সিকিমে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ৪০ হ্রদ, ১৬ হ্রদের বাঁধ ভেঙে বিপর্যয়ের শঙ্কা

হিমবাহ ধসে নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে নতুন করে দুসংবাদ পাওয়া গেছে। তীব্র পানির চাপে চীন-নেপাল সীমান্তে ব্যারিয়ার হ্রদে ধসের আশঙ্কার মধ্যে এই খবর সামনে এলো। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত সিকিম রাজ্য এই উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। হিমালয় অঞ্চলে প্রতিনিয়ত হিমবাহ গলে নতুন হ্রদের সৃষ্টি ও বিদ্যমান হ্রদগুলোর আয়তন বৃদ্ধি পাওয়ায় হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত (জিএলওএফ) বন্যার ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে সিকিমের ঠিক ভাটিতেই অবস্থান করছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং শহর, যা কি না কৌশলগত ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের অংশ। হিমবাহ ধসে সিকিমে বিপর্যয় নেমে আসলে শুধু ভারতের দার্জিলিং বা শিলিগুড়ি অংশই ভয়াবহ পরিণতির শিকার হবে না, বরং তারও নিম্নাংশে অবস্থিত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদেনে বলা হয়েছে, জিএলওএফ-এর অংশ হিসেবে ভারতে সিকিম রাজ্যে মোট ৪০টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি হ্রদকে ‘ক’ অর্থাৎ সর্বোচ্চ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এসব হ্রদ হঠাৎ ফুটে বা ভেঙে গেলে ভাটির জনবসতি ও অবকাঠামোর ওপর চরম বিধ্বংসী প্রভাব পড়তে পারে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসের কারণে গত ২৬ আগস্ট নেপালে একটি বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় পুরো হিমালয়জুড়ে পরিবেশগত উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমে এক ভয়াবহ হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণে অন্তত ৬০ জন প্রাণ হারান এবং চুংথাং জলবিদ্যুৎ বাঁধ ধ্বংসসহ মাঙ্গান, গ্যাংটক, পাকিয়ং ও নামচি জেলাজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সিকিমে আয়োজিত এক সচেতনতা কর্মশালায় রাজ্যের প্রধান সচিব সন্দীপ তাম্বে জানান, চিহ্নিত ৪০টি হ্রদের মধ্যে ১৬টি ‘ক’ বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে এবং ২টি ‘খ’ বা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। নয়টি হ্রদকে ‘গ’ বিভাগে (মাঝারি থেকে নিম্ন ঝুঁকি) রাখা হয়েছে এবং বাকি ১৩টির শ্রেণীকরণ প্রক্রিয়া চলছে। শ্যাকো ছো, লোনাক কমপ্লেক্স ও গুরুদংমার কমপ্লেক্সের জন্য পৃথক দুর্যোগ প্রশমন প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে শ্যাকো ছো হ্রদটিকে রাজ্যের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিকিম সরকার দেশের প্রথম বিশেষায়িত ‘হিমবাহ বন্যা ঝুঁকি প্রশমন প্রোটোকল’ তৈরির কাজ করছে। সিকিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ এই বিশাল কর্মকাণ্ডে নোডাল সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। হিমবাহ হ্রদের পানি সাইফনিং, পাম্পিং, চ্যানেল তৈরি বা কৃত্রিম সুড়ঙ্গ খনন করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার একাধিক উপায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হিমালয় অঞ্চলের রাজ্যগুলোর দুর্যোগ প্রস্তুতি পর্যালোচনায় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহনের সভাপতিত্বে এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিকিমে অতিরিক্ত আগাম সতর্কীকরণ সেন্সর স্থাপনের নীতিগত আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এই প্রোটোকল ও বৈজ্ঞানিক কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে তা ভারতের অন্যান্য হিমালয় অঞ্চলের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

