logo
Advertisement

সাংবাদিকরা তো আগে দড়ি ছেঁড়েন!

নিয়ন মতিয়ুল
নিয়ন মতিয়ুল
সাংবাদিকরা তো আগে দড়ি ছেঁড়েন!
নিয়ন মতিয়ুল। ছবি: সংগৃহীত

‘আপা’ কি কখনও বলেছিলেন ‘ম্যাজিকেল লেডি’ বলতে? কখনও কি ভেবেছিলেন, ‘নোবেল পেতে তাকে লবিং করা উচিত’? ‘বিশ্বনেতা’ হয়ে বাবুদের ধরাছোঁয়ার বাইরে কি চলে যাচ্ছিলেন? জুলাইয়ে এতটা নিমর্ম কি হতে পারতেন, যদি না মহাতারকারা বাতাসে ফুলাতেন?

Advertisement

সেকালে গণভবনের সব ইটেরা মুখস্থ করেছিল সেই কবিতাটি, সাহেব কহেন, “চমৎকার! সে চমৎকার!”/ মোসাহেব বলে, “চমৎকার সে হতেই হবে যে!/ হুজুরের মতে অমত কার?”

মশকরায় মজে ‘আপা’ বলতেন, ‘ওপারে খাবার রেডি, না খেয়ে যাবে না কেউ!’ আহা, খাবারের কী ভুরভুরে ঘ্রাণ। আপার ঈদ সেলামির কার্ড ফেবুতে শেয়ার করে বঞ্চিতদের বুকে জ্বালা ধরানোর কি সুখ! পদ-কমিটির তদবির বাণিজ্যে প্লট-ফ্ল্যাট-ব্যাংক ব্যালান্স বাগানোর কি উৎসব!

সেই জমানায় যারা বঞ্চিত হয়েছিলেন তারাই কি রেজিম চেঞ্জে হাউজে হাউজে হামলা আর দখল উৎসবে পুলকিত হয়েছিলেন? ইন্টেরিমে বড় বড় চেয়ার হাইজ্যাক করেছিলেন? প্রেস ক্লাবে ‘আপা আপা’ করাদের তাড়িয়েছিলেন?

‘আপার’ বিদায়ে হাজির হওয়া নতুনরা আর ভুলের রিপিট করতে চাইলেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘আপাজীবীদের’ খপ্পরে পড়া যাবে না। চব্বিশের আগস্টের পর তাই প্রথম দফায় আমির ‘হুজুরই’ অনুরোধ করলেন, ‘প্লিজ, আপনারা ব্যক্তি বা দলের হয়ে কাজ করবেন না।’

কিন্তু কেউ কি হুজুরের কথা শুনেছিলেন? সব প্রেসক্লাব, ইউনিয়ন দখল হয়ে বদলে গেল তালিকা। মোসাহেবদের ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে জুলাই বর্ষপূর্তিতে তাই আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী করজোড়ে অনুরোধ করলেন, ‘বিএনপির সাংবাদিক হওয়ার দরকার নেই, প্লিজ।’ সেই অনুরোধের সপ্তাহ খানেক পরে এনসিপির দুই নেতাও হাতজোড় করে বললেন, ‘প্লিজ, দল-গোষ্ঠী-করপোরেট স্বার্থে নয়, জনগণের জন্য কাজ করুন।’

নেতাদের এমন গায়ে পড়ে উপদেশ দেওয়ায় সম্ভবত ‘ভাইয়া’ আর ‘হুজুরপ্রেমী’ খবরজীবীরা চরম বিরক্ত হচ্ছিলেন। কারণ ‘আপাজীবীদের’ যেমন অর্থনীতি ছিল, ঠিক একইভাবে ‘ভাইয়া বা হুজুরজীবীদের’ও তো সম্ভাবনাময় অর্থনীতি আছে। আগে আপার সঙ্গে এক ফ্রেমে একখান ফটো দেখালেই বড় বড় চেয়ার, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যাংক ব্যালান্স মিলতো। সেটা এখন কেন হবে না?

