ডিম নিয়ে জানুন ২১ তথ্য, বদলে যেতে পারে আপনার ধারণা

ডিম আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত একটি খাবারের। সকাল বা বিকেলের নাশতা, দুপুর বা রাতের তরকারি নানা ভাবেই আমরা রোজ ডিম খেয়ে থাকি। সহজলভ্য এ খাবারটি প্রোটিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ভরা। তবে ডিম সম্পর্কে এমন অনেক তথ্য আছে, যা অনেকেই জানেন না।
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয় বিশ্ব ডিম দিবস। আর এ বছর ৯ অক্টোবর পালিত হচ্ছে এর ৩০তম দিবস। ডিমের পুষ্টিগুণ, বহুমুখী ব্যবহার আর খাদ্যতালিকায় এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্যই এ আয়োজন করা হয়। এই উপলক্ষে চলুন জেনে নেওয়া যাক ডিম নিয়ে ২১টি মজার তথ্য, যা হয়তো অনেকেরই অজানা।
ডিম নিয়ে ২১টি মজার তথ্য
ডিমে রয়েছে চোখের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান
ডিমের কুসুমে লুটিন ও জিয়াজ্যানথিন নামের দুটি উপাদান আছে। এগুলো চোখের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও রেটিনার স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে শুধু ডিম খেলেই চোখের ছানি বা অন্য রোগ প্রতিরোধ করা যায়, বিষয়টা এমন না।
ডিমের খোসায় থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র ছিদ্র
ডিমের খোসা দেখতে শক্ত ও মসৃণ হলেও এর মধ্যে হাজারও ক্ষুদ্র ছিদ্র রয়েছে। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে গ্যাসের আদান-প্রদান হয়। ছিদ্রের সংখ্যা ডিমের আকার ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।
কুসুমের রং স্বাদ ও পুষ্টির সম্পূর্ণ পরিচয় নয়
ডিমের কুসুম হালকা হলুদ থেকে গাঢ় কমলা রঙের হতে পারে। মুরগির খাবারে থাকা বিভিন্ন রঞ্জক উপাদান কুসুমের এই রঙে ওপর প্রভাব ফেলে। কুসুম গাঢ় হলেই ডিমে পুষ্টি বেশি, এমন না।
ডিমের খোসা সাদা, বাদামি বা অন্য রঙের হতে পারে
মুরগির জাতের ওপর ডিমের খোসার রং অনেকটাই নির্ভর করে। সাধারণত বাজারে সাদা ও বাদামি খোসার ডিম বেশি দেখা যায়। কিছু জাতের মুরগি নীলচে বা সবুজাভ খোসার ডিমও পাড়ে। খোসার রং আলাদা হলেই পুষ্টিগুণে বড় পার্থক্য থাকবে, এমন নয়।
ডিমের কুসুমে ভিটামিন ডি থাকে
ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ এবং হাড়ের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ডিমের কুসুম এই ভিটামিনের একটি খাদ্য উৎস। তবে ডিমে ভিটামিন ডির পরিমাণ সীমিত এবং তা মুরগির খাদ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।
বাদামি ডিমের দাম বেশি হওয়ার একটি কারণ উৎপাদন খরচ
অনেক বাজারে বাদামি ডিমের দাম সাদা ডিমের চেয়ে বেশি হতে পারে। কিছু বাদামি ডিম পাড়া মুরগির আকার বড় হওয়ায় তাদের খাবারের চাহিদাও বেশি হতে পারে। তবে দাম নির্ভর করে উৎপাদন খরচ, সরবরাহ, চাহিদা ও স্থানীয় বাজারব্যবস্থার ওপরও। বাদামি ডিম যে সব সময় বেশি পুষ্টিকর, তা নয়।
হাঁসের ডিমেও রয়েছে প্রোটিন ও চর্বি
মুরগির ডিমের পাশাপাশি হাঁসের ডিমও খাওয়া হয়। হাঁসের ডিম সাধারণত আকারে বড় এবং এতে প্রোটিন ও চর্বি থাকে। এর গঠন ও স্বাদের কারণে কিছু বেকারি খাবার তৈরিতেও হাঁসের ডিম ব্যবহার করা হয়। তবে পুষ্টির পরিমাণ ডিমের আকার ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
ডিমে রয়েছে কোলিন
কোলিন শরীরের কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম, স্নায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। ডিমের কুসুম কোলিনের একটি ভালো খাদ্য উৎস। তাই সুষম খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা যেতে পারে।
