logo

নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮৯, আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা

রয়টার্স
রয়টার্স
নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮৯, আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও কাদা ধসের পর নেপালি সেনাবাহিনীর সদস্যরা একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিকে স্ট্রেচারে করে সরিয়ে নিচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স

হিমালয় অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ ভূমিধসে নেপাল এবং তিব্বতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৮৯ জনে পৌঁছেছে। দুই দিন আগে একটি বিশাল হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া এই প্লাবনে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫০০ জনেরও বেশি বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী।

Advertisement

এদিকে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকারীরা যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে তল্লাশি চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই জমে থাকা কাদা ও পাথরে ভটকোশী নদীতে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়ে নদীপ্রবাহ আটকে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি ভেঙে পড়ে নতুন করে আরও বড় বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে তিব্বত অঞ্চলে হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও কাদার এক বিশাল স্রোত নেমে আসে হিমালয়ের নদীগুলোতে। মুহূর্তের মধ্যেই তা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসার সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও নদীর তীরবর্তী একের পর এক গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

দুর্গত এলাকার বাসিন্দা জনক বাহাদুর আকস্মিক এই ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘হঠাৎ যেন এক বিশাল বোমার বিস্ফোরণ ঘটল! নদীটা দূর থেকে শান্ত মনে হলেও নিমেষের মধ্যেই কানায় কানায় ভরে উঠে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল।’

সব হারিয়ে বাকরুদ্ধ বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো। রসুল এলাকা থেকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার হওয়া ডিবগা তামাং নামের এক বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। পরিবার-স্বজনদের সবাই মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ কোথাও বেঁচে নেই।’

তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

সীমান্তের ওপর পাশে চীনের তিব্বত অংশের গ্যিরোং কাউন্টিতেও আঘাত হেনেছে এই প্রলয়ঙ্করি বন্যা। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, তিব্বতে নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫৫৮ জন, যার মধ্যে ২৬০ জনই বিদেশি নাগরিক। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের অন্যতম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র গ্যিরোং পোর্টের অবকাঠামো ও যানবাহন সেকেন্ডের মধ্যে নদীর তোড়ে গুঁড়িয়ে গেছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতা বিবেচনায় চীনের প্রিমিয়ার লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বেইজিং এই দুর্যোগ মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য ও বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ

নিখোঁজদের তালিকায় ভারত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রায় দুই ডজন দেশের নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজদের পরিবারগুলো উদগ্রীব হয়ে স্বজনদের খবরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

এ ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্ণ সহায়তার বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিশাল ও শক্ত ভবনগুলো এমনভাবে গুঁড়িয়ে গেছে যেন তাসের ঘর। আমরা প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা পাঠাচ্ছি।’ ভারতের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্ধারকাজে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

নতুন প্লাবনের ঝুঁকি

উদ্ধার অভিযানের মধ্যেই নতুন কৃত্রিম বাঁধ ভাঙার আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। পাহাড়ি ধসের পর কাদা ও পাথরে ভটকোশী নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে হ্রদে রূপ নিয়েছে। চীন সরকারের তথ্যমতে, সীমান্তে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে যা ১২০০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের পানির সমান। আগামী ১ সেপ্টেম্বর নাগাদ এই হ্রদের পানি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাবে এবং এটি ভেঙে তলার নিম্নাঞ্চল ভাসিয়ে দিতে পারে।

উদ্ধারতৎপরতা ও সরকারি পদক্ষেপ

নেপালের চিতওয়ান জেলার পুলিশ জানিয়েছে, মূল ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার নিম্নে নদী থেকে শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে মরদেহের চাপ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় সাময়িক তাঁবু খাটিয়ে শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের পর নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ জানান, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারের সব সংস্থা সর্বাত্মক শক্তিতে মাঠে নেমেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য এখন প্রতিটি জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা, নিখোঁজদের সন্ধান ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছানো।’ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ২০১৫ সালের ৮.১ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্প সামলানোর অভিজ্ঞতার কথাও মনে করিয়ে দেন।

নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৮৯, আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা