জি-২০ বৈঠকে রাশিয়ার উপস্থিতি ও সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞায় ক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজনে জি-২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকে রাশিয়াকে আবারও অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং কয়েকজন সাংবাদিককে বৈঠকস্থলে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনায় অসন্তোষ জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারী কয়েকজন অর্থমন্ত্রী।
সোমবার উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে শুরু হওয়া দুই দিনের বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তবে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভের উপস্থিতি এবং সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিতর্ক বৈঠকের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর এবারই প্রথম সরাসরি জি-২০ বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন সিলুয়ানভ। বৈঠক শুরুর সময় জি-২০ টেবিলে তাকে দেখে কয়েকজন অর্থমন্ত্রী বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেন।
পোল্যান্ডের অর্থমন্ত্রী আন্দ্রেজ ডোমানস্কি রাশিয়ার উপস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে জি-২০-এর আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অতিথি আমন্ত্রণের অধিকার রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
ডোমানস্কি বলেন, রাশিয়াকে তারা বিশ্বাস করেন না এবং দেশটির সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইলও সিলুয়ানভের উপস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপ নতুন করে নিষেধাজ্ঞার একটি প্যাকেজ প্রস্তুত করছে। তার মতে, অ্যাশভিলে সিলুয়ানভকে উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সহযোগিতার ক্ষেত্রে উদ্বেগের বার্তা দিয়েছে।
বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও করেন সিলুয়ানভ। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জি-২০ কাঠামোর মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে দুই মন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আলোচনার মূল বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার জন্য কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা বা অন্য কোনো ধরনের চুক্তির সুযোগ নেই—বেসেন্ট এমন বার্তা দিয়েছেন।
এদিকে, জি-২০-এর ঐতিহ্যবাহী ‘পারিবারিক ছবি’তেও সিলুয়ানভের সঙ্গে দাঁড়াতে আপত্তি জানান ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। শেষ পর্যন্ত তাকে ছাড়াই ছবিটি তোলা হয়।
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে জোর যুক্তরাষ্ট্রের
বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে স্কট বেসেন্ট বলেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারির পর জমে থাকা বিপুল ঋণের বোঝা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো।
তিনি বলেন, বিশ্ব এখন বিপুল ঋণের বোঝায় ডুবে আছে এবং এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার প্রধান পথ হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। চলতি বছরের শুরুতে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ রেকর্ড প্রায় ৩৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এতে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিতর্ক
জি-২০ বৈঠক কভার করতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছেন অংশগ্রহণকারী কয়েকজন কর্মকর্তা।
প্রবেশাধিকার না পাওয়া সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্লুমবার্গ নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের কয়েকজন সাংবাদিক।
জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল বলেন, জি-২০ বৈঠক নিয়ে স্বাধীন ও উন্মুক্তভাবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের বৈধ স্বার্থ রয়েছে।
তবে মার্কিন ট্রেজারির এক মুখপাত্র দাবি করেন, ৩০০ জনের বেশি সাংবাদিক বৈঠকটি কভার করছেন। তাদের মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমসের একজন সাংবাদিকও রয়েছেন। তার ভাষ্য, সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকতার মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশের দায়িত্বও রয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা
জি-২০ বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। স্কট বেসেন্ট বলেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন করে বিবেচনার জন্য জি-২০ সদস্যদের আহ্বান জানাবেন তিনি।
তার মতে, চীনের অর্থনীতিকে অতিরিক্ত রপ্তানিনির্ভরতা থেকে বের করে অভ্যন্তরীণ ভোগের দিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেস্কুরও আরও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তার মতে, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলেরই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।
এদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক উত্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থবিরতার’ যুগ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘বৈশ্বিক বিনিয়োগের উত্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

