বালিশ পরিষ্কার না রাখলে কী হয়, শ্বাসযন্ত্র নিয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

ঘুমের সময় মাথার নিচে বালিশ না হলে অনেকেরই অস্বস্তি হয়। তাই দিনের পর দিন একই বালিশ ব্যবহার করলেও সেটি বদলানোর কথা খুব একটা মনে আসে না। কিন্তু পুরনো, অপরিষ্কার বা ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা বালিশ শুধু ঘুমের আরাম নষ্ট করে না, বরং অ্যালার্জি ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার সঙ্গেও জড়িত হতে পারে। বিশেষ করে বালিশে ধুলো, ছাঁচ বা অন্যান্য অ্যালার্জেন জমে গেলে তা ঘুমের সময় সরাসরি নাক ও শ্বাসনালির কাছে থাকে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ভুল বালিশ সরাসরি ফুসফুসের রোগ তৈরি করে, এমন কথা সব ক্ষেত্রে বলা যায় না। বরং পুরনো বা অপরিষ্কার বালিশে জমে থাকা ধুলো, ছাঁচ ও অন্যান্য অ্যালার্জেন আগে থেকেই থাকা হাঁপানি বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ছাঁচের সংস্পর্শে হাইপারসেনসিটিভিটি নিউমোনাইটিসের মতো ফুসফুসের প্রদাহজনিত সমস্যার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পুরনো বালিশে কেন সমস্যা হতে পারে
বালিশের ভেতর সময়ের সঙ্গে ধুলো, ঘাম, ত্বকের মৃত কোষ এবং আর্দ্রতা জমতে পারে। এসব কারণে ধুলোবালি ও ছাঁচের মতো অ্যালার্জেন তৈরি বা জমে থাকার সুযোগ থাকে। ঘুমের সময় মুখ ও নাক বালিশের খুব কাছাকাছি থাকায় এসব কণা সহজেই শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে পারে।
বিশেষ করে যাদের হাঁপানি, সাইনাস বা অন্য কোনো শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এমন পরিবেশ সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। পুরনো বা অপরিষ্কার বালিশে জমে থাকা অ্যালার্জেন, ধুলো ও ফাঙ্গাসের সঙ্গে হাঁপানি এবং হাইপারসেনসিটিভিটি নিউমোনাইটিসের মতো সমস্যার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ভারতীয় একটি প্রতিবেদনে।
ছাঁচ জমলে বাড়তে পারে ঝুঁকি
বালিশ ভিজে গেলে বা দীর্ঘদিন আর্দ্র পরিবেশে থাকলে ছাঁচ জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে ফোমজাত বালিশে ছাঁচের উপস্থিতি নিয়ে সতর্ক হওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ছাঁচের কিছু উপাদান সংবেদনশীল মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়া তৈরি করে ফুসফুসে প্রদাহ ঘটাতে পারে।
হাইপারসেনসিটিভিটি নিউমোনাইটিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট পরিবেশগত উপাদানের সংস্পর্শে ফুসফুসে প্রদাহ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন সমস্যা চলতে থাকলে ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষত বা পালমোনারি ফাইব্রোসিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে পুরনো বালিশ ব্যবহার করলেই এমন রোগ হবে। ঝুঁকি ব্যক্তিভেদে এবং অ্যালার্জেনের সংস্পর্শের মাত্রার ওপর নির্ভর করে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে এসব লক্ষণ হচ্ছে?
