মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা আনতে জাপানের নতুন অভিযান

সৌরজগতের উৎপত্তি এবং পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের রহস্য অনুসন্ধানে মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার এক উচ্চাভিলাষী মহাকাশ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে জাপান। ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) নামের এ অভিযানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মঙ্গল অঞ্চলে গিয়ে সেখান থেকে নমুনা নিয়ে পৃথিবীতে ফেরার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সা) পরিচালিত এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এ অভিযান সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর প্রস্তুতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাক্সার পরিকল্পনা অনুসারে, এমএমএক্স মহাকাশযান বহনকারী এইচ-৩ রকেটটি জাপানের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে রকেটটির যাত্রা শুরু হওয়ার কথা, যা গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী সোমবার রাত ৭টা ৪১ মিনিট।
ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে মহাকাশযান
উৎক্ষেপণের প্রায় এক বছর পর মহাকাশযানটি মঙ্গলের কাছে পৌঁছানোর কথা। এরপর মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোসকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ তিন বছর ধরে পর্যবেক্ষণ চালাবে এটি। পর্যবেক্ষণ শেষে ফোবোসের পৃষ্ঠে অবতরণ করে অন্তত ১০ গ্রাম বালু ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
অবতরণের আগে ‘আইডেফিক্স’ নামের একটি ছোট রোভার ফোবোসের পৃষ্ঠ পরীক্ষা করবে। এর মাধ্যমে নিরাপদে অবতরণের উপযুক্ত স্থান শনাক্ত করা হবে। ফরাসি কমিকসের জনপ্রিয় চরিত্র অ্যাস্টেরিক্সের কুকুরের নাম অনুসারে রোভারটির নাম রাখা হয়েছে।
এমএমএক্স প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ইয়াসুহিরো কাওয়াকাতসু এএফপিকে বলেন, ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ বিশ্বে প্রথম। একই সঙ্গে মঙ্গল অঞ্চলে গিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার ক্ষেত্রেও এটি একটি ঐতিহাসিক অভিযান হতে যাচ্ছে।
জাক্সা জানিয়েছে, ফোবোসকে সম্ভাব্য ‘প্রাকৃতিক মহাকাশ স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও এ অভিযানে পরীক্ষা করা হবে। মঙ্গলে যাওয়া ও সেখান থেকে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে মানুষবাহী অভিযান পরিচালনা সহজ হতে পারে।
এ ছাড়া মহাকাশযানটি মঙ্গলের অপর উপগ্রহ ডেইমোসও পর্যবেক্ষণ করবে। তবে সেখানে অবতরণ না করে ফোবোস থেকে সংগৃহীত নমুনা নিয়েই পৃথিবীতে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।
মঙ্গলের দুই উপগ্রহের উৎপত্তি নিয়ে অনুসন্ধান
ফোবোস ও ডেইমোস কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তা দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এমএমএক্স অভিযানের মাধ্যমে এ বিষয়ে নতুন প্রমাণ পাওয়ার আশা করছেন গবেষকরা।
উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি নিয়ে প্রধানত দুটি তত্ত্ব রয়েছে। প্রথমটি ‘বিশাল সংঘর্ষ অনুমান’। এ ধারণা অনুযায়ী, কোনো মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার পর নির্গত পদার্থ থেকে উপগ্রহ দুটি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
দ্বিতীয় তত্ত্বটি হলো ‘মহাকর্ষীয় আকর্ষণে বন্দি হওয়ার অনুমান’। এ তত্ত্ব অনুসারে, ফোবোস ও ডেইমোস মূলত গ্রহাণু ছিল, যা মঙ্গলের মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়ে উপগ্রহে পরিণত হয়েছে।
এই দুই তত্ত্বের মধ্যে কোনটি সঠিক, তা নির্ধারণ করা গেলে পাথুরে গ্রহগুলোর গঠন এবং প্রাণের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এমএমএক্সের সঙ্গে যুক্ত ফরাসি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী প্যাট্রিক মিশেলের মতে, এ অভিযান সৌরজগতের বাইরের অঞ্চল থেকে ভেতরের পাথুরে গ্রহগুলোতে পানি, উদ্বায়ী পদার্থ ও জৈব যৌগ কীভাবে পৌঁছেছে, তা বুঝতে সহায়তা করবে। এসব উপাদান গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
মিশেল বলেন, ফোবোস ও ডেইমোস যদি প্রাচীনকালে এসব উপাদান পরিবহনের প্রক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নমুনা পাথুরে গ্রহে প্রাণের উদ্ভবের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর উৎস ও বিস্তার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
দুর্বল মহাকর্ষে অবতরণ, ফেরার পথে বড় চ্যালেঞ্জ
এমএমএক্স অভিযান বাস্তবায়নে জাপানের সঙ্গে কাজ করছে ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্পেস স্টাডিজ (সিএনইএস), জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার (ডিএলআর), যুক্তরাষ্ট্রের নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) এবং প্রায় ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
জাক্সার বিজ্ঞানীদের মতে, ফোবোসের দুর্বল মহাকর্ষের কারণে সেখানে নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম পা তৈরি করা ছিল প্রকল্পের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে নমুনা সংগ্রহের পর মঙ্গলের মহাকর্ষীয় প্রভাবাধীন অঞ্চল থেকে বেরিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসাও কঠিন হবে।
২০২৪ সালে জাপানের ‘স্মার্ট ল্যান্ডার ফর ইনভেস্টিগেটিং মুন’ (স্লিম) চাঁদে অবতরণের পর কাত হয়ে পড়েছিল। তবে ত্রুটিপূর্ণ অবস্থাতেও মহাকাশযানটি তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয় এবং চাঁদের রাতের প্রতিকূল পরিবেশে কয়েক দফা টিকে ছিল।
এর আগে মহাকাশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে জাপান। দেশটির ‘হায়াবুসা-২’ মহাকাশযান ২০২০ সালে একটি গ্রহাণু থেকে সংগ্রহ করা ৫ দশমিক ৪ গ্রাম পাথর ও ধূলিকণা নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
তবে গ্রহাণু থেকে নমুনা আনার সঙ্গে এবারের অভিযানের বড় পার্থক্য হলো, মঙ্গলের কাছাকাছি গিয়ে নমুনা সংগ্রহের পর সেখানকার মহাকর্ষীয় প্রভাব অতিক্রম করে পৃথিবীতে ফিরতে হবে। কাওয়াকাতসুর ভাষায়, মহাকাশযানকে এ ক্ষেত্রে একটি ‘মহাকর্ষীয় কূপের’ গভীর থেকে বেরিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
ফোবোস মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় কক্ষপথে ঘুরছে।
মঙ্গলের নমুনা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রতিযোগিতা
মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’ রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলে অনুসন্ধান চালিয়ে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করছে। তবে নমুনাগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার মার্কিন পরিকল্পনা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেসের ভোটের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এ-সংক্রান্ত অভিযান কার্যত বাতিল করে দেয়।
চীন ২০২৮ সালের দিকে ‘তিয়ানওয়েন-৩’ মহাকাশযান উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছে। দেশটির লক্ষ্য, ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এমএমএক্সের নমুনা ফেরার আগেই চীন মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে নমুনা আনার ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে পারে।
তবে জাপানি বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গলের পৃষ্ঠের পরিবর্তে এর উপগ্রহ ফোবোস থেকে সংগ্রহ করা নমুনা আরও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য দিতে পারে। বিশেষ করে কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে ফোবোস সৃষ্টি হয়ে থাকলে, এর নমুনায় মঙ্গলের প্রাচীন ইতিহাস এবং সৌরজগতের গঠনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, এমএমএক্স অভিযান শুধু মঙ্গলের দুই উপগ্রহের রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টা নয়; বরং সৌরজগতের বিবর্তন, পৃথিবীতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতে মানুষের মঙ্গলযাত্রার প্রস্তুতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
