logo
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের জয়, হেরে গেল ট্রাম্পের দল

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের জয়, হেরে গেল ট্রাম্পের দল
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। ছবি: পিবিএস

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। দীর্ঘদিন পর কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনের পূর্বাভাসে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসে একক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আল জাজিরা, বিবিসি ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের লাইভ নির্বাচনী আপডেটে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনে সাউথ ক্যারোলাইনা, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস, ওহাইও ও কানসাসে গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস ও কানসাসে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে এবারের নির্বাচনের বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এপি ও আল জাজিরার নির্বাচনী প্রতিবেদনেও এসব ফলাফল উঠে এসেছে।

সাউথ ক্যারোলাইনা ও নর্থ ক্যারোলাইনায় আসন হারাল রিপাবলিকানরা

সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করে সিনেট আসনটি নিজেদের করে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। ডারলিন গ্রাহাম প্রয়াত দীর্ঘদিনের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয় পেলেন।

প্রতিবেশী নর্থ ক্যারোলাইনাতেও একই ধরনের ফল এসেছে। সেখানে সাবেক গভর্নর ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন।

টেক্সাস ও কানসাসে বড় চমক

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ফলগুলোর একটি এসেছে টেক্সাস থেকে। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঙ্গরাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও ধর্মতত্ত্বের শিক্ষার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী এবং অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন।

১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয়ের ঘটনা ঘটেনি। ফলে টালারিকোর এই জয় দলটির জন্য ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কানসাসেও রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যে আঘাত হেনেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। একটি মেগাচার্চের যাজক হ্যামিলটন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন। কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এ ছাড়া ওহাইওতে বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর জন হাসটেডকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন।

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল রিপাবলিকানরা

বিদায়ী ১১৯তম কংগ্রেসে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের ছিল ৪৫টি আসন। তাদের সঙ্গে ছিলেন দুটি স্বতন্ত্র সদস্য, যারা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতেন।

নির্বাচনের ফলাফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় নতুন কংগ্রেসে আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ অনুমোদন এবং প্রশাসনের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব ও শুনানির কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে।

ট্রাম্পের ‘ট্রাইফেক্টা’ নিয়ন্ত্রণের অবসান

২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হোয়াইট হাউস, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল। মার্কিন রাজনীতিতে এই অবস্থাকে ‘ট্রাইফেক্টা’ বলা হয়।

কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্য দিয়ে সেই একক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডেমোক্র্যাটরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কংগ্রেসে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। সিনেটের সব আসনে একসঙ্গে নির্বাচন হয় না; সাধারণত প্রতি দুই বছর অন্তর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।

এবারের নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং ওহাইও ও ফ্লোরিডায় দুটি বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

২০২৫ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনে যোগ দেওয়ায় ওহাইও ও ফ্লোরিডার সিনেট আসন দুটি শূন্য হয়েছিল।

এবার আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, ওহাইও, টেক্সাস ও মিশিগানের নির্বাচনকে বিশেষভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়নে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে। মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, বিচারক নিয়োগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিনেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব পেয়ে প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত এবং শুনানি আয়োজনের সুযোগ পাবে।

তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই প্রেসিডেন্টের সব নীতি বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। তবে আইন প্রণয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার প্রয়োজন বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রিপাবলিকানরা বড় ধাক্কা খেলেও প্রতিনিধি পরিষদের চূড়ান্ত ফল এখনো গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন ও ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত সিনেটের সম্পর্কই ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।