বালিশের কারণে অ্যালার্জি বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা বাড়ছে কি না, তা বোঝার জন্য কিছু লক্ষণের দিকে নজর রাখা যায়। যেমন-
- সকালে ঘুম থেকে উঠে বারবার হাঁচি হওয়া
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- চোখ চুলকানো বা পানি পড়া
- দীর্ঘদিন কাশি থাকা
- ঘুমের সময় নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া
- শ্বাস নিতে অস্বস্তি হওয়া
- হাঁপানির সমস্যা বেড়ে যাওয়া
এসব লক্ষণ অন্য অনেক কারণেও হতে পারে। তাই শুধু বালিশকেই কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে নিয়মিত একই সময়ে, বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার পর এসব সমস্যা দেখা দিলে বিছানা, বালিশ ও ঘরের ধুলাবালির বিষয়টিও খেয়াল করা যেতে পারে।
বালিশ বদলানোর সময় হয়েছে কীভাবে বুঝবেন
বালিশের বয়সের পাশাপাশি তার অবস্থা দেখাও গুরুত্বপূর্ণ। বালিশে দৃশ্যমান দাগ, দুর্গন্ধ বা ছাঁচ দেখা গেলে সেটি বদলানোর কথা ভাবুন। বালিশের ভেতরের তুলা বা ফিলিং দলা পাকিয়ে গেলে কিংবা বালিশের আকৃতি নষ্ট হয়ে গেলেও সেটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
সাধারণভাবে ১ থেকে ২ বছর পর বালিশ বদলানো ভালো। তবে এটি কোনো কঠোর নিয়ম নয়। বালিশের উপাদান, ব্যবহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং ব্যক্তির অ্যালার্জি বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার ওপর ভিত্তি করে সময়ের পার্থক্য হতে পারে।
শুধু ফুসফুস নয়, ঘুমও নষ্ট করতে পারে ভুল বালিশ
বালিশের সমস্যা শুধু ধুলো বা ছাঁচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত শক্ত, বেশি উঁচু বা খুব নরম বালিশ ঘাড় ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান নষ্ট করতে পারে। এর ফলে ঘাড়ে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ঘুমে অস্বস্তি হতে পারে।
যারা কাত হয়ে ঘুমান, তাদের জন্য সাধারণত একটু বেশি উচ্চতার ও যথেষ্ট সহায়তা দিতে পারে এমন বালিশ প্রয়োজন হতে পারে। চিৎ হয়ে ঘুমালে মাঝারি উচ্চতার বালিশ আর উপুড় হয়ে ঘুমালে তুলনামূলক পাতলা বালিশ বেশি আরামদায়ক হতে পারে। তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।
ঘুমের বালিশ কেমন হওয়া উচিত
বালিশ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু নরম বা শক্ত হওয়ার বিষয়টি দেখলেই হবে না। আপনি কীভাবে ঘুমান, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের অবস্থান এবং আপনার অ্যালার্জির সমস্যা আছে কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত।
অ্যালার্জির প্রবণতা থাকলে সহজে পরিষ্কার করা যায় এবং ধুলো বা ধুলোবাহিত জীবাণু জমার ঝুঁকি তুলনামূলক কম এমন বালিশ বেছে নেওয়া যেতে পারে। বালিশের কভার নিয়মিত ধোয়া এবং বালিশকে শুকনো রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বালিশে ঘাম বা আর্দ্রতা জমলে সেটি ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া উচিত। ঘরের পরিবেশেও অতিরিক্ত আর্দ্রতা যেন না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।
বালিশ পরিষ্কার রাখুন, লক্ষণ অবহেলা করবেন না
ঘুমের জায়গা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি বালিশ ও বালিশের কভারও নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার। বালিশ ধোয়া যাবে কি না, তা অবশ্যই প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা দেখে ঠিক করতে হবে। সব ধরনের বালিশ একইভাবে ধোয়া যায় না।
তবে নিয়মিত কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুক চাপ লাগা বা হাঁপানির সমস্যা হলে শুধু বালিশ বদলে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। এসব লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বালিশ আমাদের ঘুমের সঙ্গী। তাই এটি শুধু আরামদায়ক হলেই হবে না, পরিষ্কার ও উপযুক্ত রাখাও জরুরি। বিশেষ করে যাদের অ্যালার্জি বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বালিশের পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
সূত্র : টাইস অব ইন্ডিয়া ও টিভি নাইন বাংলা
