হঠাৎ ‘কোড ১০০’ জারি করল ইরান, কখন দেওয়া হয় এই সাংকেতিক বার্তা

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার আকাশে ঘন হচ্ছে যুদ্ধের আশঙ্কার মেঘ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করতে শুরু করেছে তেহরান। যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কায় সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতির বিশেষ প্রোটোকল ‘কোড ১০০’-এর আওতায় এনেছে ইরান।
সম্প্রতি সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। তবে ইরানের সরকারি গণমাধ্যম এ খবরের কোনো সত্যতা স্বীকার করেনি। তেহরানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), ইরানি সেনাবাহিনীর অন্যতম শাখা আরতেশ, বিমান প্রতিরক্ষাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে ইরান সরকার। দেশজুড়ে ‘কোড ১০০’ নামের একটি প্রোটোকল জারি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আগে দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য একে চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘কোড ১০০’ কী, কেন এত সতর্কতা
ইরান তার সর্বোচ্চ জাতীয় সামরিক সতর্কতা প্রোটোকল ‘কোড ১০০’ সক্রিয় করেছে বলে খবর প্রকাশের পর পশ্চিম এশিয়াজুড়ে উত্তেজনা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সতর্কতা জারির পর সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আগে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সব শাখাকে সর্বোচ্চ অভিযানিক প্রস্তুতিতে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইআরজিসি, নিয়মিত সেনাবাহিনী বা আরতেশ, বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ড এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী।
সপ্তাহান্তে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার পর এই আকস্মিক সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনীর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বড় ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা। এর জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অঞ্চলজুড়ে জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন নাগরিকদের আকস্মিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক আকাশপথ বন্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো ঘোষণা ছাড়াই জাতীয় নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ের জন্য ক্যাম্প ডেভিডে তার অবস্থান সংক্ষিপ্ত করে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন। ইরানের সরকারি গণমাধ্যম ‘কোড ১০০’ পরিভাষাটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও বিশেষজ্ঞ ও উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক (ওএসআইএনটি) নেটওয়ার্কগুলোর দাবি, ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক তৎপরতা এমন একটি শক্তি বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা সাধারণত সম্ভাব্য সরাসরি সংঘাতের আগে নেওয়া হয়।
ইরানের ‘কোড ১০০’ বলতে কী বোঝায়
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সামরিক কাঠামোয় ‘কোড ১০০’ জরুরি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির সর্বোচ্চ স্তরকে বোঝায়। পশ্চিমা সামরিক ধারণার ‘ডিইএফকন ১’ বা পূর্ণাঙ্গ সৈন্য সমাবেশের সঙ্গে এর অনেকটা তুলনা করা হয়। এই প্রোটোকলের উদ্দেশ্য হলো দেশের পুরো প্রতিরক্ষা কাঠামোকে প্রতিরোধমূলক অবস্থা থেকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে নিয়ে যাওয়া।
সামরিক কমান্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘কোড ১০০’ ঘোষণা বা কার্যকর হলে ইরানের দ্বিস্তরীয় সামরিক ব্যবস্থায় বেশ কিছু উচ্চ অগ্রাধিকার নির্দেশনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়।
শত্রুপক্ষের বিমান হামলায় আগেই ধ্বংস হওয়া এড়াতে ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপক ইউনিটগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎক্ষেপণ অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
রাশিয়ার সরবরাহ করা এস-৩০০ ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত খোরদাদ ১৫ ও বাভার ৩৭৩ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাটারিসহ সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কগুলো সীমান্ত অঞ্চল এবং কৌশলগত অবকাঠামোগুলোর চারপাশে উচ্চমাত্রার ট্র্যাকিং মোডে চলে যায়।
ইরানি সামরিক মতবাদ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে ‘মোসাইক ডিফেন্স’ প্রোটোকলও সক্রিয় হয়। শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা সুনির্দিষ্ট হামলায় তেহরানের কেন্দ্রীয় কমান্ডের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত বা ধ্বংস হলে আঞ্চলিক আইআরজিসি কমান্ডারদের অসম যুদ্ধ পরিচালনা ও পাল্টা হামলা চালানোর স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা দেওয়া হয়।
নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইস্ফাহানসহ গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তাও সর্বোচ্চ সতর্কতায় উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি শক্তিশালী জিপিএস জ্যামিং ও আকাশপথে নজরদারি ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
