ঘুম থেকে উঠেই কফি, নাকি কিছুক্ষণ পরে? জানুন সঠিক সময়
-19c334-720x405.webp)
অনেকের দিনের শুরু হয় সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ গরম কফি পান করে। আবার অনেকের কাছে কফি ছাড়া শুধু সকালই না, সারাটা দিনই যেন অসম্পূর্ণ। কেউ কেউ আবার মনে করেন, ঘুম থেকে উঠেই কফি খেলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের সমস্যা হয়।
তাই কফি খাওয়ার সঠিক সময় নিয়ে নানান জনের নানান মত।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে কর্টিসল নামের হরমোনের মাত্রা বেশি থাকে বলে বিভিন্ন গবেষণার দাবি। তাই ঘুম থেকে উঠেই কফি না খেয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে কফি খাওয়া ভালো বলে অনেকেই মনে করেন।
বিষয়টি কি এতটাই সরল? না। একটু দেরি করে কফি খেলেই বেশি শক্তি পাওয়া যাবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
তাহলে কফি খাওয়ার সেরা সময় কখন? উত্তরটি নির্ভর করে আপনার ঘুমের সময়, দৈনন্দিন কাজ, শরীরের প্রতিক্রিয়া এবং কফি খাওয়ার উদ্দেশ্যের ওপর।
ঘুম থেকে উঠেই কফি খাওয়া কি খারাপ?
না। ঘুম থেকে উঠেই কফি খেলে ক্ষতি হবে, এমন প্রমাণ নেই।
ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে কর্টিসলের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে থাকে। সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর এটি বেশি থাকে এবং পরে ধীরে ধীরে কমে। কর্টিসল শরীরকে সতর্ক ও সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
কফির ক্যাফেইনও সতর্কতা বাড়ায়। তাই কেউ যদি সকালে ঘুম থেকে উঠেই কফি খান এবং এতে ভালো বোধ করেন, শুধু কর্টিসলের কথা ভেবে সেই অভ্যাস বদলানোর প্রয়োজন নেই।
সকালে কফি খাওয়ার সময় কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে দিলে অন্যদের তুলনায় বেশি শক্তি পাওয়া যাবে, এমন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

তাহলে সকাল ৯টা ৩০ থেকে ১১টা ৩০টার কথা বলা হয় কেন?
এই ধারণার সঙ্গে মূলত কর্টিসলের দৈনিক ওঠানামার বিষয়টির যোগাযোগ আছে।
সাধারণভাবে সকালে কর্টিসল বেশি থাকে এবং দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে থাকে। তাই ধারণা করা হয়, সকাল একটু গড়িয়ে গেলে শরীরে কর্টিসলের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। তখন ক্যাফেইন গ্রহণ করলে কফির উদ্দীপক প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে।
এজন্যই সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে ১১টা ৩০ মিনিটকে অনেকের জন্য কফি খাওয়ার সম্ভাব্য ভালো সময় বলা হয়। তবে এটি কোনো নিয়ম না। এই সময়ে কফি খেলে সবার বেশি শক্তি বা মনোযোগ বাড়বে, এমন প্রমাণ নেই।
ব্যায়ামের আগে কফি খাওয়ার আলাদা সুবিধা আছে
যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদের জন্য কফি খাওয়ার সময় কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ক্যাফেইন শারীরিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে এবং ব্যায়ামের সময় ক্লান্তি কিছুটা দেরিতে আসতে সাহায্য করতে পারে। হেল্থলাইনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যায়াম বা খেলাধুলার প্রায় ৪৫ মিনিট আগে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে এর প্রভাব কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে কতটা ক্যাফেইন প্রয়োজন, সেটি ব্যক্তিভেদে আলাদা। তাই বেশি কফি খেয়ে ব্যায়ামের উপকার বাড়ানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়।
বিকেলে কফি খেলে কি সমস্যা?
কফির সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে ঘুমের ওপর প্রভাব।
ক্যাফেইন শরীরে কয়েক ঘণ্টা থাকে। হেল্থলাইনের তথ্য অনুযায়ী, অনেকের শরীরে গ্রহণ করা ক্যাফেইনের প্রায় অর্ধেক পাঁচ ঘণ্টা পরও থেকে যেতে পারে। ফলে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে কফি খেলে রাতের ঘুমে সমস্যা হতে পারে।
কারও ক্ষেত্রে অল্প ক্যাফেইনেও ঘুমের সমস্যা হয়, আবার কেউ বিকেলেও কফি খেয়ে রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারেন। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের রাতে ঘুমাতে সমস্যা হয়, তাদের বিকেল বা সন্ধ্যার কফি কমানো ভালো।
কফি কি উদ্বেগ বাড়াতে পারে?
