একজন টিউলিপের গল্প/চলে গেলেন পুঁজি বাজারের অন্যতম পথিকৃৎ ইয়াওয়ার সায়ীদ

বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘এইমস অব বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াওয়ার সায়ীদ গত ১৩ জুন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্টে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি প্রায় সাত মাস ধরে ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের একজন পথিকৃৎ হিসেবে ইয়াওয়ার সায়ীদ দেশের প্রথম বেসরকারি খাতভিত্তিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ও প্রথম বেসরকারি খাতের মিউচ্যুয়াল ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব, সততা ও অবদান দেশের আর্থিক খাতে চিরষ্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পুঁজিবাজার ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও গতিশীল এই ব্যক্তিত্ব ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ফটোগ্রাফি, ইতিহাস সংরক্ষণ, লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী অ্যাসোসিয়েশানে তিনি ছিলেন এক অনন্য ও প্রাণবন্ত ব্যক্তি। তিনি বন্ধু, ক্যাডেট কলেজ কমিউনিটি ও পরিচিত মহলে ‘টিউলিপ’ নামে পরিচিত ছিলেন।
ইয়াওয়ার সায়ীদের মৃত্যুতে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-সহকর্মী, পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ক্যাডেট কলেজ কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমেছে। তাকে শ্রদ্ধা ও স্মরণে ভাসছিল সোশ্যাল মিডিয়া। বিশেষত ফেসবুকে প্রিয়জন, বন্ধু, সহকর্মী, সাবেক ক্যাডেট, ও শুভ্যানুধায়ীরা তাকে বিভিন্ন অভিধায় অভিসিক্ত করেছেন।
জন্ম শৈশব ও শিক্ষা
ইয়াওয়ার সায়ীদ ১৯৫৯ সালের ২৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি (১৯৭৪) ও এইচএসসি (১৯৭৭) পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
ইয়াওয়ার সায়ীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন (১৪ তম ব্যাচে)। ১৯৯৫ সালে সিকিউরিটিজ ইনস্টিটিউট অব অস্ট্রেলিয়া থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (ফিন্যান্স) লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি নেতৃত্বগুণ, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং আর্থিক খাত নিয়ে গভীর আগ্রহের জন্য পরিচিত ছিলেন।
বর্ণাঢ্য যে কর্মজীবন
বিসিআইসি ব্যাংকে যোগ দিয়ে ইয়াওয়ার সায়ীদের কর্মজীবন শুরু হয়। তার ছিল দেশ-বিদেশে প্রায় চার দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশে প্রথম বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ফান্ড চালু হয়। পরবর্তী সময়ে তার পরিচালনায় আরও পাঁচটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠিত হয়, যেগুলো স্বচ্ছতা ও সুশাসনের জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করে।
পেশাগত জীবনে তিনি দেশের অন্যতম পুরোনো এবং বেসরকারি খাতের পথিকৃৎ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস বাংলাদেশের (এসেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস) নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে তিনি সম্পদ ব্যবস্থাপনা শিল্পকে একটি সুসংগঠিত ও পেশাদার খাতে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ফান্ড ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী কমিটি ও কর্মপরিষদে সক্রিয় ছিলেন। পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ বান্ধব বিধিবিধান প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যে সাফল্য
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইয়াওয়ার সায়ীদ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অপারেশন ইভ্যুালুয়েশন মিশনের স্টাফ কনসালট্যান্ট ও পারফরম্যান্স অডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য এডিবির কনসালটেটিভ গ্রুপ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণা ও উপদেষ্টা সেবা প্রদান করেছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গঠিত অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
কর্পোরেটের বাইরে যে জীবন
করপোরেট ব্যক্তিত্ব হলেও ইয়াওয়ার সায়ীদ ছিলেন একজন খাঁটি সংস্কৃতিমনা মানুষ। ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্র ছিল তার অন্যতম বড় অনুষঙ্গ ও আবেগ। তার মননে ছিল কাব্যিক ও নান্দনিক বোধের এক চমৎকার সংমিশ্রণ।
ফটোগ্রাফি: ক্যানভাসে জীবনের গল্প