যদিও পশ্চিমা সামরিক গোয়েন্দারা এসব পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাড়তি তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করেছে, ‘কোড ১০০’ পরিভাষাটি মূলত প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রকাশনা এবং আইআরজিসির যোগাযোগ পর্যবেক্ষণকারী ওএসআইএনটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সামনে এসেছে।
তেহরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর পরিচালনাগত নিরাপত্তার কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামরিক কোড স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
ইরানের ‘কোড ১০০’-এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে
এর তাৎক্ষণিক কারণ হতে পারে ইয়েমেন থেকে হুতি বাহিনীর বড় ধরনের হামলা। তারা সৌদি আরবের দিকে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার আক্রমণকারী ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে আসা একাধিক হুমকি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
তবে সৌদি রাজধানীর প্রত্যক্ষদর্শীরা কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সীমানার কাছে একাধিক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। তারা ধোঁয়া ও আলোর ঝলকানিও দেখতে পেয়েছেন।
ওয়াশিংটন ও এর আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে হুতিদের এই হামলা শুধু ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বরং এটিকে তেহরানের বৃহত্তর ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ মাধ্যমে পরিচালিত বা সমর্থিত সমন্বিত উত্তেজনা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
সামরিক কৌশলবিদেরা বলেছেন, এ ধরনের হামলায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক দূরপাল্লার তরল ও কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের আইআরজিসির কুদস ফোর্সের সরবরাহ করা প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ ও দিকনির্দেশনা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
চলমান আলোচনা ও পারস্য উপসাগরে বাড়তে থাকা সামরিক তৎপরতার মধ্যে এই হামলার সময়কে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার জন্য ইরানপন্থি প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোর ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের লেভেল ৩ নিরাপত্তা সতর্কতা বহাল থাকা অবস্থায় সৌদি আরব তার পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের সামরিক কমান্ডগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রেখেছে। একই সঙ্গে আরব উপদ্বীপজুড়ে আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে।
এদিকে হুতি হামলা ও ইরানি সামরিক বাহিনীর তৎপরতার খবর ওয়াশিংটনে পৌঁছালে ট্রাম্প আকস্মিকভাবে তার কর্মসূচি পরিবর্তন করেন। তিনি ক্যাম্প ডেভিড থেকে নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই আকস্মিক সময়সূচি পরিবর্তনের কোনো সুস্পষ্ট প্রকাশ্য কারণ জানাননি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের এই প্রত্যাবর্তন ইরান ও আঞ্চলিক সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কৌশল
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর পশ্চিম এশিয়ায় বসবাসকারী বা ভ্রমণরত সব মার্কিন কর্মী ও নাগরিকের জন্য বিস্তৃত নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। সতর্কবার্তায় বেশ কয়েকটি গুরুতর ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত অবনতি ঘটছে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা প্রবল।
মার্কিন নাগরিকদের উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে আকস্মিক ফ্লাইট বাতিল, বাণিজ্যিক বিমানের পথ পরিবর্তন এবং আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সতর্ক করেছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা তাদের সহযোগী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো নিকটবর্তী পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের বাইরে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি বা বাণিজ্যিক স্বার্থে হামলা চালাতে পারে। একই সময়ে সামরিক ফ্লাইট ট্র্যাকারগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর উল্লেখযোগ্য তৎপরতার তথ্য রেকর্ড করেছে।
যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ডসহ বিভিন্ন বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন বিমানবাহিনীর একাধিক বি ১ বি ল্যান্সার ভারী বোমারু বিমান উড্ডয়ন করেছে। এগুলো ইউএস সেন্টকমের দায়িত্বাধীন এলাকার অগ্রবর্তী অভিযানিক অবস্থানের দিকে মহড়া দিচ্ছিল বলে খবর পাওয়া গেছে।
লোহিত সাগর ও আরব সাগরে মোতায়েন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ও গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ নৌবাহিনীর সম্পদগুলোও কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতজুড়ে মার্কিন স্থাপনাগুলোর জন্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে অবস্থান সমন্বয় করেছে।
ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলে সামরিক নেতৃত্ব জরুরি পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং এবং অ্যারো ২ ও অ্যারো ৩ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষা প্রধান এবং ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ বজায় রাখতে তাদের ভ্রমণসূচি সমন্বয় করেছেন।
