আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা চালাল যুক্তরাষ্ট্র

দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর উচ্চাভিলাষী অত্যাধুনিক ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উদ্যোগ গ্রহণ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে তার ব্যয়বহুল ও বহুল আলোচিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পটির নাম ছিল ‘আয়রন ডোম’। তবে এবারের ‘গোল্ডেন ডোম ফর আমেরিকা’ প্রকল্পের দুই দফার অত্যন্ত গোপন পরীক্ষায় অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) অ্যালবামের হান্টসভিলে অনুষ্ঠিত স্পেস অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন স্পেস ফোর্সের জেনারেল মাইকেল এ. গেটলেইন এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। ২০২৮ সালের মধ্যে সমগ্র মহাদেশীয় যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রুপক্ষের হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি থেকে রক্ষা করতে ‘গোল্ডেন ডোম’ পুরোপুরি কার্যকর হবে।
জেনারেল গেটলেইন বলেন, আমরা দুটি পরীক্ষা চালিয়েছি। পরীক্ষাগুলো নিয়ে কথা বলতে পারব না। কিন্তু সেই পরীক্ষাগুলো অভূতপূর্বভাবে সফল ছিল। সেগুলো প্রমাণ করেছে যে, আমরা যে সক্ষমতাগুলো গড়ে তুলছি, অর্থাৎ কমান্ড ও কন্ট্রোল, সেন্সর নেটওয়ার্ক ও আমাদের ইফেক্টরগুলো বর্তমানে পরিকল্পিত হুমকিগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর হবে। এগুলোর মধ্যে একটি জুন মাসে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে পরিচালিত হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আকাশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ‘গোল্ডেন ডোম’-এর সাম্প্রতিক পরীক্ষাকে আকাশ প্রতিরক্ষা পরীক্ষার ইতিহাসে অন্যতম জটিল পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মিশনটিকে ‘সম্পূর্ণ সফল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ২০২৮ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে এর বিশাল বাজেট ও অর্থায়ন জটিলতা।
হোয়াইট হাউসের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে ডিফেন্স সিস্টেমটির সবচেয়ে জটিল মহাকাশ-ভিত্তিক সেন্সর ও সমরাস্ত্র নেটওয়ার্ক তৈরির পেছনে।
অবশ্য কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও) দীর্ঘমেয়াদে এর ব্যয় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান করেছে। কংগ্রেসের অর্থায়ন বাজেট নিয়ে সমঝোতা না হলে ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পেন্টাগন কর্মকর্তারা।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ‘গোল্ডেন ডোম’ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জরুরি। কারণ চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরো দেশকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো সক্ষম নয়। ফলে শত্রুপক্ষের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ওয়াশিংটন।
তবে গোল্ডেন ডোমের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো গোপন রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রকল্পটির অর্থায়ন নিয়েও কংগ্রেসের আইনপ্রণেতা ও পেন্টাগনের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের জন্য নির্ধারিত প্রথাগত সমরাস্ত্রের মজুত থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রেখেই ট্রাম্পের এই স্বপ্নের প্রকল্প ‘গোল্ডেন ডোম’-এর পূর্ণাঙ্গ নকশা ও কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে।
দ্য ওয়াশিংটন টাইমসের ‘থ্রেট স্ট্যাটাস’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গোল্ডেন ডোমের উপপরিচালকের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ব্রায়ান ডব্লিউ গিবসন বলেন, কংগ্রেস থেকে বরাদ্দ হওয়া গোল্ডেন ডোমের প্রতিটি ডলারের ওপর নজর রাখছে পেন্টাগন।
তার মতে, গোল্ডেন ডোমের লক্ষ্য শুধু প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাড়ানো নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের হুমকি মোকাবিলায় একাধিক ধরনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায় ওয়াশিংটন, যাতে বিদেশি সংঘাতে ব্যবহৃত একই ধরনের ইন্টারসেপ্টর বা অস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়।
গিবসন বলেন, গোল্ডেন ডোমের অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর চারপাশে বিপুলসংখ্যক প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসানো হবে কিংবা উপকূলে ‘এজিস ডেস্ট্রয়ার’ মোতায়েন করা হবে। বর্তমান হুমকি মোকাবিলায় এসব ব্যবস্থা ব্যবহার করা সম্ভব হলেও, গোল্ডেন ডোমের পরিকল্পনা তার চেয়ে ভিন্ন।
গোল্ডেন ডোম ফর আমেরিকা প্রকল্পটির উপ-পরিচালক জেনারেল গেটলেইন জানান, ‘গোল্ডেন ডোম’ ঐতিহ্যগত প্যাট্রিয়ট বা থাড মিসাইল ব্যাটারির ওপর নির্ভর না করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও বহুমুখী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলবে। চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিপরীতে এটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমন্বিত কমান্ড ও কন্ট্রোল এবং এআই-চালিত প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে।