খবরজীবীদের এমন কাণ্ডে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিলেন স্বয়ং মির্জা সাহেব। গেল বছরের ২৪ নভেম্বরে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) আয়োজিত মিডিয়া সংস্কার প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় অংশ নিয়ে সেই ক্ষোভ উগড়ে দিলেন। ঠাস করে বললেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোতো আপনাদের (সাংবাদিকদের) কাউকে পকেটের মধ্যে নিতে চায় না। কিন্তু আপনারা যদি পকেটে ঢুকে যান, তখন কিন্তু দ্যাট বিকাম এ প্রবলেম।’

এত বড় অপমান করার পরেও মির্জা সাহেব দেখলেন, ‘খবরজীবীদের’ খাসলত যাচ্ছে না। তাই আরও ক্ষিপ্ত হলেন। গত ১৪ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে আরেকধাপ চটে গিয়ে বললেন, ‘চাটুকারিতা কাকে বলে এখন মিডিয়াকে দেখলে বুঝা যায়।’ মির্জা সাহেবের এমন চপেটাঘাতে এক সহকর্মী ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘খবরজীবীদের গায়ে ভাই গ... চামড়া, এসব কথায় তাদের যায় আসে না।’

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন মনে হয় বুঝতে পারছেন, যতই গালাগালি করা হোক না কেন, খবরজীবীদেরও একটা দলদাসত্বের টেকসই গভীর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে গেছে। ‘কয়লা যতই ধোওয়া হোক না কেন ময়লা যাবে না।’ তাই তিনি ভিন্নপথ ধরলেন।

মির্জা সাহেবের সেই অমৃতবাণী বর্ষণের পরদিন ১৫ জুন সদ্য ভূমিষ্ট ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ সেমিনারে গিয়ে কৌশল বদলালেন মন্ত্রী। বললেন, ‘গণমাধ্যমকে নিখুঁত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব গণমাধ্যমকেই নিতে হবে।’

তবে একই দিনে টিভি চ্যানেলগুলোর সিইও এবং সিএনইদের সঙ্গে লাঞ্চ করার আগে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলে দিয়েছেন, ‘দলীয় অবস্থান বা সরকারের তোষামোদ নয়, সত্যকে সত্য হিসেবেই জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।’ সরকারপ্রধান আরও বলেছেন, ‘কোনো সাংবাদিককে বিএনপি বা দলের পক্ষ হয়ে কাজ করার দরকার নেই।’

আগে মির্জা সাহেব যেমনটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, একই কথা বললেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেই বললেন, দেশব্যাপী যে স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং চলছে, সেখানে তার স্ত্রী গেলেই কেবল খবর প্রকাশ হচ্ছে, তার বাইরে সেগুলো নিয়ে লিখছে না কেউ।

একদম খাঁটি কথা। দেশে নেতা-মন্ত্রী-সচিবালয় সাংবাদিকতার বাইরে কিছু নেই। নিন্দুকেরা তো ঠিকই বলেন, ‘খবরজীবীরা’ দলদাসত্ব করেন আদর্শের জন্য নয়, আখের গোছানোর জন্য। যারা ‘আপাকে’ ফেরাতে মসজিদে নফল নামাজ আদায় করছেন, আর যারা ‘ভাইয়ার’ ওপর ভর করতে দিনরাত জিকির করছেন তাদের লক্ষ্য একই। আবার যেসব ‘খবরজীবী’ দেশকে আফগানিস্তান বানানোর পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করেন, স্বপ্ন দেখেন সেটাও একটা অর্থনীতিই।

তথ্যমন্ত্রীর উপলব্ধিই তার প্রমাণ। তিনি বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের কাছে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘সম্মিলিতভাবে ভিন্নমত চর্চার সংস্কৃতিকে কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক করা যায়নি।’ তার মতে, ‘ভিন্নমতকে অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর মধ্যে এনে, এর তর্ক-বিতর্কের প্রতিযোগিতাকে প্রগতির উপাদানে পরিণত করতে হবে। দেশ ও মানবতার সমৃদ্ধির লক্ষ্যে গণমাধ্যমকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের চর্চা করা সম্ভব হবে না।’

ইদানিং কী সব কঠিন কঠিন কথা বলছেন তথ্যমন্ত্রী। সব তো মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। আসল কথা হচ্ছে, ‘ধর্ষণ যদি কারো কাছে উপভোগ্য হয়, তাকে ভিকটিম বলবেন কীভাবে? যারা নিজেরাই দড়ি ছেঁড়ে তাদের আটকাবেন কেমনে?’

প্রেসক্লাব, ইউনিয়ন, ফোরাম, ইউনিটি- যেখানেই যাবেন, দেখবেন শুধুই দড়ি ছেঁড়াদের রাজত্ব। চরম অনিশ্চিত, অনির্ধারিত, বিপজ্জনক ‘খবরজীবী’ পেশায় দড়ি না ছিঁড়লে, ‘আপা আপা’, ‘ভাইয়া, ভাইয়া’, ‘হুজুর হুজুর’ না করলে কোনো গতিও নেই, তাই না?

লেখক: সাংবাদিক

(আমরা সবাই দড়ি ছেঁড়া: ১৭ জুন, ২০২৬। সেন্ট্রাল রোড, ঢাকা)