তুরস্ক-পাকিস্তানের মাটিতে সরাসরি হামলার হুঁশিয়ারি হুতির

‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এখন উভয় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে জোটবদ্ধ দেশুলোর জন্য। সৌদি আরবে ইয়েমেনে বিদ্রোহী হুতি বাহিনীর হামলায় নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে জোটটি। তবে সদস্য দেশগুলো নীরবতা ভাঙা শুরু করতেই পাকিস্তান ও তুরস্কের মাটিতে সরাসরি হামলার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) হুতির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ও ধামারের গভর্নর মোহাম্মদ আল-বুখাইতি ইরাকি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অ্যানাদার রিডিং’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সৌদি আরবের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যদি পাকিস্তান বা তুরস্ক নাক গলায়, তাহলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
আল-বুখাইতি বলেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি তুরস্ক ও পাকিস্তান এতে জড়িয়ে পড়ে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
আল-বুখাইতি অবশ্য পাকিস্তান ও তুরস্কের জনগণের মধ্যে ইয়েমেনের প্রতি সহানুভূতির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সরকারগুলো সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়লে তার সতর্কবার্তা তাদের উদ্দেশেই দেওয়া।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর লক্ষ্য যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং তিন দেশের নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা।
চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সব পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। নতুন করে সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের সংঘাত এবং চুক্তির আওতায় সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনার মধ্যে এই চুক্তি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
তুরস্কের সমর্থনের ইঙ্গিত
হুতিদের এই হুঁশিয়ারির মধ্যে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, সৌদি আরবের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব গুরুতর হামলার মুখে পড়েছে। মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে তুরস্ক সৌদি আরবের পাশে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফিদান বলেন, সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। মক্কা জোটের আওতায় পাকিস্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে তুরস্কের।
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলার নিন্দা জানিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ফিদান। তিনি বলেন, জোটটি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সৌদি আরবের সম্ভাব্য সামরিক প্রয়োজন নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে হতে পারে বলেও জানান তিনি।
২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে ইয়েমেনে সংঘাত চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
জুলাইয়ে রিয়াদের ওপর সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার পর হুতিরা সরকারি বাহিনীর সঙ্গে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়েছে। সম্প্রতি তারা লোহিত সাগরের উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে অগ্রগতির দাবিও করেছে।
সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে হুতিরা। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদির পাশে পাকিস্তান
পাকিস্তান শুরু থেকেই সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়ে আসছে। ইসলামাবাদ এসব হামলাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং রিয়াদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে।
সৌদি আরবে হামলা বাড়ার পর পাকিস্তান আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে ‘বাস্তবিক ও কূটনৈতিকভাবে’ থাকবে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান তার দায়িত্ব পালন করবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
খাজা আসিফ আরও বলেন, মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা পাকিস্তানের ধর্মীয় দায়িত্ব। এ কারণে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি না থাকলেও এসব স্থানে হামলা হলে পাকিস্তান সাড়া দেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘এসবের সুরক্ষা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। সুতরাং হ্যাঁ, পার্থিব চুক্তি আছে এবং সেগুলোর নিজস্ব পবিত্রতাও রয়েছে, যা আমরাও সম্মান করি। কিন্তু যদি আল্লাহর ঘর বা নবি (সা.)-এর জন্মস্থানের ওপর কোনো হামলা হয়, তাহলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে থাকা কোনো মুসলমানকেই শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। একে রক্ষা করাই আমাদের ধর্মীয় কর্তব্য।’
পরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরীও সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, হারামাইন শরিফাইন ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান প্রয়োজন অনুযায়ী ‘যে কোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, ‘কোনো কিছুই আমাদের থামাতে পারে না, কোনো কিছুই আমাদের বাধা দিতে পারে না। এমন কিছুই নেই, যা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারে দ্বিধা তৈরি করে। তাই যা প্রয়োজন, যা চাওয়া হবে, আমরা তার জন্য যে কোনো পর্যায়ে যাব।’


