বকাঝকা নয়, ইতিবাচক শাসনেই বদলাতে পারে সন্তানের আচরণ

সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে প্রায় সব বাবা-মাকেই কখনও না কখনও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। শিশুর জেদ, কান্না বা কিশোর সন্তানের রাগ সামলাতে গিয়ে অনেক সময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন অনেকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, চিৎকার বা কঠোর শাস্তির বদলে শান্ত ও ইতিবাচক আচরণই সন্তানকে দায়িত্বশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বেশি কার্যকর।
কেন ইতিবাচক শাসন গুরুত্বপূর্ণ
শিশুকে বারবার বকাঝকা বা মারধর করলে তা সাময়িকভাবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত মানসিক চাপ শিশুর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
অন্যদিকে ইতিবাচক শাসন শিশুর সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করে। এতে শিশু ভয় থেকে নয়, বোঝাপড়া ও দায়িত্ববোধ থেকে ভালো আচরণ শিখতে পারে।
প্রতিদিন কিছু সময় শুধু সন্তানের জন্য রাখুন
শিশুর সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো সম্পর্ককে আরও কাছের করে তোলে। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও সন্তানের সঙ্গে গল্প করা, খেলাধুলা করা বা একসঙ্গে ছোট কোনো কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই সময়টায় পুরো মনোযোগ সন্তানের দিকে রাখা জরুরি। মোবাইল ফোন বা টিভি থেকে দূরে থেকে তার কথা মন দিয়ে শুনলে শিশু নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
ভালো কাজের প্রশংসা করুন
অনেক সময় বাবা-মা শুধু ভুল করলে সন্তানের দিকে নজর দেন। এতে শিশু মনে করতে পারে, খারাপ আচরণ করলেই মনোযোগ পাওয়া যায়।
তাই ছোট ছোট ভালো কাজেরও প্রশংসা করা উচিত। যেমন খেলনা গুছিয়ে রাখা, সময়মতো পড়তে বসা বা অন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা। এতে শিশুর ইতিবাচক আচরণ করার আগ্রহ বাড়ে।
কী করতে হবে, তা স্পষ্টভাবে বলুন
শুধু এটা করো না বললে শিশু অনেক সময় বুঝতে পারে না ঠিক কী করা উচিত। যেমন ঘর নোংরা করো না বলার বদলে খেলনাগুলো গুছিয়ে রাখো বলা বেশি কার্যকর। এতে শিশু সহজে নির্দেশনা বুঝতে পারে।
তবে সন্তানের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যাশা রাখা জরুরি। অতিরিক্ত চাপ দিলে হতাশা তৈরি হতে পারে।
মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিন
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাগ বা জেদ সামলানোর সহজ উপায় হলো তাদের মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া।
নতুন খেলা, গল্প বা অন্য কোনো কাজে যুক্ত করলে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা বাড়ার আগেই শিশুর অস্থিরতা বুঝতে পারা গুরুত্বপূর্ণ।
শান্তভাবে নিয়ম বোঝান
শিশুকে দায়িত্বশীল আচরণ শেখাতে হলে তার কাজের ফল কী হতে পারে, তা আগে থেকেই জানানো উচিত।
যেমন দেয়ালে আঁকলে খেলার সময় কমে যাবে, এমন নিয়ম শান্তভাবে বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। এরপরও নিয়ম না মানলে রাগ না করে ধারাবাহিকভাবে সেই নিয়ম অনুসরণ করানো জরুরি।
আচরণ ঠিক হলে প্রশংসা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিশুর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন স্থায়ী হতে সাহায্য করে।
কিশোর সন্তানদের ক্ষেত্রেও যোগাযোগ জরুরি
বড় শিশু বা কিশোরদেরও বাবা-মায়ের সময় ও মনোযোগ প্রয়োজন হয়।
তাদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কথা বলা, মতামত শোনা এবং পারিবারিক নিয়ম তৈরিতে যুক্ত করলে তারা দায়িত্ববোধ বেশি শেখে। এতে সম্পর্কও আরও ভালো হয়।
রাগের মুহূর্তে কী করবেন
রাগের সময় সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কিছুক্ষণ থেমে যাওয়া কার্যকর হতে পারে। গভীর শ্বাস নেওয়া বা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সন্তানের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি বাবা-মায়ের নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। নিজের জন্য কিছু সময় রাখলে চাপ সামলানো সহজ হয়।
সন্তানকে শাসন মানে ভয় দেখানো বা কঠোর আচরণ করা নয়। বরং ধৈর্য, ভালোবাসা এবং ইতিবাচক আচরণের মাধ্যমে তাকে দায়িত্বশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতিই শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশে সবচেয়ে বেশি সহায়ক।
সূত্র: ইউনিসেফ
.png)


