
স্পেনের মধ্যাঞ্চলে একটি থেমে থাকা ট্রেনের পেছনে দ্রুতগতির আরেকটি ট্রেনের ধাক্কায় অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৮০ জন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনের অবস্থা গুরুতর এবং ১৫ জন সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন দেশটির কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের সরকারপ্রধান এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাজে। গুরুতর আহত কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব নাও হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) ভোরে মাদ্রিদের দক্ষিণে তোলেদো প্রদেশের উর্দা এলাকার কাছে মাদ্রিদ-সেভিল উচ্চগতির রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের স্থানীয় একাধিক হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া।
আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্র এস্তের পাদিয়া স্পেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভিইকে জানান, ট্রেন দুটি একই দিকে চলছিল। এ সময় একটি ট্রেন অন্যটির পেছনে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষে দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়।
দুর্ঘটনায় স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের পরিচালিত মাদ্রিদ থেকে সেভিলগামী একটি এভিই উচ্চগতির ট্রেন এবং বেসরকারি রেল সংস্থা ইরিওর পরিচালিত আরেকটি ট্রেন জড়িত ছিল।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা
দুর্ঘটনাস্থল উর্দা থেকে দেওয়া বক্তব্যে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, ‘স্পেন শোকাহত। কী ঘটেছে, তার প্রকৃত কারণ আমরা খুঁজে বের করব। কোনো অবহেলা থাকলে তা প্রকাশ করা হবে, আর ব্যবস্থাগত কোনো ত্রুটি থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একই বছরে স্পেনে দুটি ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন সানচেজ। তবে আগের দুর্ঘটনার সঙ্গে এবারের দুর্ঘটনার কারণের কোনো সম্পর্ক আছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
সংকেতব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, রেলপথের সংকেত ও ট্রেন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পরও একটি ট্রেনকে স্বাভাবিকভাবে চলাচল পুনরায় শুরু করার অনুমতি দিয়েছিল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
তিনি বলেন, সকাল সাড়ে আটটার দিকে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথজুড়ে এলজেডবি ট্রেন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এতে ছয়টি ট্রেনের চলাচল প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে, যদিও সঠিক সংখ্যা তখনো নিশ্চিত ছিল না।
ব্যবস্থাটি অচল হওয়ার পর ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আতচা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেই রেনফের ট্রেনটিকে স্বাভাবিকভাবে যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল বলে জানান পুয়েন্তে।
তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থাটি পুনরায় সচল না হওয়া পর্যন্ত ট্রেন চলাচল স্থগিত না রেখে তা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের। পরিস্থিতিটি ব্যাখ্যা করা কঠিন।’
তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে।
উদ্ধারকাজে জরুরি বাহিনী
দুর্ঘটনাস্থলে সামরিক জরুরি সেবা ইউনিটের ২০০ জনের বেশি সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। আহতদের উদ্ধার এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানান, দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বগি থেকে জীবিতদের উদ্ধার এবং মরদেহ উদ্ধারে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
আঞ্চলিক সরকারের তথ্য অনুযায়ী, রেনফের ট্রেনে ৩৯৭ জন এবং ইরিওর ট্রেনে ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। স্পেনের সংবাদপত্র এল পাইসের বরাতে জরুরি সেবাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইরিওর ট্রেনের দুটি বগি রেলপথের পাশের ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি লাইনচ্যুত বগির ধ্বংসাবশেষ ঢালের ওপর ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষ ও উদ্ধারকর্মীদেরও উপস্থিতি দেখা গেছে।
মাদ্রিদের মেয়র হোসে লুইস মার্তিনেস-আলমেইদা জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য রাজধানী থেকেও জরুরি চিকিৎসাকর্মী ও অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী পাঠানো হচ্ছে। এদিকে রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ মাদ্রিদ থেকে আন্দালুসিয়া অঞ্চলের মধ্যে উচ্চগতির ট্রেন চলাচল স্থগিত করেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সিভিল গার্ডের একটি বিশেষ তদন্ত দলও ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।
একই রেলপথে আগেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা
একই রেলপথে এবং একই দুই রেল পরিচালনাকারী সংস্থার ট্রেনের মধ্যে সংঘটিত আরেকটি দুর্ঘটনার নয় মাস পর এবারের ঘটনা ঘটল। আগের দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন।
স্পেনে আগামী এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমন সময়ে দুর্ঘটনাটি সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন স্পেনে অবস্থানরত সাংবাদিক গ্রাহাম কিলি। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আগের দুর্ঘটনার পর সরকার দেশজুড়ে রেলপথ পরীক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মহলে শোক
দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিহতদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘আজ ইউরোপ আপনাদের সঙ্গে শোক পালন করছে।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও স্পেনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং উদ্ধারকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। উদ্ধারকাজ চলাকালে তিনি পরিবহনমন্ত্রী ও আঞ্চলিক প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলে জানান।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংকেতব্যবস্থার ত্রুটি এবং ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্তে কোনো অবহেলা ছিল কি না; এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।