ছবি তোলা ছিল ইয়াওয়ার সায়ীদের নেশা। শিল্পী সুজা হায়দার ছিলেন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস-এর শিক্ষক। ১৯৬০ এর দশকে সুজা হায়দারের খুব দামী ক্যামেরা ছিল। তিনি ফটোগ্রাফিতে খুব উৎসাহি ছিলেন। শিক্ষক সুজা হায়দারের সাহচার্য্য ও অনুপ্রেরনায় ইয়াওয়ার সায়ীদ ফটোগ্রাফিতে দক্ষতা অর্জন করেন।
তিনি শুধু শখের বশে ছবি তুলতেন না; তার ছবিগুলোতে থাকতো গভীর জীবনবোধ ও কাব্যের ছোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি নিজের ছবিগুলো শেয়ার করার সময় প্রায়ই চমৎকার সব কাব্যিক ক্যাপশন ব্যবহার করতেন। তিনি ছিলেন যেন ক্যামেরার কবি।
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ, আইবিএ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অ্যালামনাই সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইয়াওয়ার সায়ীদ কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে অনুষ্ঠানের মধ্যমনি হয়ে যেতেন। বিভিন্ন পরিবেশে ও বিভিন্ন গ্রুপে মানুষের ছবি তুলতেন। কখনো ফেসবুকে পোস্ট করতেন। ছবিগুলো তিনি খুব সুন্দরভাবে সংক্ষণ করতেন। তার বিশাল আর্কাইভে ১৯৭০ দশকের সময় থেকে তোলা ছবি সুন্দরভাবে রক্ষিত আছে।
প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন
তার লেন্সের মূল ফোকাস ছিল বাংলাদেশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম এবং ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফি। একজন বিশ্বভ্রমণকারী বা ‘গ্লোব ট্রটার’ হিসেবে তিনি যেখানেই গিয়েছেন, সেখানকার সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন।
ক্যান্সারের দিনগুলোতেও সচল লেন্স
জীবনের শেষ দিনগুলোতে যখন তিনি অস্ট্রেলিয়ার একটি হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখনও হাসপাতালের জানালা দিয়ে দেখা প্রশান্ত মহাসাগর আর আকাশের অপরূপ ছবি তুলেছেন। সেই অ্যালবামের শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘দ্যা ভিউ উইথ আ রুম’।
একজন সৌখিন আলোকচিত্রী হলেও ইয়াওয়ার সায়ীদের ছবি কেবল ফটোগ্রাফি নয়। তা আসলে ক্যামেরার সাহায্যে লেখা একটি জীবন্ত কবিতা ও ইতিহাসের দলিল। ইয়াওয়ার সায়ীদের তোলা এসব ছবি এবং তার সংগৃহীত ডকুমেন্টগুলো প্রাক্তন ক্যাডেট ও সংস্কৃতি প্রেমীদের মাঝে তার এক একটি অনন্য স্মারক হিসেবে রয়ে যাবে।
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ইতিহাস ও ডকুমেন্ট সংরক্ষণ
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের একজন গর্বিত প্রাক্তনী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথিপত্র সংরক্ষণে তার অনন্য অবদান রয়েছে। তাকে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ‘মোবাইল আর্র্কাইভ’ বলা হতো।
ইয়াওয়ার সায়ীদ ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের (৭ম ব্যাচ) শিক্ষার্থী ছিলেন। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ (আইয়ুব ক্যাডেট কলেজ নামে পরিচিত ছিল) মহান মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গৌরবময় ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানসহ তিনি প্রতিষ্ঠানটির গৌরবময় অতীত এবং ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আজীবন কাজ করেছেন। তিনি কলেজের পুরোনো দলিল, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংগ্রহ, ফটোগ্যালারি ও ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তর করার পেছনে অসাধারণ অবদান রাখেন।
‘ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেটস অ্যাসোসিশেয়ান’ (অরকা) গড়ে তোলা এবং একে একটি সুন্দর প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত করার পিছনে ইয়াওয়ার সায়ীদের অসাধারণ অবদান রয়েছে।
কবিতার যে মানুষ ও কেতাব আলীর চলচিত্র
ক্যাডেট কলেজে থাকতেই ইয়াওয়ার সায়ীদ কবিতা ও নাটক লিখতেন। দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে লেখা শুরু হয়েছিল। ক্যাডেট কলেজে সাঁড়া জাগানো তার লেখা একটা কবিতার শিরোনাম ছিল ‘কেতাব আলীর চলচিত্র’।
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ডাইনিং হল কর্মচারী ছিলেন, কেতাব আলী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মারাত্বকভাবে আহত হয়েছিলেন এবং তারপর থেকেই শরীরের এক অংশ অবশ হয়ে আছে। এরপর তার চরম দুঃখের জীবন শুরু, যা নিয়ে তরুণ ইয়াওয়ার সায়ীদ (১৯৭৪) লিখেছিলেন ‘কেতাব আলী চলচিত্র’ কবিতাটি।
‘ওই যে যাচ্ছে একজন লোক
সামান্য খুঁড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে...
