logo

ইয়েমেনে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব

রয়টার্স
রয়টার্স
ইয়েমেনে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব
সৌদি আরবের রিয়াদের উত্তরে মালহামে সৌদি জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিমান প্রদর্শনী ও সামরিক কুচকাওয়াজ শুরুর আগে প্রদর্শনের জন্য রাখা সাঁজোয়া যানের কাছে সৌদি সামরিক সদস্যরা সমবেত হয়েছেন (২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। ছবি: এপি

ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইয়েমেনে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে রিয়াদ দুটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌদি তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়েমেনি বাহিনী স্থল অভিযান চালাবে এবং সৌদি আরব বিমান হামলার মাধ্যমে তাদের সহায়তা করবে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশও সৌদিকে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এসব মিত্র সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না।

সৌদি আরবের বিবেচনায় থাকা প্রথম পরিকল্পনাটি বাব আল-মান্দেব ঘিরে সীমিত পরিসরের অভিযান। দ্বিতীয়টি তুলনামূলক বড় আকারের, যাতে আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ ইয়েমেনের একাধিক ফ্রন্টে একযোগে হামলা চালানো হতে পারে।

অভিযানের পরিসর অনুযায়ী এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরুর সম্ভাবনা দেখছেন, আবার নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও তা শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সৌদি আরবের এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, হুতিরা উপকূলীয় এলাকায় অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে।

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার মতে, বাব আল-মান্দেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে সৌদি আরব নতুন করে শান্তি আলোচনায় যেতে চাইছে না। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে বলে মনে করছে রিয়াদ।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, নতুন অভিযান ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় সীমিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তার মতে, হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করার পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের উপকূলীয় এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করাই সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের সহায়তা

সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সম্ভাব্য অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের দাবি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণসংক্রান্ত তথ্যও এই সহায়তার আওতায় রয়েছে।

তবে মার্কিন সহায়তার পরিসর সীমিত থাকতে পারে। রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি বিমান হামলার মতো সামরিক সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

এদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পর তুরস্ক ও পাকিস্তানও দেশটিকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে বলে জানা গেছে। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মাসে এডেনে চারটি কার্গো বিমানে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট পাকিস্তানি কর্মকর্তা, একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা ও এক পশ্চিমা কূটনীতিকের দাবি, পাকিস্তানের সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থান করছেন এবং স্থানীয় বাহিনীকে সহায়তা করছেন। পাশাপাশি তুরস্কে তৈরি সৌদি মালিকানাধীন ড্রোনও ইয়েমেনে মোতায়েন করা হয়েছে।

হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করাও রিয়াদের বড় উদ্বেগ। এ কারণে কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব।

পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি সীমান্ত সুরক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে দেশটি ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা সৌদি আরবে মোতায়েন করেছে। তবে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে, ফ্রান্স সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।

বিভক্ত ইয়েমেনি বাহিনী বড় চ্যালেঞ্জ

সম্ভাব্য স্থল অভিযান অনেকাংশেই বিভিন্ন ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করবে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিলেও দীর্ঘ সংঘাতের কারণে তাদের মধ্যে বিভক্তি বেড়েছে।

গত শীতেও ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও তীব্র হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলে নতুন এলাকা দখল এবং বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে কয়েক দফা সংঘর্ষের পর সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছে তারা পরাজিত হয়।

ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু হলে সৌদি আরবকে শুধু হুতিদের সামরিক প্রতিরোধই নয়, নিজেদের মিত্র ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বিভক্তিও সামাল দিতে হবে।