পহেলা সেপ্টেম্বর, আর ঋতুপর্ণ

না, তারিখটা দেখে চমকাইনি। চমকে গেছি ৩১ আগস্ট পেরিয়ে যাওয়ার পরও আমার ভেতরে একজনকে নিয়ে কিছু একটা লেখার প্রত্যাশা যে এখনও বেঁচে আছে, সেটা টের পেয়ে।
৩১ আগস্ট চলে গেছে। চলে গেছে ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্মদিন। তিনি তো নেই। তাহলে এই বিষাদময় জন্মদিনের শুভেচ্ছা কেমন করে জানাতে হয়?
জন্মদিন তো মানে কেক কাটা, ফুলের তোড়া, উপহারের প্যাকেট, পরিচিত মানুষের ভিড় আর হাসিমুখে একটি দিন পার করা। জন্মদিন মানে জীবনের উদ্যাপন। অথচ কিছু মানুষের জন্মদিন আসে এমন এক অদ্ভুত শূন্যতা নিয়ে, যেখানে উদ্যাপনের চেয়ে স্মৃতিই বড় হয়ে ওঠে।
সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার জীবিত জন্মদিনটিও যেন হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাদের চলে যাওয়া তাদের জন্মদিনকে আরও বেশি করে আমাদের ক্যালেন্ডারে স্থায়ী করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যজিৎ—তাদের জন্মদিন আমরা মনে রাখি, উদ্যাপন করি। কারণ তাদের জীবন কেবল তাদের নিজেদের ছিল না; তাদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তারা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে গেছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষও আমার কাছে তেমনই একজন। তিনি আমার মনোজগতের অনেক পুরোনো দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এমন কিছু অনুভূতির সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন, যেগুলোর ভাষা হয়তো আমার নিজের জানা ছিল না।
ভীষণ মন খারাপের দিনে আমি আজও একটি মাত্র সিনেমাকে সঙ্গী করে নিই—‘তিতলি’।
‘মেঘপিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা’—এই একটি বাক্যই যেন আমার ভেতরে জমে থাকা অসংখ্য দুঃখ, অভিমান আর না-বলা কষ্টকে একটানা ঝরতে দেয়। সিনেমাটি বারবার দেখি। আর প্রতিবারই মন হুহু করে ওঠে।
মিঠুন চক্রবর্তীকে কোনোদিন কোনো সিনেমায় খুব একটা ভালো লাগেনি আমার। অথচ ‘তিতলি’ দেখলে মনে হয়—এই চরিত্রটি মিঠুন ছাড়া আর কাউকে দিয়ে হতো না।
এই ভালো লাগাটা একসময় এতটাই গভীরে গিয়েছিল যে, আর কিছু না ভেবেই আমার প্রিয়তম কন্যার নাম রেখে দিলাম ‘তিতলি’। অথচ কত বছর ধরে ভেবেছিলাম, কন্যা হলে তার নাম রাখব ‘ইন্দিরা’!
একজন চলচ্চিত্রকারের সৃষ্টি যে কারও জীবনের এতটা ব্যক্তিগত অংশ হয়ে উঠতে পারে, ঋতুপর্ণকে ভালো না বাসলে হয়তো সেটা বুঝতাম না।
ফিরে যাই ঋতুতে।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে আমার পরিচয় ‘দহন’ দিয়ে। তখন অবশ্য জানতাম না, এই সিনেমার পরিচালক কে। পরিচালকের নাম দিয়ে আমি কী করব! আমার কাজ সিনেমা দেখা।
সুচিত্রা ভট্টাচার্যের বইটি আগেই পড়া ছিল। সিনেমা দেখতে বসে আমার মন কেমন করতে থাকল। মনে হচ্ছিল—অবিকল আমার কল্পনার মতো নয়, কিন্তু ঠিক এমনই কোনো জায়গায় তো ঘটনাগুলো ঘটেছিল!
