logo
Advertisement

অনলাইনে ওষুধ কেনার আগে যে ৫ বিষয় যাচাই না করলে হতে পারে বিপদ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
অনলাইনে ওষুধ কেনার আগে যে ৫ বিষয় যাচাই না করলে হতে পারে বিপদ
ছবি: রয়াল কলেজ অব ফার্মেসি

স্মার্টফোনে কয়েকটি আঙুলের ছোঁয়াতেই এখন ঘরে বসে ওষুধ কেনাকাটার বায়না দেওয়া যায়। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ বেছে নেওয়া এবং বাড়িতে তা পৌঁছে পাওয়ার সুবিধা অনেকের সময় ও পরিশ্রম বাঁচিয়েছে। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয় এমন মানুষ বা বাইরে গিয়ে ওষুধ কেনা যাদের জন্য কঠিন, তাদের কাছে অনলাইন ওষুধালয় বেশ সুবিধাজনক।

তবে ওষুধ অন্য সাধারণ পণ্যের মতো নয়। ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা, নকল ওষুধ কিংবা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা ওষুধ শরীরের ক্ষতি করতে পারে। অনলাইনে ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে তাই শুধু দাম বা মূল্যছাড় দেখলেই হবে না। ওষুধের নাম, মাত্রা, প্রস্তুতকারক, মেয়াদ, মোড়ক এবং সংরক্ষণের বিষয়গুলোও যাচাই করা জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অননুমোদিত অনলাইন উৎস থেকে নিম্নমানের বা নকল চিকিৎসা পণ্য পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসার বিস্তারের কারণে এ ধরনের পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছানোও সহজ হয়েছে।

অনলাইনে ওষুধ কেনার আগে তাই অন্তত এই পাঁচটি বিষয় অবশ্যই যাচাই করে নিন।

ব্যবস্থাপত্রের (invoice) সঙ্গে ওষুধের নাম ও মাত্রা মিলিয়ে নিন

অনলাইনে ওষুধ কেনাকাটার বায়না দেওয়ার সময় প্রথমেই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রটি সামনে রাখুন। এরপর কেনাকাটার তালিকায় যোগ করা ওষুধের নাম, মাত্রা এবং পরিমাণ ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।

এই সময় বিশেষভাবে খেয়াল করতে হবে ওষুধের প্রধান সক্রিয় উপাদান এবং তার মাত্রা ঠিক আছে কি না। অনলাইন ওষুধালয় কোনো বিকল্প ব্র্যান্ড বা স্থলাভিষিক্ত পণ্য দেখালে নিজের সিদ্ধান্তে সেটি গ্রহণ করা উচিত নয়। চিকিৎসক বা ঔষধবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলে তারপর পরিবর্তন করা নিরাপদ।

এই সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনলাইনে ব্যবস্থাপত্র জমা দেওয়ার পর কেনাকাটার তালিকায় ওষুধের তথ্য পরিবর্তিত হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা দরকার।

বিশেষ করে ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের নাম বা মাত্রা পরিবর্তন করা ঠিক নয়। খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরও নিরাপদ অনলাইন ওষুধালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যবস্থাপত্র চাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

বেশি ছাড় দেখেই ওষুধ কিনবেন না

অনলাইনে কোনো ওষুধের দাম বাজারের তুলনায় অনেক কম দেখলে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ তৈরি হয়। তবে অস্বাভাবিক কম দাম দেখলে একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

কম দাম মানেই ওষুধ নকল, এমন নয়। বৈধ ওষুধালয়ও বিভিন্ন সময় ছাড় দিতে পারে। কিন্তু খুব বেশি মূল্যছাড়ের সঙ্গে যদি বিক্রেতার পরিচয়, ওষুধের উৎস বা অনুমোদন নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে সেই ওষুধ না কেনাই ভালো।

কেনার আগে দেখুন-

  • ওষুধের মূল উপাদান ও মাত্রা ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে মিলছে কি না
  • প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পরিচিত ও অনুমোদিত কি না
  • ওষুধটি অনুমোদিত পরিবেশকের কাছ থেকে এসেছে কি না
  • মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ খুব কাছাকাছি কি না
  • মোড়কের তথ্য স্বাভাবিক কি না

