ঘুম থেকে উঠেই মাথা ঘোরে, লুকিয়ে থাকতে পারে ৫ স্বাস্থ্য সমস্যা

সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানোর অনুভূতি অনেকের কাছেই পরিচিত একটি সমস্যা। কখনও এটি সাময়িক ও নিরীহ হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরে থাকা কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
মাথা ঘোরা বলতে অনেক ধরনের অনুভূতি বোঝায়। কারও মনে হতে পারে তিনি হালকা হয়ে যাচ্ছেন, কারও কাছে মনে হতে পারে চারপাশ ঘুরছে, আবার কেউ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারেন।
যদি মাঝে মাঝে এমন হয়, তাহলে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে নিয়মিত ঘুম থেকে উঠে মাথা ঘুরলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
চলুন ঘুম থেকে উঠেই মাথা ঘোরানোর কিছু কারণ জেনে নিই।
রাতে শরীরে পানিশূন্যতা হওয়া
ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা সকালে মাথা ঘোরার অন্যতম সাধারণ কারণ। দিনে পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, গরম পরিবেশে ঘুমানো, অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করা বা ডায়রিয়া ও বমির মতো সমস্যার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
পানিশূন্যতার অন্যান্য লক্ষণ-
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা
- ক্লান্তি
- মাথাব্যথা
- মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া
এ ছাড়া কিছু ওষুধ এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণও শরীর থেকে বেশি পানি বের করে দিতে পারে।
নিম্ন রক্তচাপ
রক্তচাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম হলে সকালে বিছানা থেকে ওঠার সময় মাথা ঘুরতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ সাময়িকভাবে কমে যায়। একে পোস্টুরাল বা অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন বলা হয়।
এর লক্ষণগুলো হলো-
- মাথা ঘোরা
- চোখ ঝাপসা দেখা
- হালকা লাগা
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি
এই সমস্যা এড়াতে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে ওঠা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া
সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথা ঘোরা কখনও কখনও রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে যারা ইনসুলিন ব্যবহার করেন।
লো ব্লাড সুগারের অন্যান্য লক্ষণ হলো-
- হাত কাঁপা
- মাথাব্যথা
- অতিরিক্ত ঘাম
- ক্লান্তি
- মনোযোগে সমস্যা
- বিভ্রান্তি
যাদের নিয়মিত এমন সমস্যা হয়, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ভেতরের কানের সংক্রমণ
আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় ভেতরের কান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে ভেতরের কানে প্রদাহ হলে ল্যাবিরিন্থাইটিস নামের একটি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে বিছানা থেকে ওঠার সময় মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানোর অনুভূতি হতে পারে।
অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে। যেমন-
- কানে ব্যথা
- কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ
- মাথাব্যথা
- বমিভাব
- ঝাপসা দেখা
পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অনেক ধরনের ওষুধ মাথা ঘোরার কারণ হতে পারে। যেসব ওষুধে এমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে-
- কিছু অ্যান্টিবায়োটিক
- ডাইইউরেটিক বা প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ
- কিছু ব্যথানাশক
- অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট
- অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ
- কিছু খিঁচুনির ওষুধ
নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর মাথা ঘোরা শুরু হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া
স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি ঘুমজনিত সমস্যা, যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় বা ব্যাহত হয়। এর ফলে মস্তিষ্ক ও শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে, যা সকালে মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যহীনতার কারণ হতে পারে।
স্লিপ অ্যাপনিয়ার সাধারণ লক্ষণগুলো হলো-
- জোরে নাক ডাকা
- ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করা
- সকালে মাথাব্যথা
- মুখ শুকিয়ে যাওয়া
- দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি
- মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা
দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা হৃদরোগসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সকালে মাথা ঘোরা কমাতে কী করবেন?
কিছু সহজ অভ্যাস এই সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন
- ধূমপান পরিহার করুন
- অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত করুন
- সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন
- সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
মাঝে মাঝে মাথা ঘোরা সাধারণ বিষয় হতে পারে। তবে যদি নিয়মিত ঘুম থেকে উঠে মাথা ঘোরে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিচের লক্ষণগুলোর সঙ্গে মাথা ঘোরা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
- বুকে ব্যথা
- হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হওয়া
- তীব্র মাথাব্যথা
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- শ্বাসকষ্ট
সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথা ঘোরা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। কখনও এটি শরীরে পানির ঘাটতি বা কম রক্তচাপের মতো সহজ কারণে হয়, আবার কখনও ভেতরের কানের সমস্যা, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা অন্য কোনো শারীরিক অবস্থার ইঙ্গিত হতে পারে।
যদি সমস্যা বারবার দেখা দেয় বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে কারণ নির্ণয়ের জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দ্রুত শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসা ভবিষ্যতের জটিলতা এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে



