দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন/বাংলাদেশের সুন্দরবনে বন্ধের পথে যুক্তরাজ্যের জলবায়ু প্রকল্প

যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় পরিচালিত একটি জলবায়ু প্রকল্পে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। এতে হাজারো জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সহায়তা হারানোর পাশাপাশি গত আড়াই বছরে করা বিভিন্ন উদ্যোগও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর (এফসিডিও) বৈদেশিক সহায়তার বাজেট কমানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর ফলে দেশটির বৈদেশিক সহায়তা জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে নামবে। এরই অংশ হিসেবে উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে যুক্তরাজ্যের সহায়তা কমানো হচ্ছে। জলবায়ু প্রকল্পে অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্তে এরই মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের বাংলাদেশ কার্যক্রমেও। ২০২৩ সাল থেকে সংস্থাটি সুন্দরবন এলাকায় একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রকল্পের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, মাছ চাষের উপকরণ ও প্রযুক্তি এবং অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতার জন্য আবহাওয়া তথ্যব্যবস্থা চালু করা হয়।
সুন্দরবনে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান তামান্না রহমান জানান, গত এপ্রিলে সংস্থাটিকে চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে সংস্থাটির প্রচেষ্টায় সময়সীমা বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর করা হয়।
তামান্না রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির জন্য ২২ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর চেয়ে অনেক কম অর্থ পাওয়া গেছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৫৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকলেও প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে।
তিনি বলেন, হঠাৎ অর্থ কমে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আড়াই বছরে তৈরি করা সংস্থাটির বিশ্বাস ও সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ইতোমধ্যে নেওয়া উদ্যোগগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে প্রকল্প থেকে বের হয়ে আসার সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের সহায়তা অর্ধেকের বেশি কমছে
সুন্দরবনের এই প্রকল্পে অর্থ কমানো যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সহায়তা কমানোরই অংশ। দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে দেওয়া যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ৬ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড থেকে কমে ৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে নামতে পারে।
প্রকল্পটি আগেভাগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সুন্দরবনের এসব জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমেই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।
তামান্না রহমান বলেন, প্রতিবছর আরও শক্তিশালী ঝড় ও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। অথচ এসব মানুষের জন্য বাস্তবভিত্তিক জলবায়ু সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন বলেন, এ ধরনের প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই অল্প সময়ের নোটিশে বন্ধ করে দেওয়া হলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের করদাতাদের অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বছরে ৩ সেন্টিমিটার বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলিত প্রবাহে গড়ে ওঠা বদ্বীপের ওপর অবস্থিত সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোয়ারভাটা-নির্ভর ম্যানগ্রোভ বনটিতে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও নদীর ডলফিনসহ ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে।
সুন্দরবনের আশপাশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে মাছ, মধু ও জ্বালানি কাঠসহ বিভিন্ন সম্পদের জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। অনেকে কৃষিকাজেও যুক্ত। তবে দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং দেশের মূল অর্থনীতি থেকে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে এসব মানুষ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন।
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষতও এখনো বহন করছেন অনেকে। ওই ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবন এলাকায় আনুমানিক এক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধ্বংস হয় স্থানীয় অবকাঠামো ও বাঁধ। অনেক এলাকায় বদলে যায় পুরো ভূপ্রকৃতি।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন এবং কৃষিজমি হারাচ্ছে উর্বরতা।
সৌরবিদ্যুৎ ও যন্ত্রে বদলেছে মানুষের জীবন
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের সহায়তা পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, প্রকল্পের বিভিন্ন উদ্যোগ তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
সুন্দরবনের বাসিন্দা বিনা মণ্ডল জানান, ঘূর্ণিঝড় আইলার পর তাদের গ্রামের সড়ক ও বাঁধ ভেঙে যায়। কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাছ ধরাই পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। বর্তমানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ছাড়া সুপেয় পানির ব্যবস্থাও কঠিন।
প্রকল্পের দেওয়া একটি ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা তাকে রাতে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। এতে আয়ও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
আরেক বাসিন্দা বসন্তী মণ্ডল পেয়েছেন সৌরবিদ্যুৎচালিত ধান ভাঙানোর মেশিন। আগে কাজের সন্ধানে প্রতিদিন বিভিন্ন কৃষকের বাড়িতে যেতে হতো তাকে। এখন বাড়িতে থেকেই আয় করতে পারছেন এবং সন্তানদের জন্যও বেশি সময় দিতে পারছেন।
তবে প্রকল্পটি আগেভাগে বন্ধের ঘোষণা আসার পর স্থানীয় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। সংস্থার কর্মীদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তে কেঁদে ফেলেছেন। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, বিভিন্ন উদ্যোগ যখন ফল দিতে শুরু করেছে, তখনই কেন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
১৪০ উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
প্রকল্পের আওতায় ১৪০ জন উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়ার একটি উদ্যোগও ছিল। প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের তামান্না রহমান মনে করেন, এখন প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেলে এসব উদ্যোক্তা আবার শুরুর অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন। কারণ, বাজার সম্পর্কে তাদের এখনো প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তৈরি হয়নি।
তার ভাষায়, প্রকল্পটি ডিসেম্বর ২০২৮ পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও মাত্র দুই থেকে তিন মাসের নোটিশে সব কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত প্রকল্প শেষ করার আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বিভিন্ন কার্যক্রম স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা থাকে। এবার সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার সুযোগও পাওয়া যাচ্ছে না।
নতুন অর্থায়ন খোঁজারও সুযোগ মিলছে না
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন প্রকল্পটির ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে নতুন অনুদান সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়ায় সেই উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তামান্না রহমান বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে বিদেশি সরকারের অনুদানের মাধ্যমে প্রয়োজন থাকা প্রত্যেক মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নতুন ধরনের অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থায়নের চেষ্টা করা যুক্তিসংগত। তবে সুন্দরবনের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবচেয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ কীভাবে আসবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, এসব মানুষের উল্লেখযোগ্য আর্থিক আয় নেই। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ও অবকাঠামোও এখনো দুর্বল।
এ বিষয়ে অন্যান্য বেসরকারি সংস্থাও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে। এনজিও মার্সি কর্পসের তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাত থেকে এসেছে। বন্যা প্রতিরোধের মতো উদ্যোগকে সাধারণত জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেগুলো বাস্তবায়নে সরকারি অর্থায়ন প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের উন্নয়ন সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক বন্ডের প্রধান রোমিলি গ্রিনহিল বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত মানবিক ও জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি বাতিলের মাধ্যমে দেশটির সহায়তা কমানোর কঠোর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার মতে, এতে সংঘাত, দারিদ্র্য ও জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হারিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাজ্যের এফসিডিও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনকে তারা জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। তবে একই সঙ্গে অধিক অনুদাননির্ভর বৈদেশিক সহায়তা থেকে সরে এসে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানো, তাদের সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি অর্থায়ন কাজে লাগানোর দিকে যুক্তরাজ্য এগোচ্ছে।