কিছু মানুষের উদ্বেগ ক্ষেত্রে পারে। ক্যাফেইন মস্তিষ্ককে সক্রিয় করে এবং সতর্কতা বাড়ায়। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাফেইন খেলে কারও কারও অস্থিরতা, বিরক্তি, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি বা উদ্বেগ বাড়তে পারে।
তাই কফি খাওয়ার পর যদি আপনার অস্থির লাগে, হাত কাঁপে, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় বা উদ্বেগ বাড়ে, তাহলে পরিমাণ কমিয়ে দেখা যেতে পারে।
কফি খেলে কর্টিসল কি অনেক বেড়ে যায়?
ক্যাফেইন সাময়িকভাবে কর্টিসলের মাত্রা বাড়াতে পারে। সকালে শরীরে কর্টিসল এমনিতেই বেশি থাকায় কফির ক্যাফেইন সেই মাত্রা আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে এখানেও অতিরঞ্জিত হওয়ার দরকার নেই। কফি খাওয়ার কারণে কর্টিসলের সাময়িক বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। নিয়মিত কফি পানকারীদের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের এই প্রভাব কিছুটা কমও হতে পারে।
অর্থাৎ শুধু কর্টিসল কমানোর জন্য সবার সকাল থেকে কফি খাওয়া বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।
দিনে কতটা ক্যাফেইন নিরাপদ?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত নিরাপদ সীমার মধ্যে ধরা হয়। তবে এক কাপ কফিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ কফির ধরন, তৈরির পদ্ধতি ও কাপের আকারের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে।
তাই শুধু কফির কাপ গুনে ক্যাফেইনের পরিমাণ বোঝা যায় না। চা, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক এবং ডার্ক চকোলেট থেকেও ক্যাফেইন শরীরে ঢুকতে পারে।
গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদানের সময় ক্যাফেইনের নিরাপদ মাত্রা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। এ ক্ষেত্রে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিগ্রামের সীমার কথা উল্লেখ করা হয়, তবে ব্যক্তিভেদে পরামর্শ আলাদা হতে পারে।
খালি পেটে কফি খাওয়া যাবে?
বেশির ভাগ মানুষের জন্য খালি পেটে কফি খাওয়া নিজে থেকে ক্ষতিকর নয়। তবে কারও যদি কফি খেলে বুকজ্বালা, পেটের অস্বস্তি বা অন্য কোনো হজমের সমস্যা হয়, তাহলে খাবারের সঙ্গে বা খাবারের পরে কফি খেয়ে দেখতে পারেন।

অর্থাৎ খালি পেটে কফি খাওয়া সবার জন্য নিষেধ, এমন ধারণা ঠিক নয়। শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কফি খাওয়ার আদর্শ সময় কোনটি?
একটি নির্দিষ্ট সময় সবার জন্য সেরা নয়। তবে সাধারণভাবে-
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর: কফি খেতে পারেন, যদি এতে আপনার ভালো লাগে এবং ঘুম বা উদ্বেগের সমস্যা না হয়।
সকাল ৯টা ৩০ থেকে ১১টা ৩০: কর্টিসল তুলনামূলক কমে আসার সময় হওয়ায় এটি কফি খাওয়ার একটি সম্ভাব্য ভালো সময়। তবে এই সময়ে খেলে সবার বেশি শক্তি পাওয়া যাবে, এমন প্রমাণ নেই।
ব্যায়ামের প্রায় ৪৫ মিনিট আগে: কর্মক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কফি খেতে চাইলে এই সময়টি উপকারী হতে পারে।
বিকেল বা সন্ধ্যা: রাতে ঘুমের সমস্যা হলে এ সময় কফি এড়িয়ে চলা ভালো।
কফি খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?
সময় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার চেয়ে মোট ক্যাফেইনের পরিমাণ এবং ঘুমের ওপর এর প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি যদি সকালে কফি খেয়ে সতেজ বোধ করেন, রাতে ভালো ঘুম হয় এবং অতিরিক্ত অস্থিরতা না থাকে, তাহলে ঘুম থেকে ওঠার পর কফি খাওয়াকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
আবার যদি কফি খেলে দুপুরের পর অস্থির লাগে বা রাতে ঘুম না আসে, তাহলে কফি খাওয়ার সময় পিছিয়ে বা পরিমাণ কমিয়ে দেখা যেতে পারে।
কফি খাওয়ার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময়কে সেরা বলা যায় না। সকাল ৯টা ৩০ থেকে ১১টা ৩০টার মধ্যে কফি খাওয়ার পরামর্শ মূলত কর্টিসলের দৈনিক ওঠানামার ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সময়ে কফি খেলে ঘুম থেকে ওঠার পর কফি খাওয়ার তুলনায় বেশি শক্তি পাওয়া যায়, এমন শক্ত প্রমাণ এখনও নেই।
তাই কফি খাওয়ার সময় ঠিক করার ক্ষেত্রে নিজের ঘুম, কাজের সময়সূচি এবং শরীরের প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দিন। তবে রাতে ভালো ঘুমের জন্য ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: হেল্থলাইন
