logo

‘ভূতের শহর’ হেবরন

‘ভূতের শহর’ হেবরন
পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ছবি: এপি

মাত্র পাঁচ মিনিটের আলটিমেটামে খালি করা হয় পুরো শহর। বন্দুকের নলের মুখে তড়িঘড়ি করে ঘর ছাড়তে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে পারেননি। কেউ কেউ পরের বেলার খাবারটুকুও সঙ্গে নিতে পারেননি। প্রাণ বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে তাদের। জন্মভিটা কিংবা পৈতৃক আবাস ছেড়ে হাঁটতে হয়েছে অজানা গন্তব্যের পথে। এখন শহরটি প্রায় জনমানবহীন বিরান ভূমি। বাড়িঘর ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের হেবরন শহর এখন রীতিমতো ‘ভূতের শহরে’ পরিণত হয়েছে। হাজারো ফিলিস্তিনির বসবাসের এই শহরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)। শহরের কিছু অংশ এখন পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে। গত শুক্রবার বন্দুকধারীর গুলিতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর থেকে হেবরনে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ওই দিন দুই ইসরায়েলি সেনার পাশাপাশি সন্দেহভাজন দুই ফিলিস্তিনি হামলাকারীও নিহত হন।

স্বাধীন সাংবাদিক জ্যাসপার নাথানিয়েল আলজাজিরাকে বলেছেন, হেবরন এখন ‘ভূতুড়ে শহরে’ পরিণত হয়েছে। কারণ, ‘সব বাসিন্দাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, হামলায় সন্দেহভাজন দুই ফিলিস্তিনি যে পাড়ায় থাকতেন, সেনাবাহিনী সেই ‘পুরো পাড়া’ তছনছ করে দিয়েছে। পরিবারগুলোকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের বাড়িতে ‘এক্স’ চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছে।

যে তল্লাশিচৌকিতে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, তার কাছেও বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বন্দুকের মুখে পরিবারগুলোকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। নাথানিয়েল আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছে, সেনাবাহিনী নিজেরাই জানে না, এখানে তারা কী করছে। আমরা এখানে মূলত সেনাদের দাঁড়িয়ে থাকতেই দেখছি।’

আলজাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ বলেন, হেবরনে সামরিক অভিযানের সঙ্গে রাজনীতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী। তিনি হেবরন শহরেই অবৈধভাবে বসবাস করেন। বসতিবিষয়ক মন্ত্রীও হেবরনের আরেকজন বসতি স্থাপনকারী। সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পর তাঁরা প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে অবস্থান আরও মজবুত করতে চেয়েছিলেন। নূর ওদেহের ভাষ্য, তারা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন।

ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচও একজন অবৈধ বসতি স্থাপনকারী। তবে তিনি হেবরনে বসবাস করেন না। স্মোট্রিচ বলেছেন, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ তিনি নিজেই দিয়েছেন। ফলে এই সামরিক অভিযান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এটি একটি আদর্শগত লক্ষ্য পূরণের প্রচেষ্টার অংশ, যার উদ্দেশ্য হেবরনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দিক থেকে ফিলিস্তিনি ও ইহুদি উভয়ের কাছেই শহরটি গুরুত্বপূর্ণ।

হেবরনের ভেতরে আগে থেকেই ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বসবাস করছেন। এখন সেনারাও বিভিন্ন পাড়ার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন। সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণাও দিচ্ছেন। এসব পদক্ষেপে সংঘাতের পরিসর আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে আদর্শগত বিভাজন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।