logo

ইউক্রেনে রুশ হামলায় নিহত ৩৩, ধ্বংসস্তূপের নিচে অর্ধশতাধিক আটকে থাকার শঙ্কা জেলেনস্কির

ইউক্রেনে রুশ হামলায় নিহত ৩৩, ধ্বংসস্তূপের নিচে অর্ধশতাধিক আটকে থাকার শঙ্কা জেলেনস্কির
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ৩ নভেম্বর বার্লিনে চ্যান্সেলারি ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। ছবি: এএফপি

ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গ্রামে রাশিয়ার ভয়াবহ হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও ৫০ জনের বেশি মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। মঙ্গলবার (৩ অক্টোবর) জার্মানির রাজধানী বার্লিন সফরকালে তিনি এ ঘটনাকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ হামলা বলে উল্লেখ করেন।

সোমবার ও মঙ্গলবার ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক হামলা চালায় রাশিয়া। এর আগে সপ্তাহান্তে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দিনের বিরল যুদ্ধবিরতি শেষ হয়। নতুন করে হামলার ফলে আগামী সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে অনুষ্ঠেয় শান্তি আলোচনার অগ্রগতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জেলেনস্কির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সম্মুখসারির কোমিশুভাখা গ্রামে রুশ বাহিনীর হামলায় একটি সাবেক স্কুল ভবন বিধ্বস্ত হয়। ভবনটি প্রতি সোমবার মানবিক সহায়তা বিতরণের কাজে ব্যবহার করা হতো বলে জানিয়েছে ইউক্রেন।

জেলেনস্কি বলেন, ‘একটি হামলাতেই ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও ৫০ জনের বেশি মানুষ আটকে থাকতে পারেন।’

তিনি এই হামলাকে চলমান যুদ্ধের অন্যতম বড় হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেন। ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জাতিসংঘের নিন্দা

ইউক্রেনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

মিশনটির প্রধান ড্যানিয়েল বেল বলেন, ‘রুশ সশস্ত্র বাহিনী হয়তো জানত যে ওই গ্রামে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছিল, অথবা সেখানে কী ঘটছে তা জানার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পদক্ষেপও তারা নেয়নি।’

এর কয়েক ঘণ্টা আগেই খেরসন অঞ্চলে কয়েক দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। এর ফলে বিরল এক মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এদিকে মঙ্গলবার খারকিভ শহরের একটি হাসপাতালে রাশিয়ার হামলায় কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের অন্যান্য স্থানে হামলায় আরও চারজন নিহত হয়েছেন।

১০-১১ নভেম্বর আবুধাবিতে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা

ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে, আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর আবুধাবিতে তিন পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। গত ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথম তিন পক্ষের মধ্যে এমন আলোচনা হতে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার বার্লিন সফরকালে জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেন, এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি বৈঠকের পথ তৈরি হবে।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এই আলোচনার প্রক্রিয়া এবং আমাদের অন্যান্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেতৃপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পথ খুলে দেবে।’

২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়ে আসছেন জেলেনস্কি। তবে পুতিন বারবার এমন বৈঠকে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

জেলেনস্কির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার আন্তরিক আলোচনার কোনো লক্ষণ তিনি এখনো দেখছেন না।

তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার এখনই যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তী শান্তিচুক্তি নিয়ে আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসা জরুরি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটতে দেখছি না।’

‘আলোচনার টেবিলে ইউক্রেনকে থাকতে হবে’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের সাম্প্রতিক যোগাযোগ এবং জেলেনস্কির সমালোচনার কারণে ইউক্রেন ও ইউরোপের মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার প্রতি বেশি নমনীয় অবস্থান নিতে পারে।

মের্ৎস বলেন, ট্রাম্প যদি মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০ সম্মেলনে পুতিনকে আমন্ত্রণ জানান, তাহলে জেলেনস্কিকেও আমন্ত্রণ জানানো উচিত।

তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনকে নিয়ে আলোচনা হলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকেও অবশ্যই আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে।’

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় খেরসন অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। কয়েক দিনের ওই যুদ্ধবিরতিকে সংঘাত নিরসনের সম্ভাব্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

জেলেনস্কি জানান, কিয়েভ রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি এর পরিধি বিস্তারের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু এর জবাবে রাশিয়া নতুন করে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত ও বিস্তৃত করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু জবাবে আমরা পেয়েছি এই হামলা। নতুন গোলাবর্ষণ, নতুন আক্রমণ, নতুন প্রাণহানি।’

মের্ৎসের মতে, খেরসনের যুদ্ধবিরতি অন্যান্য অঞ্চলেও শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি মডেল হতে পারত। কিন্তু রাশিয়া এখন পর্যন্ত এ ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

ব্রাসেলসে ইউক্রেন নিয়ে বৈঠক

ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান সামরিক ও আর্থিক সহায়তাকারী জার্মানির চ্যান্সেলর মের্ৎস বলেন, রাশিয়ার প্রতি তাদের বার্তা স্পষ্ট; এবার যুদ্ধ বন্ধ করার সময় এসেছে।

অন্যদিকে পুতিন বারবার বলেছেন, ইউক্রেনে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাশিয়ার আগ্রহ নেই। পূর্ব ইউক্রেনের বাকি অংশ সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দখল করার লক্ষ্যও মস্কো পুনর্ব্যক্ত করেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় আসন্ন শীত নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। মঙ্গলবার কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, রাজধানীতে জ্বালানি ও অন্যান্য সরবরাহের পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন।

এদিকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, বুধবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ও ন্যাটোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন মার্কিন আলোচকেরা।

ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, ওই বৈঠকে ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ন্যাটো ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।

অন্যদিকে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রাজধানী অঞ্চলের দিকে আসা প্রায় ৫০০টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।

এদিকে ইউক্রেনের সমর্থনে চলতি মাসে পোল্যান্ডে সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এতে ইউরোপের ১০টি দেশের প্রায় ২ হাজার ৮০০ সেনা অংশ নেবেন।

সব মিলিয়ে একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা ও পাল্টা হামলা বাড়ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার উদ্যোগও এগোচ্ছে। তবে আবুধাবির বৈঠক শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কিংবা স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে কতটা অগ্রগতি আনতে পারে, তা এখনো অনিশ্চিত।