logo
Advertisement

এই ৫ ধরনের মানুষের জন্য জাম্বুরা হতে পারে ঝুঁকির কারণ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এই ৫ ধরনের মানুষের জন্য জাম্বুরা হতে পারে ঝুঁকির কারণ
জাম্বুরা। ছবি: যুগান্তর

জাম্বুরা আমাদের দেশে বেশ পরিচিত একটি টক-মিষ্টি ফল। রসালো এই ফলে ভিটামিন সি, পানি, খাদ্যআঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সাধারণভাবে পরিমিত পরিমাণে জাম্বুরা খাওয়া বেশির ভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ফল খাওয়ার আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।

বিশেষ করে যারা নিয়মিত কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ খান, কিডনির সমস্যায় ভুগছেন বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ওষুধ সেবন করছেন, তাদের জন্য জাম্বুরা সব সময় নিরাপদ নাও হতে পারে। কারণ জাম্বুরার কিছু উপাদান শরীরে ওষুধ শোষণ ও ভাঙার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।

জাম্বুরা খাওয়ার কী কী উপকার?

জাম্বুরা শুধু স্বাদে ভালো নয়, এতে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। বিশেষ করে ভিটামিন সি, পানি ও খাদ্যআঁশের উৎস হিসেবে এই ফল খাবারের তালিকায় রাখা যেতে পারে।

ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস: জাম্বুরায় ভিটামিন সি রয়েছে। এই ভিটামিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া শরীরে কোলাজেন তৈরিতেও ভিটামিন সি প্রয়োজন হয়। কোলাজেন ত্বক, রক্তনালি, হাড় ও বিভিন্ন টিস্যুর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শরীরে পানির ঘাটতি পূরণে সহায়ক: জাম্বুরার একটি বড় অংশই পানি। তাই গরমের দিনে বা শরীরে পানির চাহিদা বেশি থাকলে অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি রসালো ফল হিসেবে জাম্বুরা খাওয়া যেতে পারে। তবে শরীরের পানির চাহিদা পূরণে পানির বিকল্প হিসেবে শুধু ফলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে: জাম্বুরায় ভিটামিন সি ছাড়াও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে। এসব উপাদানের কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর অণুর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

হজমের জন্য উপকারী হতে পারে: জাম্বুরায় খাদ্যআঁশ রয়েছে। পর্যাপ্ত খাদ্যআঁশ নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে এবং হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে জাম্বুরা খেলেই সবার হজমের সমস্যা দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ছবি: হেল্থ
ছবি: হেল্থ

ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে: জাম্বুরায় পানির পরিমাণ বেশি এবং এতে তুলনামূলকভাবে কম ক্যালরি থাকে। তাই অতিরিক্ত মিষ্টি বা বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে গোটা জাম্বুরা খাওয়া স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে শুধু জাম্বুরা খেলেই ওজন কমে না। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য সুষম খাবার ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও প্রয়োজন।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে: ফল ও শাকসবজিসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। জাম্বুরাও এমন খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে শুধু জাম্বুরা খেলেই হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ হবে বা রক্তের কোলেস্টেরল কমে যাবে, এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

যাদের জন্য জাম্বুরা বিপজ্জনক

জাম্বুরা পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল হলেও সবার শরীরের জন্য এর প্রভাব এক রকম নয়। বিশেষ কিছু শারীরিক সমস্যা থাকলে বা নিয়মিত নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ খেলে এই ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে। তাই জাম্বুরা খাওয়ার আগে জেনে নেওয়া জরুরি, কারা এই ফল থেকে দূরে থাকবেন এবং কারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এটি খাবেন। চলুন জেনে নিই কারা এ ফল খাওয়ার আগে সতর্ক থাকবেন।


যারা নিয়মিত কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ খান

জাম্বুরা খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা হলো ওষুধের সঙ্গে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, জাম্বুরার কিছু উপাদান অন্ত্রে থাকা একটি বিশেষ এনজাইমের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এই এনজাইম অনেক ওষুধ শরীরে ভাঙতে সাহায্য করে। ফলে কোনো কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে রক্তে ওষুধের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের কার্যকারিতাও পরিবর্তিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন জানিয়েছে, জাম্বুরার সঙ্গে একই ধরনের ফলের মধ্যে থাকা কিছু উপাদান নির্দিষ্ট ওষুধের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে কিছু কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ব্যবহৃত ওষুধ, কিছু উদ্বেগ কমানোর ওষুধ, হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দের সমস্যা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ এবং কিছু অ্যালার্জির ওষুধ রয়েছে।

তাই নিয়মিত ওষুধ খেলে নিজের ইচ্ছায় জাম্বুরা খাওয়া শুরু বা বন্ধ না করে চিকিৎসক কিংবা ওষুধ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা ভালো।


অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে যাদের

কিডনি বা অন্য কোনো অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর রোগীদের দীর্ঘদিন কিছু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ খেতে হয়। এসব ওষুধের মাত্রা শরীরে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় জাম্বুরা এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ব্যবহৃত সাইক্লোস্পোরিন ও ট্যাক্রোলিমাসের মতো ওষুধের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় জাম্বুরা খাওয়ার পর ট্যাক্রোলিমাসের রক্তের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশনও কিডনি প্রতিস্থাপনের পর জাম্বুরা ও জাম্বুরার রস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। তাই অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা ব্যক্তিদের জাম্বুরা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কিডনির রোগ আছে যাদের

কিডনির দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলেই যে জাম্বুরা একেবারেই খাওয়া যাবে না, এমন নয়। তবে কিডনির রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি থাকলে খাবারের মাধ্যমে পটাশিয়াম গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করতে হতে পারে।

কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের ফলের মধ্যে পটাশিয়ামের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। কিডনির রোগী কতটা ফল খাবেন, তা তার রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা, ওষুধ এবং কিডনির কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে পারে।

তাই কিডনির রোগ থাকলে নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে জাম্বুরা খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

যাদের ওষুধের সঙ্গে জাম্বুরার প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে

অনেক সময় ওষুধের প্যাকেট বা চিকিৎসকের নির্দেশনায় জাম্বুরা এড়িয়ে চলতে বলা হয়। এমন হলে জাম্বুরাকে পুরোপুরি নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, জাম্বুরার মতো কিছু ফলও নির্দিষ্ট ওষুধের সঙ্গে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তাই কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে জাম্বুরা বা একই ধরনের ফল এড়িয়ে চলার নির্দেশনা থাকলে তা মেনে চলা উচিত।

ওষুধের সঙ্গে জাম্বুরার প্রতিক্রিয়া হবে কি না, তা ওষুধের ধরন ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই চিকিৎসক বা ওষুধ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ছবি: ইউটিউব থেকে নেওয়া
ছবি: ইউটিউব থেকে নেওয়া

যাদের জাম্বুরা খেলে অ্যালার্জির লক্ষণ হয়

যে কোনো খাবারের মতো জাম্বুরাতেও কারও কারও অ্যালার্জি হতে পারে। জাম্বুরা খাওয়ার পর বারবার মুখ, ঠোঁট বা গলায় চুলকানি, শরীরে ফুসকুড়ি, ঠোঁট বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হলে আর না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শ্বাসকষ্ট, গলা ফুলে যাওয়া বা দ্রুত গুরুতর অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

গ্যাস্ট্রিক বা অম্লতা থাকলে

জাম্বুরা টকজাতীয় ফল হওয়ায় কারও কারও ক্ষেত্রে এটি খাওয়ার পর বুকজ্বালা বা অম্লতার উপসর্গ বাড়তে পারে। তবে শুধু গ্যাস্ট্রিক বা অম্লতা রয়েছে বলেই সবার জন্য জাম্বুরা নিষিদ্ধ, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।

জাম্বুরা খাওয়ার পর যদি নিয়মিত বুকজ্বালা, টক ঢেকুর বা পেটের অস্বস্তি বাড়ে, তাহলে পরিমাণ কমিয়ে নিজের উপসর্গ লক্ষ্য করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

তাহলে কি সুস্থ মানুষ জাম্বুরা খেতে পারবেন?

হ্যাঁ। কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা বা ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা না থাকলে সাধারণভাবে পরিমিত পরিমাণে জাম্বুরা খাওয়া যায়।

তবে নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাবার ও ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ব্যবহৃত কিছু ওষুধ সেবন করলে চিকিৎসক বা ওষুধ বিশেষজ্ঞকে জাম্বুরা খাওয়ার বিষয়টি জানানো উচিত।

জাম্বুরা পুষ্টিকর ফল হলেও সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ সেবনকারী, অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা ব্যক্তি এবং কিডনির সমস্যায় আক্রান্তদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

কোন ওষুধের সঙ্গে জাম্বুরার প্রতিক্রিয়া হবে, তা শুধু ওষুধের নামের ওপর নির্ভর করে না। ওষুধের মাত্রা, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা এবং একই সঙ্গে ব্যবহৃত অন্য ওষুধও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওষুধের নাম না জেনে জাম্বুরাকে একেবারে নিরাপদ বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কোনোটিই ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ওষুধের নির্দেশনা দেখুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা ওষুধ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সূত্র: ইউএস এফডিএ, ইউএস এফডিএ, ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশন, পাবমেড, পিএমসি, এনসিবিআই বুকশেলফ