চোখের পাওয়ার ঠিক থাকার পরও ঝাপসা দেখছেন, কারণ হতে পারে মানসিক চাপ

কাজের চাপ, দুশ্চিন্তা বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আগে অনেকেরই চোখে অস্বস্তি শুরু হয়। কখনো চোখের পাতা কাঁপে, কখনো চোখ শুকিয়ে যায়, আবার কখনো মনে হয় দৃষ্টি আগের মতো পরিষ্কার নেই। এমন অভিজ্ঞতা হলে অনেকে ভাবেন, চোখের পাওয়ার বেড়ে গেছে বা নতুন কোনো চোখের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তবে মানসিক চাপ বা স্ট্রেসও সাময়িকভাবে দৃষ্টিকে প্রভাবিত করতে পারে। স্ট্রেসের সময় শরীরে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে, যা চোখের ফোকাস, অশ্রুর স্তর ও চোখের চারপাশের পেশিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দৃষ্টি ঝাপসা হলেই সেটিকে শুধু স্ট্রেসের ফল ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ এর পেছনে চোখের গুরুতর সমস্যাও থাকতে পারে।
স্ট্রেসে চোখ ঝাপসা দেখার কারণ কী?
মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হলে আমাদের শরীর তৈরি হয় বিপদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য। এটাকে বলা হয় 'ফাইট-অর-ফ্লাইট' রেসপন্স। এ সময় চোখের মণি কিছুটা বড় হয়ে যায়, যার ফলে চোখে আলো ঢোকার স্বাভাবিক ধরনটা বদলে যায়। যাদের আগে থেকেই হালকা পাওয়ারের সমস্যা বা অ্যাস্টিগমেটিজম আছে, তাদের তখন সাময়িকভাবে ঝাপসা দেখতে বা দেখতে একটু সমস্যা হতে পারে।
এ ছাড়া মানসিক চাপের সময় অনেকেই দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্য কোনো কাজের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তখন স্বাভাবিকের তুলনায় চোখের পলক কম পড়ে। এর ফলে চোখের ওপরের অশ্রুর স্তর দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে এবং ঝাপসা বা ওঠানামা করা দৃষ্টি তৈরি হতে পারে।
চোখের পাতা কাঁপাও হতে পারে স্ট্রেসের লক্ষণ
চোখের পাতা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করলে অনেকেই ভয় পেয়ে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অনিচ্ছাকৃত কাঁপুনিকে মায়োকাইমিয়া (myokymia) বলা হয়।
স্ট্রেস, ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত ক্যাফেইন এবং দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে চোখের পাতা কাঁপার সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত এটি ক্ষতিকর নয় এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম হলে কয়েক দিন বা কিছু সময়ের মধ্যে কমে যেতে পারে।
তবে চোখের পাতা কাঁপার সঙ্গে যদি মুখের নিচের অংশেও কাঁপুনি শুরু হয় বা চোখ অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্ত করে বন্ধ হয়ে আসে, তাহলে বিষয়টি শুধু স্ট্রেস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
স্ট্রেসে চোখ শুকিয়ে যেতে পারে
মানসিক চাপের সময় চোখের পলক ফেলার হার কমে যেতে পারে। বিশেষ করে কাজের চাপের মধ্যে দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকলে এই সমস্যা আরও বাড়ে।
চোখের ওপর থাকা অশ্রুর স্তর ঠিকমতো স্থির না থাকলে চোখে জ্বালা, খচখচে ভাব, চোখ ভার লাগা এবং সাময়িক ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে। চোখের অতিরিক্ত ব্যবহার বা eye strain-এর ক্ষেত্রেও শুষ্কতা ও ঝাপসা দৃষ্টি দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিনের স্ট্রেসে কোন চোখের সমস্যা হতে পারে?
