logo
Advertisement

পাইলসের সমস্যা থাকলে কোন খাবার খাবেন, কোনগুলো কমাবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
পাইলসের সমস্যা থাকলে কোন খাবার খাবেন, কোনগুলো কমাবেন
পাইলসের চিকিৎসায় শুধু ওষুধ নয়, খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ছবি : ডক্টর রবার্ট

পাইলস বা অর্শের সমস্যা হলে মলত্যাগের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া কিংবা রক্তপাত বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য ও শক্ত মল এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই পাইলসের চিকিৎসায় শুধু ওষুধ নয়, খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

Advertisement

পাইলস বা হেমোরয়েড হলো মলদ্বার ও নিচের মলাশয়ের আশপাশের শিরা ফুলে যাওয়া ও প্রদাহ তৈরি হওয়া। কোষ্ঠকাঠিন্য, মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা এবং কম ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়ার মতো বিষয় এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তাই পাইলসের সমস্যা থাকলে এমন খাবার বেছে নেওয়া ভালো, যা মল নরম রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে যেসব খাবারে নিজের ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অস্বস্তি বাড়ে, সেগুলো কমানো যেতে পারে।

পাইলস হলে খাবারের দিকে নজর কেন?

পাইলসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ করা। শক্ত মল বের করতে বেশি চাপ দিতে হলে মলদ্বারের ওপর চাপ বাড়ে এবং আগে থেকেই থাকা পাইলসের সমস্যা আরও বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

ফাইবারযুক্ত খাবার মলকে নরম ও সহজে বের হতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য তরল পান করলে ফাইবারও ভালোভাবে কাজ করতে পারে।

যেসব খাবার কমানো ভালো

কম ফাইবারযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার

পাইলসের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে কম ফাইবারযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া ভালো নয়। চিপস, ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, কিছু হিমায়িত প্রস্তুত খাবার এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারে সাধারণত ফাইবার কম থাকে।

ময়দা দিয়ে তৈরি খাবারও নিয়মিত বেশি না খাওয়াই ভালো। এর বদলে আটার রুটি, ওটস, লাল বা ঢেঁকি ছাঁটা চাল এবং অন্যান্য পূর্ণ শস্য রাখা যেতে পারে।

অতিরিক্ত ফাস্টফুড

বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস ও অন্যান্য ফাস্টফুডে ফাইবার কম থাকতে পারে। এগুলো নিয়মিত বেশি খেলে খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় ফাইবারের ঘাটতি হতে পারে।

তাই পাইলসের সমস্যা থাকলে খাবারের বড় অংশ যেন শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও ডাল থেকে আসে, সেদিকে নজর দিন।

অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস

সসেজ, হটডগ এবং কিছু ধরনের প্রক্রিয়াজাত মাংসে ফাইবার থাকে না। তাই এসব খাবারের ওপর বেশি নির্ভর করলে খাদ্যতালিকায় ফাইবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে মাংসের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, ডাল বা পূর্ণ শস্য রাখলে খাবারটি বেশি ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

অতিরিক্ত চিজ ও উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার

চিজ, মাখন বা অন্যান্য উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার কারও ক্ষেত্রে পেটের অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। আবার এসব খাবার সাধারণত ফাইবারের ভালো উৎস নয়।

তাই পাইলসের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে এসব খাবার বেশি না খেয়ে ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো বেশি উপকারী।

অতিরিক্ত ঝাল খাবার

অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝাল বা মশলাদার খাবার খেলে মলত্যাগের সময় জ্বালাপোড়া বাড়তে পারে। বিশেষ করে পাইলসের জায়গায় আগে থেকেই জ্বালা বা ক্ষত থাকলে অস্বস্তি বেশি অনুভূত হতে পারে।

তবে ঝাল খাবার পাইলসের মূল কারণ বা সবার জন্য নিষিদ্ধ, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। খাওয়ার পর যদি নিজের ক্ষেত্রে জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি বাড়ে, তখন পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া ভালো।

অতিরিক্ত চা-কফি

চা ও কফি পাইলসের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর, এমন নিয়ম নেই। তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের বদলে পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।

কারও ক্ষেত্রে বেশি চা-কফি খেলে পেটের সমস্যা বা পানীয় গ্রহণের ধরন বদলে যেতে পারে। তাই পাইলস থাকলে সারা দিনের মোট তরল গ্রহণের দিকে নজর দিন।

অ্যালকোহল

অ্যালকোহল পান করলে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং পাইলসের উপসর্গ থাকলে এটি পরিস্থিতি সামলানো কঠিন করে তুলতে পারে। তাই অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা বা সীমিত রাখা ভালো।

লাল মাংস কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?

না। পাইলস হয়েছে মানেই লাল মাংস একেবারে বন্ধ করতে হবে, এমন নিয়ম নেই।

তবে মাংসে ফাইবার নেই। তাই খাদ্যতালিকায় মাংসের পরিমাণ বেশি এবং শাকসবজি, ডাল, ফল ও পূর্ণ শস্য কম হলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

পাইলস থাকলে মাংসের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। পাশাপাশি অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত মাংস কমানো ভালো।

মল নরম রাখতে কী খাবেন?

