দ্য গার্ডিয়ানের কলাম/জলবায়ু সংকট নিয়ে আনমনা হওয়ার চরম মাশুল দিল নেপাল

এক দশকের বেশি সময় ধরে আমি আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি নিয়ে কাজ করছি। একজন নেপালি নাগরিক হিসেবে সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী ঢলের ছবিগুলোর দিকে তাকানো আমার জন্য খুবই কঠিন। লেন্দে খোলা, ভটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী বেয়ে নেমে আসা সেই ধ্বংসলীলার ছবি দেখে ক্ষোভে ফেটে না পড়ে উপায় থাকে না।
আমার এই ক্ষোভ কেবল ধ্বংসযজ্ঞের কারণে নয়। বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আমাদের সতর্ক করে আসছিলেন। তারা বলেছিলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এমন দুর্যোগ আরও ঘন ঘন আঘাত হানবে। এগুলো আরও তীব্র ও অননুমেয় হবে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বনেতাহীন নিষ্ক্রিয়তার মাশুল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই বিপর্যয় তারই চাক্ষুষ প্রমাণ।
গত ২৬ আগস্ট বরফ, পানি, পাথর আর কাদার এক বিশাল স্তূপ জনবসতির ওপর ধেয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তছনছ হয়ে যায় নেপাল ও তিব্বতের ঘরবাড়ি, বাজার, সেতু, রাস্তা এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো। প্রাণ হারান শত শত মানুষ, নিখোঁজ হন আরও অনেকে। এই ধ্বংসযজ্ঞ এসেছে অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে। নদীপারের মানুষ কিংবা পাহাড়ে ট্র্যাকিং করতে যাওয়া পর্যটকেরা জীবন বাঁচানোর কোনো সুযোগই পাননি। পাহাড়ের চূড়ায় যখন বিপর্যয় শুরু হয়, তা নিচের উপত্যকায় পৌঁছাতে বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি।
স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠছে, আসলে কী ঘটেছিল? মানুষকে কি আগে থেকে সতর্ক করা যেত না? অবশ্যই নেপালের আরও শক্তিশালী আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ও হিমবাহ পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে আন্তসীমান্ত যোগাযোগ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার।
তবে নেপালের এই বন্যা আরও বড় একটি মৌলিক সংকটকে সামনে এনেছে। সমস্যাটি কেবল আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার অভাব নয়। আসল সংকট হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন এমন সব চরম দুর্যোগ তৈরি হচ্ছে, যা শনাক্ত করার মতো সক্ষমতা আমাদের সনাতন সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় নেই।
ভটেকোশি উপত্যকার সতর্কবার্তা ব্যবস্থার কথাই ধরা যাক। সেখানে পানি বাড়ার খবর জানান দেওয়ার আগেই ধেয়ে আসা কর্দমাক্ত স্রোত ও পাথর নদীর জলমাপক স্টেশনগুলো ধ্বংস করে দেয়। এই সতর্কবার্তা ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছিল মূলত পানির স্তর ধীরে ধীরে বাড়লে তা শনাক্ত করার জন্য। কিন্তু এবার বন্যা এসেছে পাথর, কাদা ও পানির এক দানবীয় ধাক্কা হয়ে। ফলে যে যন্ত্রটি দিয়ে বন্যা শনাক্ত করার কথা ছিল, দুর্যোগ প্রথমে সেটিকেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি বিশাল হিমবাহ ধসে বরফ ও পাথরের হিমপ্রপাত তৈরি হয়। এতে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেই জমাট বাধা পানি ভেঙে তীব্র বেগে নিচের দিকে নেমে আসে। বিজ্ঞানীরা এখনো এর মূল কারণ খতিয়ে দেখছেন। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করে, উষ্ণ হয়ে ওঠা পাহাড়ি অঞ্চলে কতটা দ্রুত বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কর্তৃপক্ষ যখন বন্যার খবর পেয়ে নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে সতর্কবার্তা পাঠায়, ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে গেছে। নদীর সবচেয়ে কাছে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার কোনো সময় ছিল না। সতর্কবার্তা দেওয়ার যন্ত্রগুলো কেবল বার্তা পাঠাতে ব্যর্থই হয়নি, বরং পানি আসার আগেই সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই বিষয়টি বোঝা খুবই জরুরি। গতকালের সাধারণ বন্যার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা দিয়ে আগামী দিনের চরম দুর্যোগ মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এর মানে এই নয় যে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা কোনো কাজের নয়। আমাদের কেবল এর সীমাবদ্ধতাটুকু স্বীকার করতে হবে। সতর্কবার্তা তখনই কাজে আসে, যখন মানুষের হাতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে। এই ব্যবস্থা কোনো পাহাড় বা বরফের ধস ঠেকাতে পারে না। এটি আমাদের অবকাঠামো রক্ষা করতে পারে না। কিংবা একবার ধ্বংস হয়ে গেলে কোনো ঘরবাড়ি বা জীবিকা ফিরিয়ে দিতে পারে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা ‘অভিযোজন’ প্রক্রিয়ারও একটা সীমা আছে। বছরের পর বছর ধরে নেপাল ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো নানাভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা অবকাঠামো শক্তিশালী করছে এবং মানুষের জীবিকা রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে যারা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, সেই ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা ছাড়াই নেপালকে এই লড়াই লড়তে হচ্ছে।
নেপালের এখন অভিযোজন কার্যক্রম, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু গবেষণা ও দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। যেহেতু হিমালয়ের এই দুর্যোগগুলো সীমান্ত পেরিয়ে আসে, তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
হিমালয় অঞ্চল এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। হিমবাহগুলো গলে যাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পাহাড়ের বরফ ও মাটি আলগা হয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠবে। তাই বৈশ্বিক উদ্যোগ কেবল ‘অভিযোজন’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
আমাদের প্রথম কাজ হবে সংকট যেন আর ঘনীভূত না হয়, তা নিশ্চিত করা। যে দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে দশকের পর দশক ধরে উন্নত হয়েছে, তাদের সবচেয়ে আগে ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া এখন বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই আলোচনায় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এই কোম্পানিগুলো জ্বালানি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটছে। অন্যদিকে জলবায়ু সংকটের মুখে থাকা নেপালের মতো দেশগুলোকে অতি সামান্য সম্পদ নিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নেপালের জন্যও এখানে একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। যে অর্থনৈতিক মডেল আজ জলবায়ু সংকট তৈরি করেছে, ‘উন্নয়ন’-এর নামে নেপালের তা অন্ধভাবে অনুকরণ করা উচিত নয়। আমাদের এমন এক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রাধান্য দেবে।
আমাদের দ্বিতীয় কাজ হলো, ঐতিহাসিক দূষণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ‘ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ’ আদায় করা। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম। অথচ নেপাল আজ এমন এক সংকটের মাশুল দিচ্ছে, যা তৈরিতে তার কোনো ভূমিকাই ছিল না। এটি অত্যন্ত অন্যায্য।
দুর্যোগের এই ক্ষয়ক্ষতি কোনো খাতা-কলমের হিসাব নয়। এটি ঝরে যাওয়া শত শত মানুষের তাজা প্রাণ। এটি বছরের পর বছর ধরে কষ্ট করে গড়ে তোলা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা কয়েক মিনিটে বিলীন হয়ে গেছে। এটি মানুষের ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবিকা। এখন দেশের যে সরকারি অর্থ স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় করার কথা ছিল, তা খরচ করতে হচ্ছে পুনর্বাসনে।
নেপাল ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো বারবার উন্নত দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছে। যে দুর্যোগে নেপালের কোনো হাত নেই, তার ক্ষতি সামলাতে দেশটিকে কেন ঋণ নিতে হবে? উত্তরের ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের কারণে হওয়া ক্ষতি মেরামতে নেপাল কেন নিজের সীমিত সম্পদ বারবার অপচয় করবে?
তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ তহবিল অবশ্যই প্রচলিত সাহায্য বা ঋণের বাইরে সম্পূর্ণ আলাদা অনুদান হিসেবে দিতে হবে। তবে ক্ষতিপূরণ পেলেই সংকট মিটে যাবে না। বিশ্বজুড়ে যদি এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো চলতেই থাকে, তবে কোনো ক্ষতিপূরণই যথেষ্ট হবে না।
ভটেকোশি নদীর তীরে বসবাসকারী মানুষেরা এই উষ্ণ হিমালয়কে বেছে নেয়নি। তারা এই জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতিও তৈরি করেনি। তবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে তারা নিজেদের আরও সুরক্ষিত করতে পারবে। দুঃখের বিষয় হলো, সব দুর্যোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা মানুষের থাকে না। তাই এই জলবায়ু ক্ষতিপূরণ তহবিল কোনো দয়া বা অনুদান নয়—এটি ভুক্তভোগী মানুষের অধিকার।
লেখক পরিচিতি: নেপালের কাঠমান্ডুভিত্তিক একজন আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি এবং ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ (ন্যায়সংগত রূপান্তর) বিশেষজ্ঞ। তিনি বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।



