logo

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে যেসব মুসলিম প্রার্থীর রেকর্ড জয়

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে যেসব মুসলিম প্রার্থীর রেকর্ড জয়
আবদুল আল-সাইয়েদ (বাম থেকে), অ্যাডাম হামাউই, রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এক মুসলিম প্রতিনিধি সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ফিলিস্তিনি ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম প্রার্থীদের অভূতপূর্ব ও বিপুল জয় নিশ্চিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে দেশটির কংগ্রেসে অন্তত সাতজন মুসলিম আইনপ্রণেতা নিজ নিজ আসনে বিজয় অর্জন করেছেন, যা মার্কিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক।

নাগরিক অধিকার রক্ষা, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবাধিকারকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা সামনে রেখে জোরদার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন এই নবনির্বাচিত প্রার্থীরা।

২০২৬ সালের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজধানী ওয়াশিংটনের ক্ষমতার সামগ্রিক ভারসাম্যও দৃশ্যমানভাবে বদলে গেছে। জো বাইডেনের দল ডেমোক্র্যাটরা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ; কংগ্রেসের উভয় কক্ষেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে।

ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান নির্মম গণহত্যার সার্বিক প্রেক্ষাপটে বিজয় লাভ করা এসব মুসলিম আইনপ্রণেতাদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই তাদের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। নির্বাচনে বিজয়ী এবং পুনর্নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক আইনের মূল মানদণ্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অবরুদ্ধ অঞ্চলে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নিঃশর্ত সামরিক ও আর্থিক সমর্থনের তীব্র বিরোধিতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

আবদুল আল-সাইয়েদ, মিশিগান

৪২ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ সাবেক রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হয়েছেন।

চিকিৎসক ও সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আল-সাইয়েদ অবসরপ্রাপ্ত সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে জয়ী হয়েছেন। তার নির্বাচনী প্রচারণা ছিল বেশ বিতর্কিত। এ সময় রিপাবলিকান ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল তার ধর্মীয় পরিচয়।

আগস্টে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী হওয়া আল-সাইয়েদ ইসরায়েলে নিঃশর্ত মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের সমালোচনা করেছেন। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে তিনি গণহত্যা হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন।

তার সাবেক প্রাথমিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্স নির্বাচনের দুই দিন আগে আল-সাইয়েদের বক্তব্যের সমালোচনা করে রজার্সকে সমর্থন জানান।

অ্যাডাম হামাউই, নিউজার্সি

৫৬ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হামাউই রাজ্যের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে কংগ্রেসে নিউজার্সির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হয়েছেন তিনি।

পেশায় প্লাস্টিক সার্জন হামাউই যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যুদ্ধকালীন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইরাক যুদ্ধেরও অভিজ্ঞ সৈনিক। ২০২৪ সালে গাজার ইউরোপীয় হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন তিনি।

হামাউই সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ বাতিল, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার বিলুপ্তি এবং ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিতে প্রচারণা চালিয়েছেন।

ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের, নিউইয়র্ক

জুনে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রতিনিধি আদ্রিয়ানো এসপাইলাটকে পরাজিত করেন ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। এরপর সাধারণ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের একটি আসন নিশ্চিত করেন তিনি।

নাগরিক অধিকারবিষয়ক গবেষক ও ডক্টরেটের শিক্ষার্থী শেভালিয়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। প্রাথমিক নির্বাচনে তিনি ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন।

তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল বিষয় ছিল সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

মুসলিম আইনপ্রণেতাদের আসন ধরে রাখা

প্রতিনিধি পরিষদের চারজন মুসলিম সদস্যও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী দুই বছরের জন্য তাদের আসন ধরে রাখার মধ্য দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কংগ্রেসের বিতর্কে তাদের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।

রাশিদা তালিব, মিশিগান

ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালিব রিপাবলিকান জেমস হুপারকে পরাজিত করে মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন।

কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সদস্য তালিব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র আইন প্রয়োগ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ইলহান ওমর, মিনেসোটা

ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর রিপাবলিকান জন নাগেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ডেভেল জ্যাকসনকে পরাজিত করে মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন।

১২ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ওমর ২০১৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটির প্রথম সোমালি-আমেরিকান ফেডারেল আইনপ্রণেতা হন।

নিজের অতীত জীবন ও পরিচয়ের কারণে বারবার রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন তিনি। এরপরও মানবিক সহায়তা এবং মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের ওপর নজরদারির পক্ষে কথা বলেছেন ওমর।

আন্দ্রে কার্সন, ইন্ডিয়ানা

ডেমোক্র্যাট আন্দ্রে কার্সন ইন্ডিয়ানাপোলিসভিত্তিক ইন্ডিয়ানার সপ্তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের আসন ধরে রেখেছেন। নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকান প্যাট্রিক ম্যাকঅলি ও লিবার্টারিয়ান প্রার্থী জেমস সিনিয়াককে পরাজিত করেছেন।

২০০৮ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা কার্সন প্রতিনিধি পরিষদে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী মুসলিম আইনপ্রণেতা।

তাঁর নীতিগত অবস্থানে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান, মানুষের সমান মর্যাদা এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

লতিফা সাইমন, ক্যালিফোর্নিয়া

ডেমোক্র্যাট লতিফা সাইমন ক্যালিফোর্নিয়ার ইস্ট বে এলাকার ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের আসন ধরে রেখেছেন। নির্বাচনে তিনি আরেক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমি জয়েসকে পরাজিত করেছেন।

সাইমন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী অস্ত্র সরবরাহনীতির বিরোধিতা করেছেন।

এদিকে ভোট গণনা অব্যাহত থাকায় ক্যালিফোর্নিয়ার আরেকটি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থী আয়েশা ওহাব প্রাথমিকভাবে এগিয়ে ছিলেন।

সূত্র: আনাদোলু