logo

গরম ভাতে ঘি খান, জানুন শরীরে কী প্রভাব ফেলে

গরম ভাতে ঘি খান, জানুন শরীরে কী প্রভাব ফেলে
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

গরম ভাতের ওপর এক চামচ ঘি। সঙ্গে ডাল, একটু নুন আর কোনো কোনো বাড়িতে আলুভর্তা। বাঙালি ও ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক পরিবারের খাবারের টেবিলে এই স্বাদ পরিচিত। বিশেষ করে গরম ভাতের সঙ্গে ঘি মেশালে যে গন্ধ ও স্বাদ তৈরি হয়, তা অনেকের কাছেই আলাদা রকমের তৃপ্তির।

তবে শুধু স্বাদের জন্যই কি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গরম ভাতে ঘি মেশানোর এই অভ্যাস চলে আসছে?

টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে এই প্রচলিত খাবারের সঙ্গে হজম, পুষ্টি শোষণ ও খাবারের পর রক্তে শর্করার পরিবর্তনের মতো কয়েকটি বৈজ্ঞানিক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভাতে ঘি মেশালেই তা স্বাস্থ্যকর খাবারে পরিণত হয় বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ঘি মূলত সম্পৃক্ত চর্বির উৎস, তাই পরিমাণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।


ভাতে ঘি দিলে কীভাবে হজমে প্রভাব ফেলতে পারে?

ভাত মূলত কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার। সাদা ভাত দ্রুত হজম হয়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়াতে পারে। খাবারের সঙ্গে চর্বি থাকলে পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার গতি কিছুটা ধীর হতে পারে। ফলে কার্বোহাইড্রেট থেকে তৈরি গ্লুকোজ রক্তে তুলনামূলক ধীরে পৌঁছাতে পারে।

এই কারণেই ভাতের সঙ্গে সামান্য ঘি খেলে খাবারের পর রক্তে শর্করার ওঠানামা কিছুটা ধীর হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘি মেশানো ভাত ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসা বা নিরাপদ খাবার।

ঘি কি ভাতের রক্তে শর্করার প্রভাব কমিয়ে দেয়?

এই বিষয়টি নিয়ে কিছু গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে একটি ছোট গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ঘি দিয়ে রান্না করা সাদা ভাতের সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি দেখা হয়েছিল। তবে এমন সীমিত গবেষণার ফল থেকে সবার জন্য একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘি যোগ করলে খাবারে মোট ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই শুধু ভাতের সঙ্গে ঘি মেশানোর কারণে খাবারকে ডায়াবেটিসবান্ধব ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে ভাতের পরিমাণ, সঙ্গে থাকা সবজি, ডাল বা প্রোটিনের পরিমাণ এবং পুরো দিনের খাদ্যাভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সবজির সঙ্গে ঘি খেলে পুষ্টি শোষণে সাহায্য করতে পারে

ঘি চর্বি। আর শরীরের কিছু ভিটামিন ও উদ্ভিজ্জ উপাদান চর্বির উপস্থিতিতে ভালোভাবে শোষিত হয়।

যেমন গাজর, কুমড়া, পালং শাক ও অন্যান্য সবুজ শাকসবজিতে থাকা কিছু ক্যারোটিনয়েড শরীর চর্বির সঙ্গে খেলে তুলনামূলক ভালোভাবে শোষণ করতে পারে। গবেষণায় খাদ্যতালিকায় চর্বি থাকার সঙ্গে ক্যারোটিনয়েডের জৈবপ্রাপ্যতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

ছবি: গুড হাউজকিপিং
ছবি: গুড হাউজকিপিং

অর্থাৎ ভাতের সঙ্গে যদি ডাল, সবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থাকে, সামান্য ঘি সেই খাবারের কিছু চর্বিতে দ্রবণীয় উপাদান শোষণে সহায়তা করতে পারে।

তবে এর জন্য ঘি বেশি পরিমাণে খাওয়ার প্রয়োজন নেই।

ঘিতে কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে?

ঘিতে চর্বি ছাড়াও কিছু চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন থাকতে পারে। এর মধ্যে এ, ডি, ই ও কে ভিটামিনের কথা প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। তবে ঘিতে এসব ভিটামিনের পরিমাণ উৎপাদন পদ্ধতি ও দুধের উৎসের ওপর নির্ভর করতে পারে।

ঘিতে কিছু স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিডও থাকে। এর মধ্যে বিউট্রেট নিয়ে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। তবে এক চামচ ঘি খেয়ে উল্লেখযোগ্য চিকিৎসাগত উপকার পাওয়া যাবে, এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই।

ঘির গন্ধ কেন এত আকর্ষণীয়?

গরম ভাতের ওপর ঘি দেওয়ার অন্যতম আকর্ষণ হলো এর গন্ধ।

ঘি তৈরির সময় মাখন থেকে পানি ও দুধের কঠিন অংশ আলাদা করা হয়। এই প্রক্রিয়ার কারণে ঘিতে একটি বিশেষ বাদামি ও মিষ্টি ধরনের সুগন্ধ তৈরি হয়। গরম ভাতের ওপর ঘি দিলে সেই সুগন্ধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

খাবারের স্বাদ শুধু জিহ্বা দিয়ে অনুভূত হয় না। গন্ধও খাবারের স্বাদ ও তৃপ্তির অনুভূতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে অল্প ঘি দিয়েও ভাত বা ডালের মতো সাধারণ খাবারে আলাদা স্বাদ ও গন্ধ যোগ হয়।

ঘি খেলে কি বেশি সময় পেট ভরা থাকে?