পাইলসের সমস্যা থাকলে খাবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে ফাইবার। নিয়মিত ফাইবার খেলে মল নরম ও সহজে বের হতে সাহায্য করে।

খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, ওটস, লাল বা পূর্ণ শস্য, মিষ্টি আলু, আপেল ও নাশপাতি, বেরিজাতীয় ফল, বাদাম ও বীজ এবং খোসাসহ খাওয়ার উপযোগী ফল।

ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউটের (NIDDK) তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণভাবে বয়স ও লিঙ্গভেদে প্রতিদিন প্রায় ২২ থেকে ৩৪ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন হতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ অনেক বেশি ফাইবার যোগ না করে ধীরে ধীরে বাড়ানো ভালো।

ইসবগুল কি উপকারী?

ইসবগুল বা psyllium একটি ফাইবার সাপ্লিমেন্ট। পাইলসের ক্ষেত্রে মল নরম রাখতে এটি ব্যবহার করা হতে পারে। NIDDK-ও পাইলসের চিকিৎসায় ফাইবার সাপ্লিমেন্ট হিসেবে psyllium-এর কথা উল্লেখ করেছে।

ইসবগুল খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত তরল পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: মেডিকাল নিউজ টুডে
ইসবগুল খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত তরল পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: মেডিকাল নিউজ টুডে

তবে ইসবগুল খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত তরল পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারও বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যা বা নিয়মিত ওষুধ থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নেওয়া ভালো।

পানি কতটা খাবেন?

শুধু ফাইবার বাড়ালেই হবে না, পর্যাপ্ত তরলও দরকার। পানি ও অন্যান্য তরল ফাইবারকে কাজ করতে সাহায্য করে এবং মল নরম রাখতে সহায়তা করে।

তবে সবার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট ৩ বা ৪ লিটার পানি প্রয়োজন, এমন নিয়ম নেই। শরীরের আকার, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন নির্ভর করে।

কিডনি, হৃদ্‌যন্ত্র বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে যদি চিকিৎসক পানির পরিমাণ সীমিত রাখতে বলে থাকেন, তাহলে সেই পরামর্শই অনুসরণ করতে হবে।

ফাইবার হঠাৎ বাড়াবেন না

অনেকেই পাইলসের কথা শুনে হঠাৎ প্রচুর শাকসবজি, ডাল ও ইসবগুল খাওয়া শুরু করেন। এতে উল্টো গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে।

তাই ধীরে ধীরে ফাইবার বাড়ানো ভালো। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করুন। এতে শরীর নতুন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

খাবারের পাশাপাশি যে অভ্যাসগুলো জরুরি

  • পাইলস নিয়ন্ত্রণে শুধু খাবার নয়, মলত্যাগের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
  • মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না। এতে মলদ্বারের শিরায় চাপ বাড়তে পারে।
  • টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না। মোবাইল নিয়ে টয়লেটে বসে থাকার অভ্যাসও এড়িয়ে চলা ভালো।
  • শরীরচর্চা করুন। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
  • মলত্যাগের বেগ চেপে রাখবেন না। নিয়মিত বেগ চেপে রাখলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়তে পারে।

সিটজ বাথ কি করা যায়?

পাইলসের কারণে ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে উষ্ণ পানিতে কিছুক্ষণ বসে থাকা, যাকে সিটজ বাথ বলা হয়, সাময়িক আরাম দিতে পারে। NIDDK পাইলসের উপসর্গ কমাতে দিনে কয়েকবার উষ্ণ পানিতে বসার কথা উল্লেখ করেছে।

তবে পানিতে নিজের মতো করে লবণ, জীবাণুনাশক বা অন্য কোনো রাসায়নিক মেশানোর প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে কোনো ক্ষত থাকলে কী ব্যবহার করা নিরাপদ, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

রক্তপাত হলেই কি পাইলস?

না। মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়া পাইলসের একটি সাধারণ লক্ষণ হলেও সব ধরনের মলদ্বার রক্তপাতকে পাইলস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অন্য কারণেও এমন হতে পারে।

বিশেষ করে বারবার রক্তপাত হলে, রক্তপাত বেশি হলে, তীব্র ব্যথা থাকলে বা পেটব্যথা, জ্বর কিংবা ডায়রিয়ার সঙ্গে রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট এ ধরনের গুরুতর লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।


পাইলস হলে একটি সহজ খাদ্যতালিকা কেমন হতে পারে?

সকালে ওটস বা আটার রুটি, সঙ্গে ফল রাখা যেতে পারে।

দুপুরে ভাত বা রুটি, ডাল, পর্যাপ্ত সবজি এবং মাছ বা মাংসের পরিমিত অংশ রাখা যেতে পারে।

বিকেলে ফল, বাদাম বা অন্য কোনো ফাইবারসমৃদ্ধ হালকা খাবার খাওয়া যেতে পারে।

রাতে অতিরিক্ত ভারী খাবারের বদলে ভাত বা রুটি, সবজি, ডাল ও পরিমিত প্রোটিন রাখা ভালো।

সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। খাবারের পরিমাণ ও ধরন অবশ্যই ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার ওপর নির্ভর করবে।

পাইলস হলে খাবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা, যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য না হয় এবং মল সহজে বের হয়। কম ফাইবারযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও নিজের ক্ষেত্রে অস্বস্তি বাড়ায় এমন খাবার কমানো যেতে পারে। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো উপকারী।

তবে পাইলসের জন্য সব ঝাল খাবার, লাল মাংস বা চা-কফি সবার ক্ষেত্রে একেবারে নিষিদ্ধ, এমন নয়। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মল নরম রাখা, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া।

আর মলদ্বার দিয়ে অতিরিক্ত বা বারবার রক্তপাত, তীব্র ব্যথা কিংবা অন্য অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে শুধু খাবার পরিবর্তন করে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা