গার্ডিয়ানের কলাম /বিশ্ব অর্থনীতি কোনোমতে টিকে আছে, তবে সামনে আসছে বড় ঝড়

চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির জন্য খুব বেশি ভালো খবর নেই, বরং খারাপ খবরই বেশি। দুটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম এবং সরবরাহব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছেন। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিরোধ তীব্র হচ্ছে।
তবে এখনো পর্যন্ত এই সংকটের ধাক্কা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সহনীয় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিতে এবার ব্যাংককে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা। সৌভাগ্যবশত তাদের ২০০৮ সালের মতো বিশ্ব কাঁপানো কোনো চরম ব্যাংকিং বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না।
আইএমএফ যথার্থই বলেছে যে কঠিন বাধা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশ দারুণ প্রতিরোধক্ষমতা দেখিয়েছে। পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি খারাপ হতে পারত। এমনকি যুক্তরাজ্যের জন্যও কিছু ভালো খবর ছিল। আইএমএফ দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর সরকারি পরিকল্পনার প্রশংসা করেছে।
অতীতের তুলনায় বিশ্ব অর্থনীতির এই টিকে থাকা বেশ অপ্রত্যাশিত। অতীতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মতো বড় সংকটে তেলের বাজারে যে ধাক্কা লাগত, তার তাৎক্ষণিক মারাত্মক প্রভাব পড়ত অর্থনীতিতে। তবে এবার প্রবৃদ্ধি টিকে থাকার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকার পেছনে তিনটি মূল কারণ কাজ করেছে।
প্রথম কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ। এই প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে উন্নত দেশগুলোর জোট জি–সেভেনের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় কারণ হলো বিভিন্ন দেশ তাদের মজুত থাকা জ্বালানি তেল ব্যবহার করেছে। এই মজুত ব্যবহারের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ঘাটতি কিছুটা পূরণ হয়েছে। মজুত তেল ব্যবহার না করলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও মারাত্মকভাবে বেড়ে যেত। তৃতীয় কারণটি হলো চীনের সস্তা পণ্য রপ্তানির কৌশল। বিশ্ববাজারে চীন সস্তা পণ্য ছেড়ে দেওয়ায় অন্যান্য দেশে আমদানি পণ্যের দাম খুব বেশি বাড়তে পারেনি।
তবে বিপদের আশঙ্কা কিন্তু মোটেও কেটে যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে এবং সংঘাত সৌদি আরবেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন দেশে তেলের মজুতও ফুরিয়ে আসছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অন্তহীন যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে ফেলছেন, যা তিনি একসময় তীব্রভাবে বিরোধিতা করতেন। চীনের সস্তা পণ্যেরও নেতিবাচক দিক রয়েছে। এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর উৎপাদন খাতের লাখো মানুষের চাকরি হুমকিতে পড়েছে, যার বড় শিকার হচ্ছে জার্মানি।
এ ছাড়া এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগের কারণে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেছে। এর ফলে এআই ছাড়া অন্য সাধারণ খাতগুলোতে পুঁজির চরম সংকট তৈরি হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকারগুলোর ওপর এখন খরচ কমানো কিংবা কর বাড়ানোর জন্য চাপ বাড়ছে।
আইএমএফের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি সরকারি খরচ কমানোর তাগিদ দিচ্ছেন। অথচ সাধারণ মানুষ নেতাদের কাছে থেকে আরও বেশি সহায়তা চান। কৃচ্ছ্রসাধন বা সরকারি খরচ কমানোর নীতি জনগণ আর মেনে নিতে রাজি নয়। অর্থমন্ত্রীরা এই কঠিন বাস্তবতা জানেন। এরপরেও যদি তাঁরা কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর পদক্ষেপ নেন, তবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
একই সময়ে দেশগুলোর সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় সরকারগুলোকে অভ্যন্তরীণ স্বনির্ভরতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হচ্ছে। ভারত ও ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষের সংকট দূর করতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কতটা জরুরি হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংকট সামাল দেওয়ার মতো কার্যকর রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দেশগুলোর নেই বললেই চলে।