ইসরায়েল এর আগে সিরিয়া, লেবানন এবং ইরানের অভ্যন্তরে ইরানি অবকাঠামো ও প্রক্সি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট অভিযান চলাকালে আইডিএফ তেহরানের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে ইঙ্গিতকারী প্রতিবেদন রয়েছে। এসব প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, এক ধরনের অলিখিত সক্রিয় সম্পৃক্ততা ইতোমধ্যে চালু রয়েছে। এতে ইরানের ‘কোড ১০০’ সক্রিয় করার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর জন্য, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের জন্য, সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা ও পাল্টা হামলার সম্ভাবনা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জরুরি বিকল্প পথ নির্ধারণের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মতো আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে পরিচালিত প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো দুর্ঘটনাজনিত ক্ষেপণাস্ত্র সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতে পশ্চিম ইরান ও উত্তর ইরাকের আকাশসীমা এড়িয়ে বিকল্প ফ্লাইট করিডোর প্রস্তুত করতে শুরু করেছে।
সংকটকালে ইরানের সতর্কতা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে
ইরানের সামরিক কাঠামো দুটি স্বতন্ত্র শাখায় বিভক্ত।
আরতেশ: নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী। এটি প্রচলিত ভূখণ্ডগত প্রতিরক্ষা, বিমান প্রতিরক্ষা ও নৌ সীমান্ত টহলের দায়িত্বে রয়েছে।
আইআরজিসি: একটি অভিজাত, আদর্শিক সামরিক সংগঠন। কুদস ফোর্সের মাধ্যমে এটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, অসম যুদ্ধের সরঞ্জাম, আক্রমণাত্মক ড্রোন বহর ও বিদেশি অভিযান পরিচালনা করে।
সাধারণ শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে ইরানি বাহিনী ন্যূনতম প্রস্তুতিতে কাজ করে। উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রোটোকলগুলো সাধারণত একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো অনুসরণ করে।
স্তর ৩ বা নিয়মিত সতর্কতা: সীমান্ত চৌকি ও নৌ টহলে স্বাভাবিক কর্মপরিচালনাগত প্রস্তুতি বজায় থাকে।
স্তর ২ বা উচ্চতর প্রতিরোধ: বড় ধরনের আঞ্চলিক মহড়া চলাকালে অথবা ইরানের সামুদ্রিক সীমানার কাছে বিদেশি সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হলে এটি সক্রিয় করা হয়। এ পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলোতে জ্বালানি ভরা হয় এবং রাডারের পরিধি বাড়ানো হয়।
স্তর ১ বা ‘কোড ১০০’, সর্বোচ্চ যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি: কেন্দ্রীয় সামরিক নেতৃত্ব কোনো আক্রমণকে আসন্ন মনে করলে অথবা বড় ধরনের সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু হলে এটি সক্রিয় করা হয়। এ প্রোটোকলের অধীনে বেসামরিক ও সামরিক সমন্বয় জোরদার করা হয়, সাইবার ইউনিটগুলো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক প্রতিরক্ষা কার্যক্রম শুরু করে এবং আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিগুলোকে তাৎক্ষণিক উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, ইরান ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলেইমানির ওপর হামলার পরের পরিস্থিতি, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে এপ্রিল ও অক্টোবর সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র সংঘাত, ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনে সংঘাত এবং সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমাত্রার নৌ শক্তি বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় নিয়ে গেছে।
ইরান আসলে ‘কোড ১০০’ সক্রিয় করেছে?
এক্সের ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স অ্যাকাউন্ট, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্ত টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ‘কোড ১০০’ সক্রিয় করার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
যদিও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের সামরিক তৎপরতা সর্বোচ্চ প্রস্তুতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছে, তেহরানের সরকারি মাধ্যমগুলো, যেমন ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি (ইরনা) ও তাসনিম নিউজ এজেন্সি, অভ্যন্তরীণ এই সাংকেতিক নাম প্রকাশ্যে নিশ্চিত বা উল্লেখ করেনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জনসমক্ষে এ ধরনের তথ্য নিশ্চিত না করা একটি প্রচলিত রীতি। ইরানি শাসনব্যবস্থা অভিযানগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ জনমনে আতঙ্ক এড়াতে খুব কমই স্পষ্টভাবে অভ্যন্তরীণ সতর্কতা ঘোষণা করে।
তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক নামকরণ যা-ই হোক, মাঠপর্যায়ে সামরিক শক্তির অবস্থানে পরিবর্তন, যেমন ক্ষেপণাস্ত্রের চলাচল, ইলেকট্রনিক জ্যামিং ও সৈন্য সমাবেশ, সক্রিয়ভাবে ঘটছে ক্যাম্প ডেভিড থেকে ট্রাম্পের আকস্মিক প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে তৈরি জল্পনা ওয়াশিংটনের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। এতে সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপ নিয়ে নানা তত্ত্ব এবং এমনকি স্থল হামলার গুজবও ছড়িয়েছে।
তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো কঠোরভাবে তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।