দিন যায় মাস যায় শতাব্দী যায়
২৬শে মার্চ ১৬ই ডিসেম্বর যায়।
হাসিমুখ কিছু শিশুকে সবাই দেখতে পায়।
আমি শুধু তাকিয়ে দেখি
আমার স্বাধীনতা ক্যামন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে
হেঁটে যায়।’
এই কবিতার মাধ্যমে ১৫ বছরের তরুণ, যেন একটি সময় ও দেশের বাস্তবতাকেই তুলে ধরলেন। ইয়াওয়ার সায়ীদ অনেক কবিতা লিখেছেন। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো কবিতাগুলো বই আকারে কখনো প্রকাশ করেননি। তবে ফেসবুকে তার কোনো কোনো পোস্ট ঝলসে উঠতো কবিতার ছোয়ায়।
ক্রনিক্যালস্ অব আওয়ার টাইম-পরানের গহীন ভিতর
ইয়াওয়ার সায়ীদ ছিলেন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ৭ম ব্যাচের (১৯৭০-১৯৭৬) ক্যাডেট। এই ব্যাচের ক্যাডেট কলেজে যোগদানের ৫০তম বার্ষিকীতে (২০২০) তার সম্পাদনায় ‘ক্রনিক্যালস্ অব আওয়ার টাইম-পরানের গহীন ভিতর’ শিরোনামে অসাধারণ একটি স্বরণিকা প্রকাশিত হয়। এটি শুধু সপ্তম ব্যাচের ইতিহাস নয়। এটিকে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ইতিহাসও বলা যায়।
সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধনে এক অনন্য প্রাণশক্তি: বন্ধু ও পরিচিত মহলে ‘টিউলিপ ভাই’ নামে পরিচিত ইয়াওয়ার সায়ীদ ছিলেন অত্যন্ত মিশুক, সদালাপী এবং প্রাণবন্ত একজন মানুষ। তিনি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ও আইবিএ-এর অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ত্ব ছিলেন। তিনি যেখানেই যুক্ত ছিলেন, সেখানেই নিজের আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের মন জয় করে নিতেন। সবাইকে একত্র করা জাদুকরি চালিক শক্তি ছিল তার
ইয়াওয়ার সায়ীদের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি বিভিন্ন মত ও পথের মানুষকে একসঙ্গে মেলাতে পারতেন। তার মধ্যে কোনো অহংকার বা দূরত্ব ছিল না। যে কোনো সামাজিক ফোরামে বা আড্ডায় তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার চেয়ে সবাইকে আপন করে নিতে বেশি ভালোবাসতেন। করপোরেট জগতের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যেভাবে পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ রাখতেন এবং বিভিন্ন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করতেন, তা সত্যিই বিরল।
পরিবার ও একজন ফ্যামিলিম্যান
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সামাজিক ও ইতিবাচক মানসিকতার একজন মানুষ। তার সহকর্মী, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে একজন অত্যন্ত চমৎকার হৃদয়ের মানুষ হিসেবে মনে রাখবেন। তার প্রয়াণে বাংলাদেশের সামাজিক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো এক নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবককে হারাল।
ইয়াওয়ার সায়ীদ ১৯৮৪ সালের ১৯ অক্টোবর তারিখে সুফিয়া আকতারের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে আনিক জুহায়ের ও মেয়ে কানেতা রাফেজ। তাদের অতি আদরের নাতনির নাম আমেলিয়া জুহায়ের। তারা সবাই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তিনি ছিলেন পরিবার-অন্তপ্রাণ একজন মানুষ। ইয়াওয়ার সায়ীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেজর সৈয়দ আনওয়ারুল সাবির (অব.) তার মৃত্যুর পর পারিবারিক বন্ধন সম্পর্কে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এ ডিভোটেড হাজবেন্ড, লাভিং ফাদার অ্যান্ড এ প্রাউড গ্রান্ডফাদার’।