সিনেমা শেষ হলো। আবার দেখলাম। একই রকম মন খারাপ হলো। দেখছিলাম আর জ্বলছিলাম। কষ্টে কষ্টে যেন নীল হয়ে যাচ্ছিলাম।
‘দহন’ শুধু একটি সামাজিক অন্যায়ের গল্প ছিল না। এটি ছিল একটি নারীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার পর সমাজ, পরিবার, আইন ও তথাকথিত ভদ্রলোকদের মুখোশের গল্প। ঋতুপর্ণ সেখানে কোনো বড় বড় বক্তব্য দেননি; মানুষের আচরণের ভেতর দিয়েই সমাজের নিষ্ঠুরতাকে দেখিয়েছিলেন। ছবিটি জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিল, আর এই সিনেমার জন্যই ইন্দ্রাণী হালদার ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনয়ের জাতীয় পুরস্কার পান।
তারপর এলো ‘উনিশে এপ্রিল’।
এবার আমার জানতে ইচ্ছে হলো—এই সিনেমার পরিচালক কে? কে বানালো এমন একটি সিনেমা? এই অপর্ণা সেন কে? এত মিল কেন? জানলাম—তার নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ।
১৯৯৪-এর ‘উনিশে এপ্রিল’ ছিল তার চলচ্চিত্র জীবনের মোড় ঘোরানো কাজ। মা ও মেয়ের সম্পর্কের জটিলতা, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি আর ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই সিনেমা শুধু দর্শকের মন জয় করেনি; জাতীয় পুরস্কারে সেরা ফিচার ফিল্মের সম্মানও পেয়েছিল।
তখন বুঝলাম—এই মানুষটি শুধু সিনেমা বানান না। তিনি মানুষের ভেতরের নীরব জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করেন।
‘উৎসব’ দেখেছি বোধহয় এসবেরও আগে। একটি বাড়ির ভেতরে, একটি পুজোর কয়েকটি দিনের মধ্যে, কত মানুষের কত গল্প! পরিবারের এইসব সূক্ষ্ম মান-অভিমান কেন এত জ্বালা ধরায় চোখে? কেন মনে হয়, পুজোটা আমার নিজের বাড়িতেই হচ্ছে? কেন বারবার দেখা সিনেমা বারবারই চোখে জল এনে দেয়?
ঋতুপর্ণ সম্ভবত এখানেই আলাদা।
তিনি বিশাল কোনো ঘটনার চেয়ে মানুষের ছোট ছোট অনুভূতিগুলোকে বড় করে দেখতেন। তার সিনেমায় অনেক সময় যুদ্ধ নেই, বিস্ফোরণ নেই, নাটকীয় চিৎকার নেই—আছে একটি ঘর, কয়েকজন মানুষ, কিছু পুরোনো সম্পর্ক, কিছু না-বলা কথা। আর সেই নীরবতার মধ্যেই তৈরি হয় সবচেয়ে বড় নাটক। তার সিনেমা যেন আসলে মানুষকে দেখার সিনেমা।
এরপর একে একে—আবহমান, বাড়িওয়ালী, রেইনকোট, শুভ মহরত, অসুখ, চোখের বালি, দোসর, নৌকাডুবি, অন্তরমহল, খেলা, চিত্রাঙ্গদা…আরও কত!
‘হীরের আংটি’ দিয়ে চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু। বিজ্ঞাপনের জগতের অভিজ্ঞতা, লেখালেখির দক্ষতা এবং বাংলা মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে নব্বইয়ের দশকের বাংলা সিনেমায় তার আবির্ভাব ছিল একেবারে অন্যরকম। ‘উনিশে এপ্রিল’, ‘দহন’, ‘অসুখ’ ও ‘উৎসব’-এর মতো সিনেমায় তিনি শহুরে মধ্যবিত্তের ঘর, সম্পর্ক ও মানসিক সংকটকে সিনেমার কেন্দ্রে নিয়ে এলেন।
আর রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে তার কাজগুলো—‘চোখের বালি’, ‘নৌকাডুবি’—প্রমাণ করল, সাহিত্যকে পর্দায় অনুবাদ করা আর সাহিত্যকে নতুন করে আবিষ্কার করা এক জিনিস নয়। ঋতুপর্ণ দ্বিতীয় কাজটিই করতেন।
‘চোখের বালি’-তে ঐতিহাসিক সময়ের ভেতর নারীর আকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা, একাকিত্ব ও যৌনতার প্রশ্নকে তিনি এমনভাবে সামনে আনলেন, যা সেই সময়ের মূলধারার দর্শকের জন্যও ছিল সাহসী। ‘অন্তরমহল’-এ দেখালেন জমিদারি সমাজের অন্তঃপুরে নারীর বন্দিত্ব ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার নির্মমতা।
