logo

কে এই ধ্রুব রাঠি, ভারতের জনপ্রিয় এই ইউটিউবার কেন এত আলোচিত

কে এই ধ্রুব রাঠি, ভারতের জনপ্রিয় এই ইউটিউবার কেন এত আলোচিত
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

ভারতের রাজনীতি, নির্বাচন, ইতিহাস কিংবা সামাজিক নানা ঘটনা নিয়ে ইউটিউবে যারা ভিডিও দেখেন, তাদের কাছে ধ্রুব রাঠি এক পরিচিত নাম। জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে তিনি বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছেছেন। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার, দেশটির গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তার ভিডিও ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।

তবে ধ্রুব রাঠি শুধু একজন ইউটিউবার নন। তার সমর্থকদের কাছে তিনি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষক ও ক্ষমতাসীনদের সমালোচক। অন্যদিকে, সমালোচকদের কেউ কেউ তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্যের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়াই তাকে ভারতের ডিজিটাল জগতের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

কে এই ধ্রুব রাঠি

ধ্রুব রাঠি একজন ভারতীয় ইউটিউবার, ভিডিও নির্মাতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় বিশ্লেষক। তার জন্ম ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের রোহতকে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি জার্মানিতে যান। সেখানে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়েও পড়াশোনা করেন বলে তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে।

ধ্রুবের ইউটিউব যাত্রা শুরু হয় ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও দিয়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনীতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে ভিডিও তৈরি করা শুরু করেন। বর্তমানে জটিল বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করাই তার কাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

কীভাবে জনপ্রিয় হলেন ধ্রুব রাঠি

২০১৪ সালে ইউটিউবে ভিডিও তৈরি শুরু করেন ধ্রুব রাঠি। শুরুতে তার ভিডিওর মূল বিষয় ছিল ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। পরে তিনি বুঝতে পারেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং জটিল বিষয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সহজভাবে বোঝানো গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর তিনি তথ্য যাচাই, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে ভিডিও তৈরি করতে থাকেন। তার উপস্থাপনার ধরন ছিল কিছুটা আলাদা। দীর্ঘ বক্তব্যের পরিবর্তে তিনি উদাহরণ, পরিসংখ্যান, ছবি, গ্রাফিকস ও অ্যানিমেশনের সাহায্যে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতেন।

এতে এমন দর্শকেরাও উপকৃত হন, যারা নিয়মিত সংবাদপত্র পড়েন না বা রাজনৈতিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুসরণ করার সময় পান না। ধীরে ধীরে তার ভিডিওর দর্শকসংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে ও পরে তার রাজনৈতিক ভিডিওগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

কেন এত বিখ্যাত ধ্রুব রাঠি?

ধ্রুব রাঠির জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। চলুন জেনে নিই সেগুলো-

ভারতের রাজনীতি নিয়ে সরাসরি আলোচনা

ধ্রুব রাঠির পরিচিতির অন্যতম প্রধান কারণ তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। ভারতের নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, বিরোধী দলের ভূমিকা, গণতন্ত্র এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে তিনি নিয়মিত ভিডিও তৈরি করেন।

বিশেষ করে মোদি সরকারের সমালোচনামূলক ভিডিওগুলো তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ভারতের গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সরকারের ক্ষমতা নিয়ে তার কয়েকটি ভিডিও বিপুলসংখ্যক দর্শকের নজর কাড়ে।

আলজাজিরার ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম আলোচিত সমালোচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।


কঠিন বিষয় সহজভাবে বোঝানোর ক্ষমতা

রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বিষয় অনেকের কাছে জটিল মনে হতে পারে। ধ্রুব রাঠি এসব বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।

তার ভিডিওতে সাধারণত দেখা যায়, প্রথমে একটি প্রশ্ন বা ঘটনা তুলে ধরা হয়। এরপর তার পেছনের ইতিহাস, বিভিন্ন তথ্য, পরিসংখ্যান এবং সম্ভাব্য প্রভাব ব্যাখ্যা করা হয়।

এই পদ্ধতির কারণে তার ভিডিও শুধু রাজনৈতিকভাবে সচেতন দর্শক নয়, শিক্ষার্থী ও তরুণদের কাছেও জনপ্রিয় হয়েছে।

২০২৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনের নেক্সট জেনারেশন লিডার্স তালিকায়ও তার নাম স্থান পেয়েছিল।

ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর দাবির বিরুদ্ধে ভিডিও

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, যার সত্যতা যাচাই করা কঠিন। ধ্রুব রাঠি বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের দাবি যাচাই এবং প্রচলিত ধারণার পেছনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভিডিও তৈরি করেছেন।

তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে ভিডিওর সঙ্গে ব্যবহৃত সূত্র প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো দর্শকেরা যেন আলোচিত তথ্যের উৎস নিজেরাও যাচাই করতে পারেন।

