বিষয়টি ব্যক্তির সহনশীলতার ওপরও নির্ভর করে।
রাতে ঘুমানোর আগে গ্রিন টি পান করা
গ্রিন টিতে ক্যাফেইন থাকায় রাতে ঘুমানোর আগে পান করলে কিছু মানুষের ঘুমে সমস্যা হতে পারে। যাদের ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তাই রাতে ঘুমাতে সমস্যা হলে বিকেল বা সন্ধ্যার পর গ্রিন টি পান করার অভ্যাসটি কমিয়ে দেখা যেতে পারে।
গ্রিন টি দিয়ে ওষুধ খাওয়া
গ্রিন টি সব ওষুধের সঙ্গে সমস্যা তৈরি করে, এমন নয়। তবে কিছু ওষুধের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া হতে পারে।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ মাত্রায় গ্রিন টি পান করলে nadolol নামের একটি beta-blocker ওষুধের রক্তে মাত্রা কমতে পারে। গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট atorvastatin এবং raloxifene-এর সঙ্গেও মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। আরও কিছু ওষুধের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য interaction রয়েছে।
তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে বিশেষ করে গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
গ্রিন টি সাপ্লিমেন্টকে সাধারণ চায়ের মতো ভাবা
এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। এক কাপ brewed green tea এবং ঘন green tea extract supplement এক জিনিস নয়।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (NCCIH) জানিয়েছে, সাধারণভাবে পানীয় হিসেবে গ্রিন টি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু ঘন গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্টের ক্ষেত্রে বমিভাব, পেটের অস্বস্তি এবং বিরল ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষতির মতো সমস্যা দেখা গেছে।
তাই ওজন কমানোর আশায় নিজের ইচ্ছায় বেশি মাত্রার গ্রিন টি ক্যাপসুল বা এক্সট্র্যাক্ট নেওয়া উচিত নয়।
ওজন কমানোর শর্টকাট হিসেবে গ্রিন টি ব্যবহার করা
গ্রিন টি খেলেই দ্রুত ওজন কমে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। গ্রিন টির catechin ও caffeine শরীরের ওজনের ওপর সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। তবে এই প্রভাব সীমিত এবং ব্যক্তি ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
তাই ওজন কমাতে গ্রিন টির ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সামগ্রিক জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিন টি মানেই সব রোগের সমাধান ভাবা
গ্রিন টি নিয়ে হৃদ্রোগ, ক্যানসার, ওজন কমানোসহ নানা স্বাস্থ্য উপকারের দাবি রয়েছে। কিন্তু সব দাবির পক্ষে সমান শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ বলছে, গ্রিন টি বা এর এক্সট্র্যাক্ট বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে এখনো অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তাই কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গ্রিন টি ব্যবহার করা ঠিক নয়।
তাহলে কীভাবে গ্রিন টি খাবেন?
গ্রিন টি খাওয়ার সবচেয়ে সহজ নিয়ম হলো এটিকে একটি সাধারণ পানীয় হিসেবেই দেখা। পরিমিত পরিমাণে পান করুন এবং অতিরিক্ত চিনি যোগ না করাই ভালো। আয়রনের ঘাটতি থাকলে খাবারের সঙ্গে না খেয়ে সময়ের ব্যবধান রাখুন। রাতে ঘুমের সমস্যা হলে দিনের আগের দিকে পান করুন।
আর গ্রিন টি সাপ্লিমেন্ট বা এক্সট্র্যাক্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকুন। আপনি নিয়মিত ওষুধ খেলে, গর্ভবতী হলে বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করা ভালো। গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি থেকে পাওয়া ক্যাফেইনের পরিমাণও মোট দৈনিক ক্যাফেইন গ্রহণের মধ্যে হিসাব করা প্রয়োজন।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, গ্রিন টি কোনো জাদুকরী স্বাস্থ্যকর পানীয় নয়। আবার পরিমিত গ্রিন টি পান করাও সাধারণভাবে ক্ষতিকর নয়। সমস্যা বেশি হয় যখন এটিকে অতিরিক্ত পরিমাণে পান করা হয়, ওষুধের সঙ্গে ব্যবহারের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয় বা ঘন এক্সট্র্যাক্টকে সাধারণ চায়ের মতো মনে করা হয়।
সূত্র: সামা নিউজ
