বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম আরও সহজলভ্য করা জরুরি

বাংলাদেশে কৃষি ও সবুজ খাতের বিকাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করতে কম সুদে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু সার্কুলার জারি করেছে। শিল্পায়ন আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও কৃষি এখনো অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে দ্রুত শিল্পায়নের এই সময়ে পরিবেশ রক্ষায় সবুজ ও টেকসই অর্থায়নের গুরুত্বও অনেক বেশি।
তবে বাস্তবে ভালো ও সক্ষম ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই এসব তহবিলের সুবিধা নিতে পারছেন না। এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন শর্ত ও সীমাবদ্ধতা। যেমন ঋণের অবশিষ্ট মেয়াদ, ঋণ বিতরণের সময়, নির্দিষ্ট খাত, রপ্তানিমুখী হওয়া ইত্যাদি।
কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান জ্বালানি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করলেও এবং এনার্জি অডিটরের মাধ্যমে তা যাচাই করা হলেও সংশ্লিষ্ট স্কিমে প্রয়োজনীয় তহবিল না থাকায় তারা গ্রিন ফাইন্যান্স নিতে পারছে না। আবার একই ধরনের উদ্যোগের জন্য গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) বা টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (টিডিএফ)-এর দিকে গেলেও ঋণের অবশিষ্ট মেয়াদ, রপ্তানিমুখী হওয়ার শর্ত কিংবা খাতভিত্তিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেই সুযোগও পাওয়া যাচ্ছে না।
অর্থাৎ, চাহিদা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন নির্দেশনার কারণে কার্যকর ও ভালো ঋণগ্রহীতারা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কোনো কোনো স্কিমে ঋণ আদায়সংক্রান্ত সমস্যার কারণে তহবিলের সংকট রয়েছে।
আবার কোনো স্কিমে তহবিল থাকলেও ঋণের অবশিষ্ট মেয়াদ বা অন্যান্য শর্তের কারণে তা নেওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে সম্ভাবনাময় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। এসব শর্ত কিছুটা শিথিল করে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা সহজ করা গেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের বোঝা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এর ফলে শুধু শিল্পের অর্থায়নই নয়, সবুজ ও টেকসই উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে সিএমএসএমই ও উদীয়মান খাতকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ ধরনের সুবিধার আওতায় আরও বেশি বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে অবদানের সুযোগও তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশেষ করে ভারী শিল্পগুলো বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এতে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কম সুদে পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ পাওয়া গেলে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া এবং ব্যবসা টেকসই রাখা সহজ হবে।
তাই এখন প্রয়োজন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমগুলোর শর্ত আরও সহজ ও বাস্তবসম্মত করা। গ্রিন ফাইন্যান্স স্কিম, টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (টিডিএফ), গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) ইত্যাদির মধ্যে আরও সমন্বয় করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষির উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে এসব তহবিলের আকারও বাড়ানো যেতে পারে। কারণ শুধু স্কিম চালু করাই যথেষ্ট নয়, প্রকৃতপক্ষে যারা ভালো ঋণগ্রহীতা এবং দেশের কৃষি, শিল্প ও সবুজ অর্থনীতিতে অবদান রাখার সক্ষমতা রাখে, তাদের কাছে এসব সুবিধা পৌঁছানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শর্তগুলো কিছুটা নমনীয় করে তহবিলের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা গেলে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমগুলো আরও কার্যকর হবে এবং দেশের শিল্প ও কৃষি খাতও এর সুফল পাবে।
লেখক পরিচিতি
কৌশিক আজাদ প্রণয় একজন ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।



