ঘুম থেকে উঠে মাথা ভার ও ব্যথা, এই অভ্যাসগুলো হতে পারে কারণ

সকালে অ্যালার্ম বাজতেই ঘুম ভাঙল, কিন্তু শরীর যেন বিছানা ছাড়তেই চাইছে না। মাথা ভার, ক্লান্তি, বিরক্তি আর কাজে মন বসছে না। এক-দুদিন এমন হলে খুব একটা চিন্তার কারণ নাও হতে পারে। কিন্তু প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে মাথাব্যথা থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
ঘুমের সময় ও ধরন অনিয়মিত হওয়া, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের মতো অভ্যাস ঘুমের মান খারাপ করতে পারে। আবার নিয়মিত সকালের মাথাব্যথার পেছনে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমের সমস্যাও থাকতে পারে।
রাতে দেরি করে ঘুমানোর অভ্যাস
প্রতিদিন রাতে ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়া শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের ছন্দকে ব্যাহত করতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত ঘুমের সময় কমে গেলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্তি, ঝিমুনি ও মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে।
তাই ছুটির দিনেও ঘুমানোর সময় যতটা সম্ভব একই রাখার চেষ্টা করুন। শুধু সপ্তাহের অন্য দিন কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে অনেক বেশি ঘুমিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সব সময় কার্যকর নয়।
ঘুমানোর আগে মোবাইল দেখছেন?
বিছানায় যাওয়ার পরও মোবাইলে স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা বা ল্যাপটপে কাজ করার অভ্যাস ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে। এর ফলে পর্যাপ্ত সময় বিছানায় কাটালেও ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।
ভারতীয় এ অনলাইন প্রতিবেদনে ঘুমানোর আগে মোবাইল ও ল্যাপটপের পর্দা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঘুমানোর আগে কিছু সময় স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা এবং আলো কমিয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরি করা ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারে।
রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়?
একটানা ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে সকালে উঠে মনে হতে পারে, যেন ঘুমিয়েও বিশ্রাম পাওয়া হয়নি।
ঘুমের ব্যাঘাত, অনিদ্রা ও অন্যান্য ঘুমের সমস্যার সঙ্গে সকালের মাথাব্যথার সম্পর্ক রয়েছে।
তাই শুধু কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন তা নয়, সেই ঘুম কতটা নিরবচ্ছিন্ন ছিল সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বেশি ঘুমালেই কি মাথাব্যথা সেরে যাবে?
অনেকের ধারণা, সপ্তাহের ব্যস্ততার পর ছুটির দিনে বেশি সময় ঘুমিয়ে নিলে শরীরের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। কিন্তু বেশি সময় ঘুমানো সব সময় সমাধান নয়। দীর্ঘ সময় ঘুমানোও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সকালে মাথাব্যথার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তাই প্রতিদিন ঘুমের সময় মোটামুটি নিয়মিত রাখা এবং নিজের বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সকালে মাথাব্যথার সঙ্গে নাক ডাকলে সতর্ক হোন
সকালে মাথাব্যথার সঙ্গে যদি রাতে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা, হাঁসফাঁস করা বা বারবার জেগে ওঠার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা দরকার।
স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আবার শুরু হতে পারে। এর ফলে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। সকালে মাথাব্যথা এবং দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি এর অন্যতম লক্ষণ হতে পারে।
তবে সকালে মাথাব্যথা হলেই স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে, এমন নয়। এর আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।
শরীরে পানির ঘাটতিও কারণ হতে পারে
সকালের মাথাব্যথার একটি সাধারণ কারণ পানিশূন্যতা। রাতে কয়েক ঘণ্টা পানি না খেয়ে থাকার পর শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আগের দিন পর্যাপ্ত পানি না খেলে, অ্যালকোহল গ্রহণ করলে বা নাক ডাকার কারণে মুখ দিয়ে শ্বাস নিলে সকালে মাথাব্যথা হতে পারে।
তাই দিনের বেলা পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। তবে রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত পানি পান করলে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তাই সারা দিনজুড়ে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের অভ্যাস তৈরি করাই ভালো।
ঘুমানোর ভঙ্গিও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে
বালিশের উচ্চতা বা ঘুমানোর ভঙ্গি ঠিক না হলে ঘাড়ের পেশিতে টান পড়তে পারে। সেই টান থেকে সকালে ঘাড় শক্ত লাগা বা মাথাব্যথা হতে পারে।
তাই ঘুমানোর সময় মাথা ও ঘাড়কে স্বাভাবিক অবস্থানে রাখে এমন বালিশ ব্যবহার করা উচিত।
রাতে চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস আছে?
চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন অনেকের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে রাতে নিয়মিত চা বা কফি খেলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে বা ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। আবার যারা নিয়মিত বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করেন, তারা হঠাৎ কমিয়ে দিলেও মাথাব্যথা হতে পারে।
তাই রাতে চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা ধীরে ধীরে কমানো যেতে পারে।
ঘুমের অভ্যাস ঠিক করতে যা করবেন
সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথাব্যথা বা ক্লান্তি কমাতে কয়েকটি অভ্যাস কাজে লাগতে পারে-
- প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠুন
- ঘুমানোর আগে মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহার কমান
- রাতে চা ও কফি কমিয়ে দিন
- ঘুমানোর ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন
- দিনের বেলা পর্যাপ্ত পানি পান করুন
- ঘুমের জন্য উপযুক্ত বালিশ ব্যবহার করুন
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, তবে ঘুমানোর একেবারে আগে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো
এসব ঘুমের স্বাস্থ্য বা sleep hygiene উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাঝেমধ্যে সকালে মাথাব্যথা হলে সব সময় গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ নাও হতে পারে। কিন্তু সপ্তাহে বারবার বা প্রায় প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে মাথাব্যথা হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা ভালো। বিশেষ করে ব্যথা ক্রমে বাড়লে বা দৈনন্দিন কাজে সমস্যা তৈরি করলে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আর যদি মাথাব্যথার সঙ্গে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা হাঁসফাঁস করা, রাতে বারবার জেগে ওঠা এবং দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকে, তাহলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
হঠাৎ খুব তীব্র মাথাব্যথা, বিভ্রান্তি, দৃষ্টির পরিবর্তন, অসাড়তা বা অন্য গুরুতর উপসর্গের সঙ্গে মাথাব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথাব্যথা ও ক্লান্তি সব সময় শুধু কম ঘুমের কারণে হয় না। অনিয়মিত ঘুম, রাতে স্ক্রিন ব্যবহার, ঘুমের ব্যাঘাত, পানিশূন্যতা, ভুল ঘুমের ভঙ্গি বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনও কারণ হতে পারে। আবার নিয়মিত নাক ডাকা ও দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তির সঙ্গে এমন সমস্যা থাকলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমের সমস্যাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাই শুধু বেশি সময় ঘুমানোর চেষ্টা না করে ঘুমের নিয়ম ও মানের দিকে নজর দিন। সমস্যা নিয়মিত হলে কারণ খুঁজে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: টিভি ৯