বিশ্বায়নের যুগ যখন পিছু হটছে, তখন আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে শক্তিশালী বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। সংরক্ষণবাদের এই নতুন যুগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকও যুক্তরাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী আচরণের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
অনেকে ভাবেন যে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কোনো প্রেসিডেন্ট এলে হয়তো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন যুগের সূচনা হবে। কিন্তু এই চিন্তা একেবারেই ভুল। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংকট আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক যে উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তা অনেক আগে থেকেই ভেঙে পড়েছিল।
জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা রিচার্ড কোজুল-রাইট এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক আজ তাদের মূল আদর্শ হারিয়ে ফেলেছে। ৮২ বছর আগে শুরু হওয়া ওই আদর্শে অর্থনীতি পরিচালনায় রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা, জোরালো শিল্পনীতি, পূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দরিদ্র দেশগুলোর উন্নয়নে সহায়তার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু গত কয়েক দশকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক পুঁজিপতিদের অবাধ ব্যবসা এবং বেসরকারি মুনাফা সুরক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের সরকারের নীতি গ্রহণের সুযোগ কমে গেছে। উল্টো বৈষম্য বৃদ্ধি, ঋণের বোঝা এবং মানুষের চরম হতাশা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে এই সংস্থাগুলো।
আর্থিক সংকটে পড়া দেশগুলোকে আইএমএফ যে ঋণ দেয়, তা বিশ্লেষণ করলেই নীতিগত স্বাধীনতার এই অভাব পরিষ্কার বোঝা যায়। সংস্থাটি কঠিন সব শর্ত দিয়ে ঋণ দেয়। দ্রুত কর বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় এক ধাক্কায় কমানোর শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।
আইএমএফ এই কঠোর নীতিকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে দাবি করে। তবে তাদের সাফল্যের সংজ্ঞা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। আইএমএফের সাফল্যের অর্থ হলো ঋণ নেওয়া দেশটির পরবর্তী তিন বছর আর নতুন ঋণের প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু এই নীতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলো কি না কিংবা দারিদ্র্য কমল কি না, তা মোটেও নিশ্চিত হয় না।
স্পষ্টতই অতীতের সেই জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক নীতিতে ফিরে যাওয়া আজ ভীষণ জরুরি। তা নিশ্চিত হলে প্রতিটি দেশের সরকার নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব উন্নয়ন কৌশল তৈরি করতে পারত। এর ফলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ত। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দরিদ্র দেশগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পেত এবং ঋণের ফাঁদ থেকে দেশগুলো মুক্তি পেত। কিন্তু সত্যি কথা হলো, অদূর ভবিষ্যতে এমন ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটার কোনো আশাই নেই। ফলে পৃথিবী আরও উত্তপ্ত হবে, সংঘাত বাড়বে, বৈষম্য তীব্র হবে এবং মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে।
আইএমএফ আশঙ্কা করছে যে অর্থনীতির এই সহনশীলতা খুব দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। সংস্থাটির এই শঙ্কা অত্যন্ত যৌক্তিক। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে এলে হয়তো তেলের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে। কিন্তু তা যদি খুব দ্রুত না ঘটে, তবে সামনে এক দীর্ঘ ও অন্ধকার শীতকাল অপেক্ষা করছে। বিশ্ব এখন যে অবস্থায় আছে, তাকে কোনোভাবেই সংকটমুক্তি বলা যায় না। এটি মূলত সংকটকে কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দেওয়া মাত্র। পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি বড় ধরনের ঝড়ের আগের এক সাময়িক নীরবতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক পরিচিতি
ল্যারি এলিয়ট ব্রিটিশ সংবাদামাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের নিয়মিত কলাম লেখক ও খ্যাতিমান ব্রিটিশ অর্থনীতি সাংবাদিক। তিনি দীর্ঘ তিন দশক ধরে গার্ডিয়ানের অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য, উন্নয়ন নীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে একাধিক সাড়া জাগানো গ্রন্থের সহলেখক।