চর্বি হজম হতে কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় বেশি সময় নেয়। তাই খাবারে কিছুটা চর্বি থাকলে পেট ভরা অনুভূতি কিছুটা দীর্ঘ হতে পারে।

ঘির গন্ধ ও স্বাদও খাবারকে বেশি তৃপ্তিদায়ক করে তুলতে পারে। তবে একজন মানুষ কতক্ষণ পেট ভরা অনুভব করবেন, তা শুধু ঘির ওপর নির্ভর করে না। খাবারের মোট পরিমাণ, প্রোটিন, আঁশ, শারীরিক কার্যকলাপ ও ব্যক্তির বিপাকীয় বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ওজন কমানোর উপায় হিসেবে ভাতে ঘি যোগ করার পরামর্শ দেওয়া যায় না।

আয়ুর্বেদেও ঘির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে

আয়ুর্বেদে বহুদিন ধরেই ঘিকে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ও উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আয়ুর্বেদিক ধারণায় ঘি হজমশক্তি ও শরীরের পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত হয়েছে।

তবে আয়ুর্বেদের ঐতিহ্যগত ধারণা এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এক বিষয় নয়। তাই আয়ুর্বেদে কোনো খাবারকে উপকারী বলা হয়েছে বলেই সেটি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত স্বাস্থ্যকর চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

ঘি কি হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য ভালো?

ঘিকে স্বাস্থ্যকর চর্বি হিসেবে একেবারে অবাধে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া ঠিক নয়।

ঘিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পৃক্ত চর্বি থাকে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বেশি সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। তাই হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য সম্পৃক্ত চর্বির পরিবর্তে অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ছবি: পাহাড়ি অওরা
ছবি: পাহাড়ি অওরা

২০২৬ সালের আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশনাতেও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং সম্পৃক্ত চর্বির বদলে অসম্পৃক্ত চর্বি বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তাই গরম ভাতে এক চামচ ঘি খাওয়া এবং প্রতিদিন বেশি পরিমাণ ঘি খাওয়া এক বিষয় নয়।

তাহলে গরম ভাতে কতটা ঘি খাওয়া উচিত?

এর কোনো একক পরিমাণ সবার জন্য নির্ধারণ করা যায় না। কারণ একজন মানুষের মোট ক্যালরি, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন, বয়স এবং অন্যান্য খাবারের ওপর প্রয়োজন নির্ভর করে।

তবে ঘি যেহেতু ক্যালরি ও সম্পৃক্ত চর্বিতে সমৃদ্ধ, তাই অল্প পরিমাণে খাওয়াই যুক্তিসঙ্গত। ভাতের সঙ্গে ঘি দিলে অন্যান্য চর্বিযুক্ত খাবারের পরিমাণও বিবেচনায় রাখা উচিত।

বিশেষ করে যাদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে বা চিকিৎসক সম্পৃক্ত চর্বি কমাতে বলেছেন, তাদের খাদ্যতালিকায় ঘির পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

গরম ভাতে ঘি খাওয়ার স্বাস্থ্যকর উপায় কী?

ঘি খেতে চাইলে শুধু সাদা ভাত ও বেশি ঘি খাওয়ার বদলে খাবারটি ভারসাম্যপূর্ণ করা ভালো। এক প্লেট ভাতে রাখতে পারেন-

  • পরিমিত ভাত
  • ডাল
  • বিভিন্ন ধরনের সবজি
  • মাছ, ডিম বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যকর প্রোটিন
  • অল্প পরিমাণ ঘি

এভাবে খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রোটিন, আঁশ, ভিটামিন ও খনিজও যুক্ত হবে।

শুধু ঘি যোগ করলেই খাবার স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। পুরো খাবারের ধরনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও একক কোনো খাবারের বদলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসকে গুরুত্ব দিয়েছে।

গরম ভাতে ঘি খাওয়ার ঐতিহ্য কেন টিকে আছে?

এর পেছনে শুধু স্বাস্থ্যগত ধারণা নয়, স্বাদ, গন্ধ, রান্নার সুবিধা ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসও রয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাত, ডাল ও সবজির সঙ্গে ঘি ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ঘি দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং রান্নায় সহজে ব্যবহার করা যায়। ফলে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা সময়েও এটি ছিল দুধজাত চর্বি সংরক্ষণের একটি কার্যকর উপায়।

তার সঙ্গে গরম ভাতে ঘির গন্ধ ও স্বাদ সাধারণ খাবারকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এই ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক কারণগুলোই সম্ভবত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘির ব্যবহার টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।

গরম ভাতের সঙ্গে সামান্য ঘি খাওয়ার অভ্যাসের পেছনে শুধু স্বাদ নয়, খাবারের হজম ও পুষ্টি শোষণের কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। খাবারে চর্বি থাকলে পাকস্থলী থেকে খাবার বের হওয়ার গতি ধীর হতে পারে এবং সবজিতে থাকা কিছু চর্বিতে দ্রবণীয় উপাদান শরীর তুলনামূলক ভালোভাবে শোষণ করতে পারে।

তবে ঘিকে কোনো জাদুকরী স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘিতে সম্পৃক্ত চর্বি ও ক্যালরি রয়েছে। তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি ও প্রোটিনের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্‌স্বাস্থ্যের দিক থেকেও সম্পৃক্ত চর্বির বদলে অসম্পৃক্ত চর্বিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।

অর্থাৎ, গরম ভাতে অল্প ঘি থাকতে পারে একটি স্বাদযুক্ত খাবারের অংশ হিসেবে। কিন্তু শুধু ঘি যোগ করলেই ভাত স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এমন ধারণা ঠিক নয়।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া