ঘুরিয়ে কাঁচা ও সেদ্ধ ডিমের পার্থক্য বোঝা যায়
একটি ডিম সমতল জায়গায় ঘোরালে সেদ্ধ ডিম সাধারণত স্থিরভাবে ও দ্রুত ঘোরে। কাঁচা ডিমের ভেতরের তরল অংশ নড়াচড়া করায় সেটি তুলনামূলকভাবে দুলতে পারে। তবে এটি ডিমের অবস্থা বোঝার একটি সাধারণ কৌশল, নিরাপদে খাওয়ার উপযোগিতা যাচাইয়ের নিশ্চয়তা নয়।
মেঝেতে ডিম ভেঙে পড়লে লবণ পরিষ্কারে সাহায্য করতে পারে
রান্নাঘরের মেঝেতে কাঁচা ডিম পড়ে গেলে তা পরিষ্কার করা ঝামেলার। কিছু মানুষ ডিমের ওপর লবণ ছিটিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, যাতে তরল অংশ পরিষ্কার করা সহজ হয়। তবে এটি কেবল ঘরোয়া একটি উপায় মাত্র। পরিষ্কারের পর জায়গাটি সাবান বা উপযুক্ত পরিষ্কারক দিয়ে ভালোভাবে মুছে নিতে হয়।
ঘরের তাপমাত্রায় ডিম দ্রুত নষ্ট হতে পারে
ডিম কত দ্রুত নষ্ট হবে, তা তাপমাত্রা, সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং ডিমের প্রাথমিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। গরম পরিবেশে ডিমের গুণমান দ্রুত কমতে পারে এবং জীবাণু বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই ডিম কেনার পর স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নিরাপদ সংরক্ষণবিধি অনুসরণ করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের নির্দেশনায় রেফ্রিজারেটরে রাখা ডিম দুই ঘণ্টার বেশি বাইরে না রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একটি মুরগি বছরে অনেক ডিম পাড়তে পারে
মুরগির জাত, বয়স, খাবার, আলো ও পরিচর্যার ওপর ডিম উৎপাদন নির্ভর করে। ভালো উৎপাদনক্ষমতার পোলট্রি মুরগি বছরে প্রায় ৩০০ বা তারও বেশি ডিম দিতে পারে। তবে সব মুরগির ক্ষেত্রে এই সংখ্যা এক নয়।
একটি ডিম তৈরি হতে প্রায় এক দিন লাগে
মুরগির শরীরে ডিম তৈরি ও খোসা গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাধারণত প্রায় ২৪ থেকে ২৬ ঘণ্টা লাগতে পারে। এ কারণেই একটি মুরগি প্রতিদিন একই সময়ে ডিম পাড়বে, এমন না।
বয়স বাড়ার সঙ্গে মুরগির ডিমের আকার বদলায়
মুরগির বয়স ডিমের আকারে প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে মুরগি তুলনামূলক বড় ডিম পাড়ে। তবে জাত, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পরিচর্যার মতো বিষয়ও ডিমের আকার নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
অল্প সময়ে অনেক ডিম দিয়ে অমলেট তৈরি করা যায়
অমলেট তৈরির গতি নির্ভর করে রান্নার দক্ষতা, ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং আয়োজনের ওপর। বিভিন্ন সময়ে দ্রুত অমলেট তৈরির রেকর্ডের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো রেকর্ডের তথ্য উল্লেখ করতে হলে তারিখ ও স্বীকৃত রেকর্ডের সূত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
ডিমে তা দেওয়ার সময় মুরগি ডিম ঘোরায়
ডিমে তা দেওয়ার সময় মুরগি ঠোঁট বা শরীরের নড়াচড়ার সাহায্যে ডিম ঘোরাতে পারে। এতে ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশে সহায়তা হয়। বাণিজ্যিক ইনকিউবেটরেও নির্দিষ্ট নিয়মে ডিম ঘোরানো হয়।
কিউই পাখির ডিম শরীরের তুলনায় বেশ বড়
পাখির প্রজাতিভেদে ডিমের আকারে পার্থক্য দেখা যায়। নিউজিল্যান্ডের কিউই পাখির ডিম তার শরীরের আকারের তুলনায় বড়। এই বৈশিষ্ট্য পাখিজগতে কিউইকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
