ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইটে ছুরিকাঘাত/হাইজ্যাক ঠেকিয়ে ১৮০ যাত্রীর প্রাণ বাঁচানো কে এই ভারতীয় পাইলট

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী একটি ফ্লাইটে মাঝআকাশে বিমানের ককপিটে দুই পাইলটের মারামারি ও ছুরিকাঘাতের নজিরবিহীন ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তবে ফ্লাইটটির ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছরের সাহসিকতায় বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন ১৮০ জন যাত্রী। মাঝআকাশে গুরুতর আহত হয়েও তিনি সম্ভাব্য ফ্লাইট হাইজ্যাক ঠেকান। তার সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ভারতীয় এই পাইলটকে ‘সত্যিকারের হিরো’ বলে উল্লেখ করে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তার প্রশংসা করেন মোদি। তিনি বলেন, গুরুতর আহত অবস্থাতেও অন্যদের জীবন রক্ষায় স্মিথ মচ্ছরের সাহস ও দৃঢ় সংকল্প বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছর সত্যিকারের হিরো। সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন। অন্যদের প্রাণরক্ষার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি। অন্যদের জীবন রক্ষার অটুট সংকল্প দেখিয়েছেন। তার সাহসিকতা শত শত মানুষের প্রাণ বাঁচাতে এবং এক বড় বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে। ক্যাপ্টেন মচ্ছরকে নিয়ে ভারত গর্বিত।’
প্রশংসা ট্রাম্প-নেতানিয়াহুরও
এই ঘটনার পর শুধু মোদি নন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও স্মিথ মচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তার মতে, গুরুতর আহত হওয়ার পরও মচ্ছর প্রতিরোধ চালিয়ে যান। তার এই সাহসিকতায় ১৭৪ জনের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভারতীয় পাইলটকে ‘হিরো’ বলে প্রশংসা করেছেন। বুধবার হোয়াইট হাউসে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘পাইলট খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন। আমার মনে হয় তিনি এখনো খুব একটা স্থিতিশীল নন। আশ্চর্যজনকভাবে এত আহত হয়েও স্মিথ বিচারবুদ্ধি হারাননি। তিনি একজন সত্যিকারের হিরো।’
কে এই ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছর?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মাচ্ছার মুম্বাইয়ের ঘাটকোপারের বাসিন্দা। সেখানকার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত এবং তার বয়স ৩৫-এর কাছাকাছি। তার ভাইও পাইলট এবং তিনিও ফ্লাইদুবাইয়ে বিমান পরিচালনা করেন।
বিজনেস টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার পর ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার প্রথমে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি কোর্সে ভর্তি হন। তাদের পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে এই বিষয়টির সম্পর্ক থাকায় তিনি এই বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। পরে তিনি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়ার সময় ১৯ বছর বয়সে একটি বিমান চলাচলবিষয়ক সেমিনারে অংশ নিয়ে তিনি বিমান চালানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
লিংকডইনে তার পেশাগত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওয়েলিংকর ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট-এ ২০০৭–২০০৮ সালে পড়াশোনা করেন। হিন্দুস্তান টাইমস তার শিক্ষাগত যোগ্যতাকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি হিসেবে উল্লেখ করেছে। এরপর তিনি নিউজিল্যান্ডে বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) অর্জনের জন্য প্রায় ১৮ মাস প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণ ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয় বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ভারতে ফিরে হরিয়ানার মানেসর/গুরগাঁওয়ের এফএসটিসি-তে বোয়িং ৭৩৭ বিমান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিমান-ধরনভিত্তিক প্রশিক্ষণ (টাইপ রেটিং) সম্পন্ন করেন। তার স্ত্রী ও দুই সন্তান দুবাইয়ে থাকেন। তবে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি দ্য গার্ডিয়ান।
এনডিটিভি জানায়, ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার প্রায় চার বছর ধরে ফ্লাইদুবাইয়ে কাজ করছেন। এর আগে তিনি ভারতের স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে প্রায় ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজে তার ১৩ বছরের বেশি বাণিজ্যিক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তার উড্ডয়ন সময় প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ ঘণ্টা বলে তার পেশাগত প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে।
কী ঘটেছিল ওই ফ্লাইটে?
ঘটনাটি ঘটে বুধবার ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে। ওই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন বা প্রধান পাইলট ছিলেন স্মিথ মচ্ছর। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিল ফ্লাইটটি। ফ্লাইটে ছিলেন ১৭৪ জন যাত্রী। তাদের মধ্যে ১৫০ জনই ইসরায়েলের নাগরিক। এ ছাড়া ২৭ জন শিশু ছিল।
দুবাই থেকে উড্ডয়নের পর মাঝআকাশে ককপিটে ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছর ও তার কো-পাইলটের মধ্যে আচমকা ঝামেলা শুরু হয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ওমানের নাগরিক ওই কো-পাইলট ফ্লাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ছুরি নিয়ে ক্যাপ্টেন মচ্ছরের ওপর হামলা চালান। হামলাকারী পাইলট তখন ফ্লাইটটি বিধ্বস্ত করার বা অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুর ওপর আছড়ে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ।
বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। তবে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কো-পাইলটের হামলায় গুরুতর আহত হন মচ্ছর। তাকে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করা হয়। তিনি পাল্টা প্রতিরোধ করেন ও হামলাকারীকে ফ্লাইটের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেননি।
লড়াইয়ের একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ককপিটের দরজা খুলে দেন। ভেতরের পরিস্থিতি দেখে যাত্রী ও অন্য ক্রু সদস্যরা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন। ঘটনার সময় বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল। আচমকা সেটি অত্যন্ত দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
পরে ফ্লাইটে থাকা আরও দুই রিলিফ পাইলট ককপিটের দায়িত্ব নেন। ১৮০ জন যাত্রীসহ ফ্লাইটটিকে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে, আহত ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মচ্ছর ও ওমানি কো-পাইলট দুজনকেই সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। মচ্ছর বর্তমানে আইসিইউতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তার বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে।
তাবুক বিমানবন্দরের মালিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বিমানের ক্যাপ্টেন এবং ফার্স্ট অফিসার আহত হন এবং তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে তাদের আঘাতের কারণ কী ছিল, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি কিছু জানায়নি।
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, ফ্লাইটির ডেকে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল এবং সব যাত্রী নিরাপদ রয়েছেন। ফ্লাইটটিতে অন্তত ১৫০ জন আরোহী ছিলেন। যাত্রীদের প্রায় সবাই ইসরায়েলি নাগরিক বলে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন।