অস্ট্রেলিয়ার যত গল্প
ইয়াওয়ার সায়ীদ টিউলিপ ভাইকে আমি ক্যাডেট কলেজে পাইনি। তবে সিনিয়র ক্যাডেটদের থেকে তার তীক্ষ্ন বুদ্ধি, অসম্ভব রকমের ‘উইটি ক্যাডেট’ ও কলেজের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার সাবলীল পদচারণা ও প্রতিভার কথা শুনেছি। ১৯৭৮-এর বসন্তে ক্যাডেট কলেজের অনুষ্ঠিত রিইউনিয়নে তাকে প্রথম দেখি।
প্রায় ৩০ বছর ধরে ইয়াওয়ার সায়ীদ অষ্ট্রেলিয়ার নাগরিক ছিলেন। তবে অধিকাংশ সময় বাংলাদেশেই থাকতেন। টিউলিপ ভাইয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে অনেক গল্প হতো। কম্বোডিয়ায় আমাদের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কয়েকশ শান্তিরক্ষী ছিলো। টিউলিপ ভাইয়ের মাধ্যমে সিডনীর অর্বানে বসবাসকারী একজন অস্ট্রেলীয় শান্তিরক্ষীর সঙ্গে আমার পুনরায় যোগাযোগও হয়।
গ্লোব ট্রটার টিউলিপ ভাইয়ের গল্প-কথা বিশেষত ছবিতে উঠে আসতো সুন্দর দেশ অস্ট্রেলিয়ার ছবি: গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের রঙিন মাছ, আইকনিক সিডনী অপেরা, রেইন ফরেস্ট, ব্ল্যাক মাউন্টেইন, বিউটি অব নাথিংনেস অথবা ক্রিকেটার ডন ব্র্যাডম্যানের মিউজিয়াম...।
গোল্ড কোস্টের দিনগুলো
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের সুন্দর শহর গোল্ড কোস্ট। প্রশন্ত মহাসাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ে এর উপকূলে। প্রায় দুই বছর আগে এখানে একটা স্থায়ী ঠিকানা গড়ে ছিলেন ইয়াওয়ার সায়ীদ।
ইয়াওয়ার সায়ীদের জীবনের শেষের সাতমাস কেটেছে গোল্ড কোস্ট শহরে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গোল্ড কোস্টের টুইড ভ্যালি হাসপাতালে ফুসফুস ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন তিনি। দারুণ সামাজিক, সদালাপী, প্রাণবন্ত ও আড্ডাপ্রিয় টিউলিপ ভাইয়ের টেলিফোনে কথা বলা নিষেধ ছিল। অষ্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পর তার সঙ্গে আর কথা হয়নি। কথা না বললেও মেসেজ পাঠাতেন। তবে ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন।
প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পদ্মা
সেবছর ১০ ডিসেম্বর টুইড ভ্যালি হাসপাতালের (প্যাসিফিক ওশান ভিউ বেড) জানালা থেকে দেখা, প্রশান্ত মহাসাগরের সুন্দর কয়েকটি ছবি তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেন। ‘দি প্যাসিফিক ওশান এন্ড বিয়োন্ড টু দ্যা হ্যাভেনস্...’। পরবর্তীতে, ৫ জুনও ফেসবুকে জানালা থেকে দেখা প্রশান্ত মহাসাগরের সুন্দর দুটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে হাসপাতালের বিছানা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কিন্তু তার মনে পড়তো প্রিয় পদ্মা নদীর কথা...। পদ্মা পাড়ের রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের কথা...। মায়ের কথা...। বাংলাদেশের মানুষের কথা...।
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে শোকের ছায়া... ফেসবুকের পাতা থেকে
