ফ্রান্সে নতুন বিক্ষোভ মোকাবিলায় ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত

ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভ ও সহিংসতার আশঙ্কায় দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত সপ্তাহে বিক্ষোভের আড়ালে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবারের কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।
শুক্রবার ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ প্যারিসে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা ও লুটপাটের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ছে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা পরিষদের শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। সংকটের কারণে চলতি মাসের শেষ দিকে নাইজেরিয়া ও সেনেগাল সফরও স্থগিত করতে পারেন তিনি বলে তার সহযোগীরা জানিয়েছেন।
প্রথমবারের মতো উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন ম্যাখোঁ। স্কুলের অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত। পরে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ক্ষোভে রূপ নেয় এটি।
শিক্ষার্থীদের সংগঠন রেনুভো লিসেনের সভাপতি নাথানায়েল কোমবারি বৈঠকের আগে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, স্কুলের অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ‘পারকুরসুপ’ পদ্ধতির সংস্কারসহ তাঁদের দাবিগুলো প্রেসিডেন্টের কাছে তুলে ধরা হবে।
গত শনিবারের বিক্ষোভের সময় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানান, ওই দিনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আদালত ইতিমধ্যে ২১৭ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই আগে কোনো অপরাধে দণ্ডিত হননি।
বৃহস্পতিবার ম্যাখোঁ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ কঠোরতা’ অবলম্বনের আহ্বান জানান। তার অভিযোগ, গত সপ্তাহে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রজাতন্ত্রের সরকারব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
বিভিন্ন শহরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা
শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভের স্থান ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
অর্লেয়ঁ শহরে ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেনের দল ন্যাশনাল র্যালির (আরএন) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনে হাজার হাজার সমর্থকের সমাগমের পাশাপাশি দলটির বিরোধীদেরও বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এতে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
শহরটিতে ল্য পেনের দলের বিরুদ্ধে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শনে শুক্রবার সেখানে যাওয়ার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়ঁর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতেও বিক্ষোভকারীদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের বাস্তিল ও নাসিওঁ স্কয়ারের মধ্যবর্তী নির্দিষ্ট পথে মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মার্সেই শহরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও শুক্রবার কর্তৃপক্ষ জানায়, ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তে একটি শ্রমিক সংগঠনের বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শহরটিতে শনিবার সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রাখার আগের সিদ্ধান্তও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে প্যারিসে শনিবার লুভরসহ বেশ কয়েকটি প্রধান জাদুঘর বন্ধ থাকবে। আর্ট বাসেল শিল্পমেলাও নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে পুলিশের আগাম প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর এবার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জ্যেষ্ঠ ইউরোপবিষয়ক গবেষক ইভা কসে বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত একটি দেশে পুলিশের দায়িত্ব হলো শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বিক্ষোভের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সহিংস বিশৃঙ্খলা থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অস্ত্রে শিশুদের গুরুতর আহত হওয়ার খবর নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপে ম্যাখোঁ সরকার
ফ্রান্সে এই সহিংসতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দেশটির আধুনিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে এই নির্বাচন। এর পাশাপাশি সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
সহিংসতার পর হ্যারিস ইন্টারঅ্যাকটিভের পরিচালিত এবং এম৬/আরটিএল-এর জন্য করা এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় মেরিন ল্য পেন ৩৩ থেকে ৩৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
জরিপ অনুযায়ী, কট্টর বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁর সঙ্গে ল্য পেনের দ্বিতীয় দফার লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ল্য পেন প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পেয়ে সহজেই জয়ী হতে পারেন বলে জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভ, সহিংসতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনঅসন্তোষের মধ্যে এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি ম্যাখোঁ সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। শনিবারের বিক্ষোভ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এখন কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে।
