টেলিনরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতের অভিযোগ

২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান টেলিনর মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা ও প্ররোচনা দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে৷ বিষয়টি তাদের তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়ের পুলিশ৷
দেশটির জাতীয় অপরাধ তদন্ত বিভাগ এনসিআইএস ও নিরাপত্তা সংস্থা পিএসটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই মামলার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) অসলোতে টেলিনরের সদরদপ্তরে তদন্তকারীরা অভিযান চালিয়েছেন৷
নরওয়ের পুলিশ জানিয়েছে, ‘টেলিনর মিয়ানমার সামরিক জান্তার কাছে গ্রাহকদের অতীতের ট্রাফিক ডেটা হস্তান্তর করেছে৷’ পুলিশ আরও জানায়, তথ্যগুলো এমন সময়ে হস্তান্তর করা হয়, ‘যখন জান্তা সরকার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর একাংশের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন ও নির্যাতন’ চালাচ্ছিল৷
তদন্তে সহযোগিতার দাবি
সেই অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে নিজেদের ব্যবসা বিক্রি করে দেয় টেলিনর৷ ২০২২ সালের মার্চ মাসে সেখান থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়৷ টেলিনর জানিয়েছে, তদন্তকারীদের তারা নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করছে৷
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মিয়ানমার সরকারের এক মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রয়টার্স৷ তবে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি৷
মামলায় যা বলা হয়েছে
টেলিনরের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে সুইডেনের একটি অলাভজনক সংস্থা৷ চলতি বছরের শুরুর দিকে করা মামলায় বলা হয়, মিয়ানমার জান্তা সরকারের সন্দেহভাজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কল লগ এবং লোকেশন ডেটা, অর্থাৎ অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করেছিল টেলিনর৷ এর ফলে অন্তত একজন বিশিষ্ট কর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়৷
নিরুপায় ছিল টেলিনর?
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য জানাতে গিয়ে টেলিনর দাবি করেছে তারা পরিস্থিতির শিকার৷ প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে রয়টার্সকে বলেছে, ‘সামরিক অভ্যুত্থানটি মিয়ানমারের জনগণের জন্য ছিল এক ট্র্যাজেডি৷ সেই অবস্থায় আমরা এমন এক অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম যে, আমাদের হাতে ভালো কোনো বিকল্পই ছিল না৷’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করলে কর্মীদের কারাবাস, নির্যাতন বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল৷ আমাদের সামনে তখন আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না এবং আমরা আমাদের কর্মীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারতাম না৷’
টেলিনর আরও জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়নি বা কাউকে তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে অসলোতে অবস্থিত মিয়ানমার দূতাবাসের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে রয়টার্স৷ তবে কোনো সাড়া মেলেনি৷
নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নজরদারি সরঞ্জাম
নরওয়ের পুলিশ জানিয়েছে, মিয়ানমারে নিজেদের ব্যবসা বিক্রির প্রক্রিয়ায় ‘নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নজরদারি সরঞ্জাম’ও হস্তান্তর করেছে টেলিনর৷ সেই লেনদেনে নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নেওয়ায় টেলিনরের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে৷
জাস্টিস ফর মিয়ানমারেরর মুখপাত্র ইয়াদানার মাউং রয়টার্সকে বলেন, ‘মিয়ানমারে নরওয়ের ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে টেলিনরের বিরুদ্ধে নরওয়ের পুলিশের তদন্ত করার সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই৷’
নরওয়ের তদন্তকারীদের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস (আইসিজে)-র সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে জাস্টিস ফর মিয়ানমার।
ইয়াদানার মাউং আরও বলেন, ‘আইসিজে নরওয়ের সঙ্গে মিলে পুলিশের কাছে আমরা যে নথিপত্র জমা দিয়েছিলাম, তাতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কোম্পানির কাছে টেলিনরের স্পাইওয়্যার হস্তান্তর এবং সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, টেলিনরের কর্মকাণ্ড এবং তাদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের জনগণের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে।’