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনলাইনে ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে সন্দেহজনকভাবে কম দামকে সতর্কতার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরও সতর্ক করেছে যে কিছু অনিরাপদ অনলাইন ওষুধালয় অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করে। এসব ক্ষেত্রে ওষুধ নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ বা অননুমোদিত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

ওষুধ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা জেনে নিন

ওষুধের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ও মেয়াদ গুরুত্বপূর্ণ নয়, কীভাবে সেটি সংরক্ষণ করা হয়েছে তাও গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু ওষুধ তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল। নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ, যেমন ইনসুলিন, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় না থাকলে ওষুধের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই সময়ের প্রতিবেদনে তাপমাত্রা সংবেদনশীল ওষুধের ক্ষেত্রে তা পৌঁছে দেওয়ার সময় হিমায়িত পরিবহনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা খেয়াল করার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, অননুমোদিত অনলাইন উৎস থেকে ওষুধ কিনলে সেটি কোথায় তৈরি হয়েছে বা কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

তাই কোনো ওষুধ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখার প্রয়োজন হলে বায়না দেওয়ার আগে বিক্রেতার সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।

দ্রুত প্রতিক্রিয়া মান সংকেত বা রেখা সংকেত (QR Code বা বারকোড) থাকলে যাচাই করুন

অনেক ওষুধের মোড়কে দ্রুত প্রতিক্রিয়া মান সংকেত বা রেখা সংকেত থাকতে পারে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যদি এমন কোনো যাচাই ব্যবস্থা দিয়ে থাকে, তাহলে সেটি ব্যবহার করে ওষুধের তথ্য পরীক্ষা করা যেতে পারে।

এই সময়ের প্রতিবেদনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া মান সংকেত বা রেখা সংকেতের মাধ্যমে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, দলীয় নম্বর এবং উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। মান সংকেত থাকলেই কোনো ওষুধ আসল, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। সংকেতের পাশাপাশি মোড়কের অন্যান্য তথ্যও মিলিয়ে দেখতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, ওষুধ হাতে পাওয়ার পর মোড়কের অবস্থা, বানান, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদের তারিখ, ওষুধের চেহারা এবং নিরাপত্তা ছাঁচ পরীক্ষা করা উচিত।

ওষুধ হাতে পাওয়ার পর চালান ও মোড়ক মিলিয়ে নিন

বায়না দেওয়ার পর কাজ শেষ নয়। ওষুধ হাতে পাওয়ার পরও কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করতে হবে।

প্রথমে অনলাইনের মেমো বা বিলটি খুলে রাখুন। এরপর ওষুধের মোড়কের সঙ্গে তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখুন।

বিশেষ করে খেয়াল করুন-

  • ওষুধের নাম ঠিক আছে কি না
  • মূল উপাদান ও মাত্রা ঠিক আছে কি না
  • দলীয় নম্বর মিলছে কি না
  • উৎপাদনের তারিখ ঠিক আছে কি না
  • মেয়াদের তারিখ ঠিক আছে কি না
  • সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সঠিক কি না
  • বায়না করা পরিমাণই এসেছে কি না
  • মোড়ক বা ছাঁচ ক্ষতিগ্রস্ত কি না

এই সময়ের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে প্রতিটি আলাদা পাতায় তথ্য ছাপা আছে কি না, তা দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু বাইরের বাক্স দেখে নিশ্চিত না হয়ে ভেতরের পাতার তথ্যও পরীক্ষা করা উচিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অনলাইনে কেনা ওষুধ হাতে পাওয়ার পর বায়না করা ওষুধের সঙ্গে পাওয়া ওষুধের নাম ও মাত্রা মিলিয়ে দেখা এবং ভেতরের ও বাইরের মোড়কের দলীয় নম্বর ও মেয়াদের তারিখ মিলিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছে।

অনলাইন ওষুধালয় নিরাপদ কি না বুঝবেন কীভাবে

শুধু জালক্ষেত্রের সুন্দর নকশা বা বড় মূল্যছাড় দেখে কোনো অনলাইন ওষুধালয়কে বিশ্বাস করা উচিত নয়।

নিরাপদ অনলাইন ওষুধালয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় দেখা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধের জন্য ব্যবস্থাপত্র চাওয়া, বিক্রেতার বাস্তব ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য থাকা এবং প্রয়োজনে যোগ্য ঔষধবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকা।

খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মতে, অনিরাপদ অনলাইন ওষুধালয়ের কয়েকটি সতর্কসংকেত হলো-

  • ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধ বিক্রি করা
  • লাইসেন্স বা অনুমোদনের তথ্য না থাকা
  • ঔষধবিজ্ঞানীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না থাকা
  • অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করা
  • ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বাভাবিক মোড়কের ওষুধ পাঠানো
  • মেয়াদের তারিখ না থাকা বা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাঠানো
  • ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা পরিষ্কার না করা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এমন জালক্ষেত্র থেকে সতর্ক থাকতে বলেছে, যেগুলো নিজেদের বাস্তব ঠিকানা বা দূরভাষ নম্বর প্রকাশ করে না কিংবা ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধ বিক্রি করে।

ওষুধের মোড়ক অস্বাভাবিক দেখলে কী করবেন

ওষুধ হাতে পাওয়ার পর যদি মনে হয় মোড়কটি আগের পরিচিত মোড়কের মতো নয়, তাহলে সেটিকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে খাওয়া উচিত নয়। যেমন-

বানান ভুল রয়েছে

  • মোড়কের রং বা ছাপ অস্বাভাবিক
  • ছাঁচ ভাঙা
  • মোড়ক ছিঁড়ে যাওয়া
  • মেয়াদের তারিখ নেই
  • বটিকার রং বা আকৃতি অস্বাভাবিক
  • ওষুধের গন্ধ অস্বাভাবিক
  • ভেতরের ও বাইরের মোড়কের তথ্য মিলছে না

এ ধরনের ক্ষেত্রে ওষুধটি না খেয়ে চিকিৎসক বা ঔষধবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, সন্দেহজনক ওষুধের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা উচিত।

নকল ও নিম্নমানের ওষুধ কেন বিপজ্জনক

নকল বা নিম্নমানের ওষুধের সমস্যা শুধু ওষুধ কাজ না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে প্রয়োজনীয় সক্রিয় উপাদান কম বা বেশি থাকতে পারে। আবার ভুল সক্রিয় উপাদান বা ক্ষতিকর কোনো উপাদানও থাকতে পারে।

ফলে রোগের চিকিৎসা ঠিকভাবে নাও হতে পারে। অন্যদিকে ভুল উপাদান থাকলে প্রতিক্রিয়া, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অন্য ওষুধের সঙ্গে ক্ষতিকর বিক্রিয়াও হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অন্তত প্রতি ১০টি ওষুধের মধ্যে একটি নিম্নমানের বা নকল হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। এ ধরনের চিকিৎসা পণ্য অনলাইন ও অনানুষ্ঠানিক বাজারেও পাওয়া যেতে পারে।

অনলাইনে ওষুধ কেনার সময় এই নির্দেশিকাটি মনে রাখুন

ওষুধ বায়না করার আগে দ্রুত একবার দেখে নিতে পারেন-

প্রথমত: ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে নাম, মূল উপাদান, মাত্রা ও পরিমাণ মিলছে কি না।

দ্বিতীয়ত: শুধু মূল্যছাড় দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না, বিক্রেতার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করেছেন কি না।

তৃতীয়ত: তাপমাত্রা সংবেদনশীল ওষুধ হলে সংরক্ষণ ও পৌঁছে দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়েছে কি না।

চতুর্থত: দ্রুত প্রতিক্রিয়া মান সংকেত বা রেখা সংকেত থাকলে প্রস্তুতকারকের দেওয়া যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহার করুন এবং দলীয় নম্বর ও মেয়াদের তথ্য পরীক্ষা করুন।

পঞ্চমত: ওষুধ হাতে পাওয়ার পর চালান, মোড়ক, পাতা, দলীয় নম্বর ও মেয়াদের তারিখ মিলিয়ে নিন।

অনলাইনে ওষুধ কেনা সময় বাঁচায়, কিন্তু একটু অসতর্কতা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই ওষুধ বায়না করার সময় শুধু দাম বা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া নয়, বিক্রেতার নির্ভরযোগ্যতা এবং ওষুধের গুণমানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষ করে ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্র্যান্ড বা মাত্রা পরিবর্তন করবেন না। ওষুধ হাতে পাওয়ার পর মোড়ক, দলীয় নম্বর, মেয়াদের তারিখ এবং চালান মিলিয়ে নিন। কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে বা ওষুধটি নিয়ে সন্দেহ হলে সেটি খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা ঔষধবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন।

সূত্র:এই সময়