logo

নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনো দল, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনো দল, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা
নিউজিল্যান্ড ন্যাশনাল পার্টির নেতা ক্রিস্টোফার লুকসন অকল্যান্ডে নির্বাচনের রাতে মঞ্চে তার পরিবারের সাথে সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নাড়ছেন। ছবি: রয়টার্স

নিউজিল্যান্ডের জাতীয় নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় দেশটির সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুকসনের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বামপন্থি বিরোধী জোটের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

নির্বাচন কমিশনের রোববার সকালে প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, আগাম ভোট ও নির্বাচনের দিনের ভোট মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ ভোট গণনা করা হয়েছে। তবে এখনও প্রায় চার লাখ বিশেষ ভোট গণনা বাকি রয়েছে। এসব ভোটের মধ্যে বিদেশে অবস্থানরত নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের দেওয়া প্রায় এক লাখ ভোটও রয়েছে। এ ছাড়া দেশের ভেতরে নিজ নির্বাচনি এলাকার বাইরে থেকে ভোট দেওয়া নাগরিকদের ভোটও এর অন্তর্ভুক্ত।

আগামী ২৭ নভেম্বর নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ ভোটে বামপন্থি দলগুলোর সমর্থন তুলনামূলক বেশি থাকে। অতীতে এসব ভোটের কারণে লেবার পার্টি ও গ্রিন পার্টি ডানপন্থি জোটের কাছ থেকে এক বা দুটি অতিরিক্ত আসন পেয়েছে। এবারও বিশেষ ভোটের ফল নির্বাচনের চূড়ান্ত হিসাব পাল্টে দিতে পারে।

আসন বণ্টনে জটিল সমীকরণ

নিউজিল্যান্ডে মিক্সড-মেম্বার প্রোপোরশনাল (এমএমপি) পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ ব্যবস্থায় ভোটাররা দুটি ভোট দেন। একটি নিজ নির্বাচনি এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি পছন্দের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন জানাতে।

দেশটির ৭১টি নির্বাচনি এলাকার বিজয়ীরা সরাসরি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাকি আসনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। সাধারণত অন্তত পাঁচ শতাংশ দলীয় ভোট পাওয়া দলগুলো সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়।

তবে এবারের নির্বাচনে আসন বণ্টনে বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনি ব্যবস্থায় ‘ওভারহ্যাং’ নামে পরিচিত। কোনো দল দলীয় ভোটের অনুপাতে যত আসন পাওয়ার কথা, স্থানীয় নির্বাচনি এলাকায় তার চেয়ে বেশি আসনে জয়ী হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ন্যাশনাল পার্টি মোট দলীয় ভোটের ২৯ দশমিক ২১ শতাংশ পেয়েছে। এই হিসাবে দলটির ৩৬টি আসন পাওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনি এলাকায় ৪২টি আসনে জয়ী হয়েছে তারা। ফলে দলটি অতিরিক্ত ছয়টি আসন পেয়েছে।

অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী বামপন্থি দল তে পাতি মাওরি এক শতাংশেরও কম দলীয় ভোট পেয়েও পাঁচটি নির্বাচনি এলাকায় জয়লাভ করেছে। এর ফলে দলটির ক্ষেত্রেও পাঁচটি অতিরিক্ত আসনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রাথমিক ফলাফলে দেশটির সংসদ সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১-এ, যা নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এতসংখ্যক সংসদ সদস্যের জন্য ওয়েলিংটনের সংসদ ভবনের প্রচলিত বিতর্ককক্ষে জায়গা সংকুলান নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এখন বিশেষ করে কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনি এলাকার ফলের দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। এসব আসনে ভোটের ব্যবধান খুব কম হওয়ায় বিশেষ ভোট গণনার পর ফল পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ দুটি আসন হ্যামিল্টন ইস্ট ও ওয়াইরারাপায় লেবার পার্টির প্রার্থীরা কয়েকশ ভোটের ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছেন। বিশেষ ভোটের কারণে ন্যাশনাল পার্টির দখলে থাকা কয়েকটি আসনের ফলও পাল্টে যেতে পারে।

লেবার পার্টি ওই দুটি আসনে জয়ী হওয়ার পাশাপাশি অন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারলে ন্যাশনাল পার্টির আসনসংখ্যা ও সংসদের আকার কিছুটা কমতে পারে। তবে এতে ডানপন্থি জোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ হচ্ছে না।

অন্যদিকে, লেবার পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটকে সরকার গঠন করতে হলে নির্বাচনি আসন ও দলীয় ভোটের হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে। ন্যাশনাল পার্টির অতিরিক্ত ছয়টি আসনের সুবিধা বিরোধীদের জন্য এই সমীকরণ আরও কঠিন করে তুলেছে।

সরকার গঠনে জোট আলোচনার অপেক্ষা

আগামী ২৭ নভেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক দলগুলো নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে। তবে আগের নির্বাচনের পর সরকার গঠনে ছয় সপ্তাহ ধরে জোট আলোচনা চলার অভিজ্ঞতা থাকায় এবারও সমঝোতা চূড়ান্ত হতে সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ন্যাশনাল পার্টি, উদারপন্থী অ্যাক্ট পার্টি এবং জনতুষ্টিবাদী এনজেড ফার্স্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত জোট ক্ষমতায় রয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে দেশ পরিচালনা করা এই তিন দলের নেতারা আবারও একসঙ্গে সরকার গঠনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তবে বিশেষ ভোটের ফল বিরোধী জোটের পক্ষে গেলে ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে লেবার পার্টি, গ্রিন পার্টি, তে পাতি মাওরি এবং মধ্যপন্থি অপরচুনিটি পার্টিকে নিয়ে চার দলের জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

অপরচুনিটি পার্টির নেতা কিউলায়ে ওং জানিয়েছেন, তার দল সরকার গঠনের আলোচনায় প্রথমে নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।

সব মিলিয়ে বিশেষ ভোটের ফল এবং সম্ভাব্য জোট আলোচনা, এই দুইয়ের ওপর নির্ভর করছে নিউজিল্যান্ডের পরবর্তী সরকারের ভাগ্য। চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।