সুপার এল নিনোর তাণ্ডবে ভারতেই ৫৫ হাজার প্রাণহানির শঙ্কা

ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা বাড়ার এই প্রাকৃতিক ঘটনার মারাত্মক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা, আকস্মিক বন্যা ও প্রচণ্ড ঝড়-ঝঞ্ঝার মতো চরম আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। এবারের এল নিনোকে রেকর্ড সৃষ্টিকারী জলবায়ুগত সংকট হিসেবে দেখছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তাদের কেউ কেউ একে ‘সুপার এল নিনো’ বলেও অভিহিত করছেন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, গত সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৩ দশমিক ০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
এদিকে ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের একটি মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, এল নিনোর কারণে কোন কোন অঞ্চলে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি হতে পারে। সংস্থাটির ‘এল নিনো হিট মর্টালিটি ট্র্যাকার’ অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসে অতিরিক্ত ৩ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এল নিনোর কারণে তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি মূলত বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোতে বেশি থাকবে। ট্র্যাকারটির হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে ভারতে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই ঘটতে পারে মার্চে। নাইজেরিয়ায় সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫৬ হাজার বলে অনুমান করা হয়েছে।
ট্র্যাকারটির পূর্বাভাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেও তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর রয়েছে ব্রাজিল। দেশটিতে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ‘আমরা বর্তমানে যে সুপার এল নিনোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এই ট্র্যাকার তারই তথ্য সরবরাহ করে।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক আবহাওয়াবিশেষজ্ঞ এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাবে মুম্বাইয়ে বায়ুদূষণ আরও বাড়তে পারে।
সিস্টেম অব এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড ওয়েদার ফোরকাস্টিং অ্যান্ড রিসার্চের (সাফার) প্রতিষ্ঠাতা-প্রকল্প পরিচালক ও ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের চেয়ার অধ্যাপক গুফরান বেগ বলেন, ‘মুম্বাইয়ের মতো শহরে বৃহৎ পরিসরের বায়ুপ্রবাহ ধীর হয়ে যাবে। এর অর্থ হলো, বাতাস জোরালো থাকলে শহরটি যে প্রাকৃতিক সুরক্ষা পায়, তা হারিয়ে ফেলবে।’
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, চলতি বছরের এল নিনো ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এর সর্বোচ্চ পর্যায় এখনো আসেনি বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।
জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থাটি বলেছে, ডিসেম্বরে পূর্বাভাসিত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে এল নিনো আরও তীব্র হতে পারে। ফলে বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাব ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
এল নিনো মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয়। এটি প্রায় নয় থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ুগত পরিস্থিতি এল নিনো ও এর বিপরীত অবস্থা লা নিনার মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়। এ দুটির মাঝখানে নিরপেক্ষ অবস্থাও বিরাজ করতে পারে।