ইংরেজি ইয়োল্ক শব্দের অর্থ কুসুম
ইংরেজি yolk শব্দটি ডিমের হলুদ অংশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ কুসুম। ডিমের এই অংশে চর্বি, প্রোটিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে। অন্যদিকে ডিমের সাদা অংশে প্রধানত পানি ও প্রোটিন থাকে।
মুরগির ডিমের আকার সব সময় এক রকম হয় না
কোনো ডিম ছোট, কোনোটি বড়, আবার কোনো ডিমে দুটি কুসুমও থাকতে পারে। বিশেষ করে কিছু ক্ষেত্রে মুরগির শরীরে ডিম তৈরির প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে একই খোসার মধ্যে দুটি কুসুম তৈরি হয়। দুটি কুসুম থাকা মানেই ডিমটি নষ্ট বা খাওয়ার অনুপযোগী, এমন নয়। তবে ডিমের সতেজতা ও নিরাপদ সংরক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।
ডিম উৎপাদনে দেশ ও অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে
কোনো অঞ্চলে ডিম উৎপাদন বেশি হওয়ার পেছনে পোলট্রি খামারের সংখ্যা, মুরগির জাত, খাদ্য, প্রযুক্তি ও বাজারের চাহিদা ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া অঙ্গরাজ্য ডিম উৎপাদনের জন্য পরিচিত। তবে উৎপাদনের পরিমাণ বছরভেদে পরিবর্তিত হয়, তাই নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান উল্লেখের আগে সাম্প্রতিক তথ্য যাচাই করা দরকার।
মুরগির ডিম এত জনপ্রিয় কেন
মুরগি তুলনামূলকভাবে নিয়মিত ডিম পাড়ে এবং বাণিজ্যিকভাবে ডিম উৎপাদন ও সংগ্রহের ব্যবস্থা অনেক জায়গায় সহজলভ্য। এ ছাড়া মুরগির ডিম রান্নায় বহুমুখীভাবে ব্যবহার করা যায়। সেদ্ধ, ভাজি, অমলেট, কেক, পুডিংসহ নানা খাবারে এটি ব্যবহার করা হয়। এ কারণেই বিশ্বের বহু দেশে মুরগির ডিম দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডিম খাওয়ার সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
ডিম পুষ্টিকর খাবার হলেও তা নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও রান্না করা জরুরি। কাঁচা বা আধা সেদ্ধ ডিমে ক্ষতিকর জীবাণু থাকার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া নিরাপদ।
ডিম সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। খোসা ফাটা ডিম কেনা এড়িয়ে চলুন এবং ডিম ধরার পর হাত, বাসন ও রান্নার জায়গা পরিষ্কার করুন। রেফ্রিজারেটরে ডিম রাখলে তাপমাত্রার ওঠানামা কম হয় এমন জায়গায় রাখুন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনায় ডিম ও ডিম দিয়ে তৈরি খাবার নিরাপদভাবে সংরক্ষণ এবং ভালোভাবে রান্না করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডিম সহজলভ্য হলেও এর পুষ্টিগুণ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার মতো অনেক বিষয় রয়েছে। বিশ্ব ডিম দিবস শুধু ডিম খাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরার দিন নয়, বরং পুষ্টি, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস ও ডিম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের অবদান সম্পর্কে সচেতন হওয়ারও সুযোগ। সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে নিজের বয়স, স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী ডিম খাওয়া যেতে পারে।
তথ্যসূত্র
VAL-CO, 21 Fun Egg Facts for World Egg Day 2021
World Egg Organisation, World Egg Day 2026
USDA Food Safety and Inspection Service, How do you handle and store eggs safely?
USDA Agricultural Research Service, Egg-citing Facts About Eating Eggs