একজন প্রাক্তন ক্যাডেট (ব্যাচ ১৯৭৭) হিসেবে ইয়াওয়ার সায়ীদ ছিলেন তার পুরো ব্যাচ এবং সাধারণ ক্যাডেটদের অন্যতম প্রিয় মুখ। ক্যাডেটদের যে কোনো পুনর্মিলনী, আড্ডা বা সংকটে তিনি সবসময় সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতেন।
ইয়াওয়ার সায়ীদ রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের জুনিয়র ক্যাডেটদের কাছে একজন আইকন ছিলেন। তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি যে কোনো অনুষ্ঠানকে মুখরিত করে রাখত। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ ও ওলড রাজশাহী ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশনের (অরকা) বিষয় তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।
তার মৃত্যুর পর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে পড়ে। এই কলেজের একজন প্রাক্তন ক্যাডেট লে. কর্ণেল মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সজল (অব.) ফেসবুকে লিখলেন, ‘হঠাৎ করেই যেন সবকিছু থমকে গেল। মৃত্যুর এই অমোঘ নিয়ম আমাদের বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। টিউলিপ ভাই কেবল একজন ক্যাডেট বা বন্ধু ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের অনুপ্রেরণার এক অংশ। আমাদের রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের অসংখ্য স্মৃতি, আমাদের অটুট বন্ধন-সবকিছুতে আজ কেবলই তার অনুপস্থিতির হাহাকার...।’
“‘কথোপকথন একাত্তর’-এর অসমাপ্ত পর্বটি এখন আমাদের কাছে তার অসম্পূর্ণ সম্পর্কের এক বেদনাদায়ক স্মারক হয়ে থাকবে। টিউলিপ ভাই আপনার হাসি, আপনার কণ্ঠস্বর এবং আপনার প্রতিটি কথা সবই আমরা ভীষণ মিস করব।” এই ফেসবুক স্ট্যাটাসে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের অনেক প্রাক্তন ক্যাডেটদের মনের কথাই যেন ফুটে উঠলো...।
একজন টিউলিপ
দেশের আর্থিক খাতে যখন সুশাসন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বাজার সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে, ঠিক এমন সময়ে ইয়াওয়ার সায়ীদ ভাইয়ের প্রয়াণ অনেকের কাছেই অপূরনীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার কর্ম জীবনের অবদান, পেশাদার সততা এবং পুঁজিবাজারে উন্নয়নে ভুমিকা দীর্ঘদিন স্মরনীয় হয়ে থাকবে।
আমরা অদ্ভুত এক সমাজ, দেশে বাস করছি। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা, ব্যক্তিগত ধান্ধা, দূর্নীতি, হিংসা ও সীমাহীন লোভ আমাদের সমাজকে চরমভাবে কলুষিত করেছে। সমাজ বিভক্ত হয়েছে। এমন পরিবেশে, ইয়াওয়ার সায়ীদের মতো পরোপকারী বন্ধুবৎসল, বিশাল হৃদয় ও মানবিক গুনাবলীর অধিকারী মানুষ-এত হাতাশার মধ্যেও আশা জাগায়। ইয়াওয়ার সায়ীদের মতোই মানুষ প্রয়োজন-যারা সমাজের মানুষকে ধরে রাখবে, একত্রিত করবে, অনুপ্রাণিত করবে।
টিউলিপ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এবং আকর্ষনীয় ফুল। পুঁজিবাজার এবং ক্যাডেট কলেজ কমিউনিটিতে তার ব্যক্তিত্ব ছিল টিউলিপ ফুলের মতো। তবে টিউলিপ ফুলের আয়ু বেশ কম হয়। কিন্তু আমাদের কাছে তার লিগেসি ও স্মৃতি রয়ে যাবে দীঘদিন।
ওপারে ভালো থাকুন, শান্তিতে থাকুন টিউলিপ ভাই। আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি মহান আল্লাহ’র দরবারে। পরম করুণাময় আল্লাহ ইয়াওয়ার সায়ীদ টিউলিপ ভাইকে বেহেস্ত নসিব করুন।





