দাবি পূরণ না হলে হরমুজ খুলবে না ইরান

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
দাবি পূরণ না হলে হরমুজ খুলবে না ইরান
ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ তাদের উত্থাপিত সব দাবি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না বলে জানিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী।

Advertisement

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরান কার্যত গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। একই সঙ্গে প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তারা। ইরানের নির্ধারিত পথ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা জাহাজগুলোর বিরুদ্ধেও হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের আগে অবাধে চলাচলযোগ্য এই জলপথে হামলার জেরে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যায়। পরে মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষকে জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের শর্তে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। ওই সমঝোতায় শান্তি আলোচনার একটি পথরেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহাম্মদ বাকের যুলকাদর শনিবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য বেশ কয়েকটি শর্ত তুলে ধরেন। এর মধ্যে লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান এবং তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও আগ্রাসন বন্ধের দাবিও রয়েছে।

ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা বাতিল, জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণেরও দাবি জানিয়েছেন।

রোববার ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানায়, তাদের কৌশল হলো অবরোধ বজায় রাখা, ‘যতক্ষণ না শত্রু আমাদের সব শর্ত মেনে নেয়’। বাহিনীটি বলেছে, ‘এই প্রণালি এখন আমাদের জন্য শুধু একটি জলপথ নয়, বরং কার্যত একটি যুদ্ধক্ষেত্র।’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অবশ্য রোববার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ‘বার্তা বিনিময়’ হচ্ছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ।

চলমান হামলার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করে, প্রণালি অতিক্রমের সময় ইরান তাদের জাতীয় তেল কোম্পানির একটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। একই দিন যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, ওমানের উপকূলে একটি জাহাজ নিক্ষিপ্ত বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দুটি ঘটনার সঙ্গে একই জাহাজ জড়িত কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার ইরানের নাম উল্লেখ না করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ‘বারবার হামলার’ নিন্দা জানায়।

মন্ত্রণালয়টি জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এই অগ্রগতিকে বিপন্ন করতে পারে—এমন যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে।

জুনে স্বাক্ষরিত ইরান-মার্কিন চুক্তিতে বলা হয়েছিল, তেহরান ও মাসকাট অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে আলোচনা করে এবং ‘প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে’ হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা চূড়ান্ত করবে। আন্তর্জাতিক আইন সাধারণত এ ধরনের জলপথে টোল আদায়ের অনুমতি দেয় না।

আরাগচি বলেন, প্রণালিটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে।

লোহিত সাগরেও অবরোধের হুমকি

হরমুজ প্রণালিতে ইরান নৌচলাচল সীমিত করার সময় ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিরাও লোহিত সাগরে সৌদি বন্দরগুলোর ওপর সমান্তরাল সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য এটিই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ।

সৌদি আরব ওই এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানানোর পর রোববার দেশটির লোহিত সাগর উপকূলে একটি সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর ঘোষণা দেয় হুথিরা।

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের সমর্থনে ২০২২ সালে করা একটি চুক্তির কারণে যুদ্ধ এতদিন অনেকটা স্থগিত ছিল। তবে গত মাসে হুথিরা অবরোধ ঘোষণা করার পর সেই চুক্তি কার্যত ভেস্তে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

সরকার-নিয়ন্ত্রিত মোখা শহরের একটি চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, রোববার তিনজন বেসামরিক নাগরিক ও আটজন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। ইয়েমেনের ওই শহরের বন্দরে হুথিদের হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে তারা ওই এলাকায় ‘সৌদি শত্রু’ বাহিনীর সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা জোট

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ভাবমূর্তির পাশাপাশি তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

শুক্রবার সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এতে ন্যাটোর মতো একটি ধারা রয়েছে, যার আওতায় একটি দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শনিবার বলেন, তিনি আশা করছেন মিশরও এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেবে। তিনি মিশরকে ‘সব বিষয়ে একটি স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

এক সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে একে অপরের সঙ্গে জোটের সদস্যদের মতোই আচরণ করছি।’

গত মাসে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত একটি মিশরীয় বন্দরে মার্কিন স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মিশরের ভূখণ্ডে এটিই ছিল এ ধরনের প্রথম হামলা।

ফিদান বলেন, নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। অন্যদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, চুক্তিটির উদ্দেশ্য হলো ‘যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা’।

দাবি পূরণ না হলে হরমুজ খুলবে না ইরান