তবে তার কোনো ভিডিওকে শুধু উপস্থাপনার ধরন দেখে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা নির্ভুল ধরে নেওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক বক্তব্য, তথ্যের নির্বাচন এবং বিশ্লেষণ যাচাই করতে মূল সূত্রের পাশাপাশি অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনও দেখা প্রয়োজন।

সামাজিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও আগ্রহ

ধ্রুব রাঠির ভিডিওর বিষয়বস্তু শুধু ভারতীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়েও তিনি ভিডিও তৈরি করেন।

এ ছাড়া তার ভ্রমণবিষয়ক আলাদা চ্যানেল রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। ফলে যারা রাজনীতির বাইরের বিষয় জানতে চান, তারাও এসব ভিডিও দেখতে পারেন।

ধ্রুব রাঠিকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

ধ্রুব রাঠির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাকে নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। এর প্রধান কারণ তার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার অবস্থান।

তার সমর্থকদের মতে, তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সাধারণ মানুষের সামনে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরেন, যা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

অন্যদিকে, তার সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, তার ভিডিওতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব থাকে। কোনো কোনো বিষয়ে তার উপস্থাপনা একপক্ষীয় কি না, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সরকারের সমালোচনা করা মানেই কোনো বক্তব্য সঠিক, এমন নয়। আবার সরকারের সমালোচনা করলেই কোনো বক্তব্য ভুল হয়ে যায় না। প্রতিটি দাবির পক্ষে প্রমাণ, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং বিপরীত পক্ষের বক্তব্য যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

২০২৪ সালের নির্বাচনে তার ভিডিও কেন আলোচনায় আসে?

২০২৪ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে ধ্রুব রাঠির রাজনৈতিক ভিডিওগুলো ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায়। ভারতের গণতন্ত্র, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে তার বিশ্লেষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।

বিশেষ করে তরুণ দর্শকদের মধ্যে তার ভিডিও নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। তার ভিডিওর বক্তব্য সমর্থন করেন এমন মানুষের পাশাপাশি বিরোধিতা করেন এমন দর্শকেরাও আলোচনায় অংশ নেন। এর ফলে তার ভিডিও শুধু ইউটিউবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনারও বিষয় হয়ে ওঠে।

তবে তার ভিডিওর জনপ্রিয়তা কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ প্রয়োজন।

২০২৬ সালে আবার কেন খবরের শিরোনামে ধ্রুব রাঠি

২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর প্রকাশিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লির যন্তর মন্তরে সিটিজেনস ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস (সিজেপি) আয়োজিত একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির আগে ধ্রুব রাঠিকে গুরুগ্রামের বাসা থেকে আটক করে দিল্লি পুলিশ।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ওই কর্মসূচিতে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তোলার কথা ছিল। ধ্রুব রাঠির আটকের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে বিস্তারিত তথ্য স্পষ্ট ছিল না। তাই পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও পরবর্তী তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।

এই ঘটনাও তাকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে আটক হওয়ার ঘটনাকে তার জনপ্রিয়তার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, তথ্যভিত্তিক ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমেই তিনি বড় দর্শকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন।

ধ্রুব রাঠির আয় ও জনপ্রিয়তার পরিধি

ইউটিউব থেকে বিজ্ঞাপনের আয়, বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ এবং অন্যান্য বৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতারা অর্থ উপার্জন করতে পারেন। ধ্রুব রাঠিরও ইউটিউবের পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা ও ভ্রমণবিষয়ক উদ্যোগ রয়েছে।

তবে তার মোট সম্পদ বা নির্দিষ্ট মাসিক আয়ের বিষয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যে হিসাব পাওয়া যায়, সেগুলো সব সময় যাচাই করা তথ্য নয়। নির্ভরযোগ্য আর্থিক নথি বা তার নিজের প্রকাশিত তথ্য ছাড়া এসব হিসাবকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

তার জনপ্রিয়তার একটি বড় প্রমাণ হলো, তার ভিডিও ভারতীয় রাজনীতি ও সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে নিয়মিত জনআলোচনা তৈরি করে। নিজের ওয়েবসাইটে তিনি জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে তার প্রধান ইউটিউব চ্যানেল ১ কোটি সাবস্ক্রাইবারের মাইলফলক অতিক্রম করে ডায়মন্ড প্লে বাটন পেয়েছিল।

ধ্রুব রাঠি এমন একজন ভারতীয় ইউটিউবার, যিনি ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও দিয়ে যাত্রা শুরু করে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন। কঠিন বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করা, তথ্য যাচাইয়ের চেষ্টা এবং ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা তার পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাকে কেউ তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষক হিসেবে দেখেন, আবার কেউ তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে ভারতের ডিজিটাল গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনায় তার প্রভাব যে উল্লেখযোগ্য, তা অস্বীকার করা কঠিন।

তার ভিডিও দেখার সময় সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো, বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, ব্যবহৃত তথ্যের উৎস যাচাই করা এবং একই বিষয়ে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য নেওয়া। এতে কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর না করে নিজেই একটি যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।