স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ চোখের সমস্যা হলো সেন্ট্রাল সেরাস কোরিওরেটিনোপ্যাথি বা সিএসসিআর (CSCR)। এতে রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশের নিচে তরল জমে যেতে পারে। ফলে দৃষ্টির মাঝখানে ঝাপসা বা কালচে জায়গা দেখা, সরল রেখা বাঁকা মনে হওয়া কিংবা কোনো বস্তুর আকার বিকৃত দেখার মতো সমস্যা হতে পারে।
স্ট্রেস ও এই রোগের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। পাশাপাশি corticosteroid বা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গেও CSCR-এর ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। স্টেরয়েড শুধু ট্যাবলেটেই নয়, কিছু ত্বকের ক্রিম, নাকের স্প্রে, অ্যাজমার ইনহেলার বা ইনজেকশনের মাধ্যমেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাই এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করলে চিকিৎসককে তা জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে স্ট্রেস হলেই CSCR হবে, এমন নয়। এই রোগের ক্ষেত্রে দৃষ্টির নির্দিষ্ট পরিবর্তন দেখা দিলে চোখ পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
ঝিকিমিকি আলো দেখলে মাইগ্রেনও হতে পারে
স্ট্রেসের সময় কারও কারও চোখের সামনে ঝিকিমিকি আলো, জিগজ্যাগ রেখা বা সাময়িক অন্ধকার জায়গা দেখা দিতে পারে। অনেকেই এটিকে চোখের সমস্যা মনে করেন। কিন্তু এসব উপসর্গ visual aura বা migraine aura-এর সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
এটি মূলত স্নায়বিক ঘটনা এবং সবসময় চোখের কোনো রোগের কারণে হয় না। সাধারণত এই ধরনের visual aura সাময়িক হয় এবং কিছু সময় পর চলে যায়।
তবে প্রথমবার এমন উপসর্গ দেখা দিলে বা উপসর্গের ধরন বদলে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
কখন ঝাপসা দৃষ্টিকে স্ট্রেস বলে এড়িয়ে যাবেন না?
সব ধরনের ঝাপসা দৃষ্টি স্ট্রেসের কারণে হয় না। হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন-
- হঠাৎ এক বা দুই চোখে দৃষ্টি কমে যাওয়া
- একটি চোখে নতুন করে ঝাপসা দেখা
- চোখের সামনে কালো পর্দা বা ছায়া নেমে আসার মতো অনুভূতি
- দৃষ্টির মাঝখানে কালো বা ধূসর দাগ দেখা
- সরল রেখা বা দরজার ফ্রেম বাঁকা দেখা
- চোখে তীব্র ব্যথার সঙ্গে দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া
- নতুন করে অনেক floaters বা আলোর ঝলকানি দেখা
হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন কখনো কখনো চোখ বা স্নায়ুতন্ত্রের জরুরি সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে শুধু বিশ্রাম নিয়ে অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
স্ট্রেসের কারণে চোখের অস্বস্তি কমাবেন যেভাবে
চোখের উপসর্গের সঙ্গে যদি দীর্ঘ সময়ের মানসিক চাপ বা ঘুমের ঘাটতি থাকে, তাহলে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন উপকারী হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম: নিয়মিত ঘুম চোখের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে।
স্ক্রিনে বিরতি: দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের মধ্যে নিয়মিত বিরতি নিন। ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকানো।
চোখের পলক ফেলুন: স্ক্রিনে কাজ করার সময় সচেতনভাবে চোখের পলক ফেলার চেষ্টা করুন। এতে চোখের পৃষ্ঠ আর্দ্র রাখতে সাহায্য হয়।
ক্যাফেইন কমান: অতিরিক্ত চা বা কফি কিছু মানুষের চোখের পাতা কাঁপার সমস্যা বাড়াতে পারে।
স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করুন: নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং কাজের মধ্যে বিরতি নেওয়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
চোখ শুষ্ক লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চোখের ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুধু আই ড্রপ ব্যবহার করে দৃষ্টির নতুন বা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন উপেক্ষা করা উচিত নয়।
দৃষ্টি ঝাপসা হলে কী করবেন?
দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার কারণ অনেক হতে পারে। চোখের পাওয়ারের পরিবর্তন, dry eye, চোখের ক্লান্তি, ডায়াবেটিস, মাইগ্রেনসহ বিভিন্ন চোখ ও শারীরিক সমস্যার কারণেও এটি হতে পারে।
তাই মানসিক চাপের সময় সাময়িকভাবে দৃষ্টি অস্পষ্ট মনে হলে বিশ্রাম ও ঘুমের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা বারবার হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে বা হঠাৎ শুরু হলে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্ট্রেস সত্যিই চোখের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক চাপের সময় চোখের পাতা কাঁপা, চোখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখের ক্লান্তি এবং সাময়িক ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে।
তবে দৃষ্টি ঝাপসা হলেই সেটিকে স্ট্রেসের কারণে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে এক চোখে হঠাৎ দৃষ্টি পরিবর্তন, কালো বা ধূসর দাগ, সরল রেখা বাঁকা দেখা কিংবা হঠাৎ দৃষ্টি কমে গেলে দ্রুত চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি



