logo

ইয়েমেনের নতুন সংঘাতে বাস্তুচ্যুত ২ লাখ ৯০ হাজার: জাতিসংঘ

ইয়েমেনের নতুন সংঘাতে বাস্তুচ্যুত ২ লাখ ৯০ হাজার: জাতিসংঘ
ইয়েমেনের এডেনের শেখ উসমান জেলায় অবস্থিত আল-কোদ আল-উসমানি বাস্তুচ্যুত শিবিরে, ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ (এমএসএফ)-এর দেওয়া চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অপেক্ষায় বসে আছেন বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনি নাগরিকরা। ছবি: এপি ফটো

ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় গত আগস্ট থেকে অন্তত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) এ তথ্য জানিয়েছে। সংঘাতের কারণে বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার সমর্থিত বাহিনী ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে তাইজ প্রদেশ ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আলজাজিরা।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রকাশিত ওসিএইচএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে আশ্রয় নেওয়া ৬৫ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীও দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখে রয়েছেন। সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে।

সম্প্রতি বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের মধ্যে অন্তত ৬ হাজার ১০০ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬০০ জনের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা রয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরে চিকিৎসাসেবা দিতে ভ্রাম্যমাণ দল ও ধাত্রী পাঠিয়েছে জাতিসংঘ। এ ছাড়া বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার মানুষের কাছে খাদ্য, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী ও জরুরি নগদ সহায়তা পৌঁছে দিতে পেরেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় ৭৫ শতাংশ এই সহায়তা পেয়েছেন।

ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরুর পাশাপাশি প্রতিবেশী সৌদি আরবেও উত্তেজনা বাড়ছে। শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ অঞ্চলের আকাশে একটি ‘শত্রুতাপূর্ণ’ ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে।

জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। দুই দিনের মধ্যে রিয়াদ অঞ্চলে এটি দ্বিতীয় ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনা।

এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব জানিয়েছিল, মক্কা, মদিনা ও রিয়াদের কাছে কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া একটি হুতি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়।

তবে হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি এসব অভিযোগকে ‘জঘন্য মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন।

ইসলামের দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগও বারবার অস্বীকার করেছে হুতিরা। তবে সৌদি রাজধানী, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দায় তারা স্বীকার করেছে।

গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। বৈঠকের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সঙ্গে যৌথভাবে সৌদি আরবে হুতিদের হামলার নিন্দাও জানান ফয়সাল।

এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার শুক্রবার জানিয়েছে, হুতিরা অন্তত তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মা'আশিক লক্ষ্য করে। এটিই দেশটির অন্তর্বর্তী রাজধানীতে সরকারের প্রধান কার্যালয়।

এ ছাড়া এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সরকার। এর আগে হুতিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামতকাজ শেষে বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরটি আবার চালু করা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ও বিমানবন্দরটি বারবার হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

ইয়েমেন সরকারের মন্ত্রিসভা এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে। বিমানবন্দরে হামলাকে নাগরিকদের স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে তারা বলেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করাই হুতিদের উদ্দেশ্য।

সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি শুক্রবার দাবি করেন, সাম্প্রতিক কয়েক ঘণ্টার অভিযানে প্রায় ৩৩৬ জন হুতি যোদ্ধা ও কমান্ডারকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১২টি যানবাহন, অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।

তাইজ, মারিব, আল-জাওফ ও আল-বায়দাসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে হুতিদের কমান্ড সেন্টার, সেনা সমাবেশ ও সরবরাহপথ লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে

ইয়েমেনের সরকারি বার্তা সংস্থা সাবার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাইজ প্রদেশে হুতিদের হামলায় একজন বেসামরিক নারী নিহত এবং এক শিশুসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। গোলাবর্ষণ ও গুলিতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।

জাতিসংঘের হিসাবে, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে ২৭০ জন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অর্ধেকই শিশু।

অন্যদিকে, ইয়েমেন নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস জানিয়েছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাইজ প্রদেশে তাদের মাঠপর্যায়ের দল হুতিদের হাজারো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৮৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৮ শিশু ও ২৭ নারী রয়েছেন।

সংগঠনটির দাবি, এ সময়ে ২৩টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ৩০০টির বেশি অপহরণ ও জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে।

সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের প্রায় ২০ লাখ মানুষ খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই তাইজ শহরটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। চলতি মাসে আল-তুরবাহসহ শহরটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা দখলে নেওয়ার পর তাইজকে ঘিরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে হুতিরা। এতে শহরটির মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল ইয়েমেনের যুদ্ধ?

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতি বাহিনী রাজধানী সানা দখল করলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে সরকার রাজধানী ছেড়ে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হয়।

২০১৫ সালের মার্চে সরকারপন্থী বাহিনীকে সহায়তা করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করলে যুদ্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধবিরতি হলেও নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর পর হুতি প্রতিনিধিদল বহনকারী একটি বিমান সেখানে অবতরণ করতে পারেনি। এরপর হুতিরা ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

অন্যদিকে, হুতিদের দখলে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার।

নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত পরিবার, শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।