ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় প্রেসিডেন্ট হারজগ

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো দল বা জোট এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বুধবার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি বিভিন্ন পক্ষের মতামত শুনবেন। জেরুজালেম থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের পদ মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ কাকে দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা তার রয়েছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের পথও খুলে যেতে পারে।
তিন বছরের যুদ্ধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও দীর্ঘদিনের অস্থিরতার পর দেশে স্থিতিশীলতা ফেরাতে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল গ্রহণের পর বুধবার বিকেল ৫টায় দলগুলোর সঙ্গে দুই দিনের আলোচনা শুরু করার কথা রয়েছে তার। প্রথম দিন অতি জাতীয়তাবাদী দল রিলিজিয়াস জায়নবাদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, সব পক্ষের বক্তব্য শোনার সুযোগ নিশ্চিত করতেই ছোট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। বৃহস্পতিবার আলোচনার শেষ পর্যায়ে বড় দুই দল, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী লিকুদ পার্টি এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যপন্থী থেকে মধ্য-ডানপন্থী বিরোধী দল ইয়াশারের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন হারজগ।
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও আইজেনকট; কেউই এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি।
আসন সংখ্যায় নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে রয়েছে। তাদের ঝুলিতে রয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।
আরব সংখ্যালঘুদের দলগুলোর সমর্থন পেলে আইজেনকটের জোট প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী সরকারের প্রতি অসন্তোষের মধ্যে এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর আসন বেড়ে ১৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
তবে বিরোধী জোটের কয়েকজন নেতা আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। নির্বাচনে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
এ অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি জানাতে মঙ্গলবার গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ জমা দেওয়া হয়নি।
আরব-ইসরাইলি নেতারা নেতানিয়াহুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে আইজেনকট অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করছে।
সরকার গঠনে নতুন চিন্তার আহ্বান
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় প্রেসিডেন্ট হারজগ অতীতে বামপন্থী লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন নির্বাচন এড়াতে তিনি দলগুলোর মধ্যে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা ও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের সব সম্ভাবনা যাচাই করা, সংলাপের পরিসর বাড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারে এমন প্রতিটি পথ বিবেচনা করা প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরও কয়েক দফা আলোচনা করতে পারেন হারজগ।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ২৮ দিন সময় পাবেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
প্রথম ব্যক্তি সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতে পারবেন। দ্বিতীয় ব্যক্তিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতারা ২১ দিনের মধ্যে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনীত করার সুযোগ পাবেন। এই প্রক্রিয়াতেও সমাধান না এলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
২০২২ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করতে নেতানিয়াহুর ৫৮ দিন সময় লেগেছিল। সে নির্বাচনে তাঁর লিকুদ পার্টি এবারকার তুলনায় বেশি আসন পেয়েছিল। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইসরায়েলে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন মেয়াদে দেশটির ক্ষমতায় রয়েছেন। তার বিপুলসংখ্যক সমর্থক থাকলেও দেশটির অনেক নাগরিক তাঁর বিরোধিতা করেন। বিচার বিভাগে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ এবং দুর্নীতির মামলাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলছে। ক্ষমতা হারালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদসংশ্লিষ্ট দায়মুক্তির সুবিধা হারানোর পাশাপাশি মামলার মুখোমুখি হওয়ার রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দিতে পারেন তিনি।
নির্বাচনের রাতে আইজেনকট সামরিক বাহিনীর প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য কোনো নির্দেশ পালন করা উচিত হবে না। তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এ ধরনের নির্দেশ দেওয়ার ম্যান্ডেট নেতানিয়াহুর নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিরোধ
নেতানিয়াহু নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রেখে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বিরোধী দলের নেতারা তার নেতৃত্বে এমন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
তাঁদের আপত্তির অন্যতম কারণ নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে তার সরকারের ব্যর্থতা। ওই হামলাটি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন হিসেবে বিবেচিত।
মঙ্গলবার এক কৌশলগত বৈঠকে আইজেনকট ও বিরোধী দলের অন্য নেতারা দ্রুত নতুন সরকার গঠন এবং নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অঙ্গীকার করেছেন। তবে কীভাবে তারা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকার গঠন নিয়ে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হারজগের ধারাবাহিক আলোচনা, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং বিরোধী জোটের মধ্যে সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে দেশটির পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।
