এবারের বাজেট কতটা সংস্কৃতিবান্ধব?

প্রতি বছরই আমরা দাবি জানাই, জাতীয় বাজেটের অন্তত ১ শতাংশ সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ রাখা হোক। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আমাদের আরেকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, বরাদ্দই কি সাংস্কৃতিক উন্নয়নের একমাত্র শর্ত? বাস্তবতা হলো, সংস্কৃতি খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায়ই দলীয় আনুগত্যভিত্তিক কার্যক্রম, কেন্দ্রভিত্তিক আয়োজন কিংবা জনসম্পৃক্ততাহীন প্রকল্পে ব্যয় হয়। ফলে শুধু বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেই সংস্কৃতির প্রকৃত বিকাশ ঘটবে—এমন ধারণা গ্রহণের সুযোগ নেই।
সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতির স্মৃতি, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার ভিত্তি। একটি জাতি তার ইতিহাস, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য ও লোকজ ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই নিজেকে আবিষ্কার করে। সে কারণে সংস্কৃতি খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় নয়, বরং মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবকাঠামো নির্মাণের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৮২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৭৫৩ কোটি টাকার তুলনায় বেশি। পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমকালীন বিশ্বে সংস্কৃতি শুধু নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান, সৃজনশীল শিল্প, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং জাতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের অন্যতম চালিকাশক্তি।
তবে প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হবে? বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকট মূলত অর্থের সংকট নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। রাজধানীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অসংখ্য গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাট্যদল, গবেষণা উদ্যোগ এবং লোকশিল্পী ন্যূনতম সহায়তা ছাড়া টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণ, আঞ্চলিক সংস্কৃতির গবেষণা, জেলা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনার দলিলভিত্তিক সংরক্ষণের মতো কাজগুলো এখনও জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় যথাযথ স্থান পায়নি।
একটি সংস্কৃতিবান্ধব বাজেটের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যাবে তখনই, যখন বরাদ্দের অর্থ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় হবে। যখন একজন লোকশিল্পী তার শিল্পচর্চার জন্য ন্যায্য পৃষ্ঠপোষকতা পাবেন, একটি জেলা তার নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের সুযোগ পাবে, তখন একটি গ্রন্থাগার নতুন পাঠক সৃষ্টি করবে এবং একজন তরুণ সৃজনশীল মানুষ রাষ্ট্রীয় সহায়তায় তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে।
ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির জন্য বরাদ্দকৃত ৩০০ কোটি টাকার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। এটি যদি শুধু কিছু প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এর সুফল সমাজে বিস্তৃত হবে না। কিন্তু যদি লেখক, গবেষক, প্রকাশক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লোকশিল্পী, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোক্তাদের জন্য একটি উন্মুক্ত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
অতএব, এবারের বাজেটকে সরলভাবে সংস্কৃতিবান্ধব বা সংস্কৃতিবিরোধী বলার সুযোগ নেই। এটি সম্ভাবনাময় একটি বাজেট, কিন্তু সেই সম্ভাবনার বাস্তবতা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দর্শন, অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রতি আন্তরিকতার ওপর। বরাদ্দের অঙ্ক নয়, বরং তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—এই বাজেট সত্যিই সংস্কৃতির পক্ষে ছিল কি না।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
.png)