আর জীবনের শেষ পর্বে এসে তার সিনেমা আরও ব্যক্তিগত হয়ে উঠল।
‘আরেকটি প্রেমের গল্প’, ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’, ‘চিত্রাঙ্গদা’—এগুলোতে তিনি যৌনতা, লিঙ্গপরিচয়, ভালোবাসা, শরীর এবং নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নকে আর আড়াল করেননি।
বিশেষ করে ‘চিত্রাঙ্গদা’ যেন তার নিজের জীবন ও শিল্পীসত্তার এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা। ছবিটির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড পান। ছবিতে একজন সমকামী কোরিওগ্রাফারের নিজের লিঙ্গপরিচয় ও ভালোবাসার সঙ্গে সংগ্রামের গল্প বলা হয়েছে।
তখন ঋতুপর্ণ শুধু একজন পরিচালক ছিলেন না। তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটি বক্তব্য।
আমি এসব সিনেমা দেখতাম আর ‘থ্রি, টু, ওয়ান… অ্যাকশন… কাট’-এর মানুষটির অসাধারণ মেধা ও সৃজনশীলতায় মুগ্ধ হতাম।
ঋতুপর্ণের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত ছিল—তিনি মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখতেন।
তার চরিত্রগুলো কেউ পুরোপুরি ভালো নয়, কেউ পুরোপুরি খারাপও নয়। তারা ভালোবাসে, ভুল করে, প্রতারণা করে, ক্ষমা চায়, আবার একই ভুল করে। তারা সংসার করে অথচ একা থাকে। তারা পাশাপাশি বসে থাকে অথচ একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
আর সেই অদৃশ্য দূরত্বটুকুই ঋতুপর্ণ ক্যামেরায় ধরতেন। তার সিনেমার মানুষগুলো তাই আমাদের খুব চেনা। এমনকি অস্বস্তিকরও। কারণ কোথাও না কোথাও তাদের মধ্যে আমরা নিজেদের দেখতে পাই।
৩০ মে ২০১৩।
মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ঋতুপর্ণ ঘোষ চলে গেলেন। তার মৃত্যু ছিল আকস্মিক; এমন একজন নির্মাতা, যার সামনে তখনও আরও কত গল্প, কত চরিত্র, কত সিনেমা অপেক্ষা করছিল।
আমি শুধু ভাবছিলাম—‘চিত্রাঙ্গদা’র ঋতুপর্ণকে। ভাবছিলাম, তার সিনেমাগুলো আসলে এত সত্যি ছিল কেন!
সিনেমা মনে হতো না কোনোটা। মনে হতো, কারও বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়েছি। কারও সংসারে বসে আছি। কারও মায়ের সঙ্গে মেয়ের ঝগড়া শুনছি। কারও অসমাপ্ত প্রেমের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। কারও একাকিত্ব নিজের বুকের ভেতর নিয়ে বাড়ি ফিরছি।
ঋতুপর্ণ চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি যে কথাটা মনে হয়েছিল—এত তাড়াতাড়ি কেন? আরও কত কাজ বাকি ছিল! আরও কত গল্প তিনি বলতে পারতেন! আরও কত মানুষের না-বলা কথা তিনি পর্দায় তুলে আনতে পারতেন!
কিন্তু শিল্পীর জীবন আর শিল্পের জীবন এক নয়। মানুষ চলে যায়। কাজ থেকে যায়। আর কখনও কখনও কাজের ভেতর দিয়ে মানুষটি আরও বেশি করে বেঁচে থাকে। ঋতুপর্ণ ঘোষ তেমনই একজন।
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তার জায়গাটা শুধু ‘ভালো পরিচালক’ হিসেবে নয়। তিনি এমন এক সময়ে এসেছিলেন, যখন বাংলা সিনেমা একদিকে সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিকের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে বাণিজ্যিক সংকট—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তিনি সেই সময়ের শহুরে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দর্শককে আবার বাংলা সিনেমার হলে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছিলেন। শিল্পের সংবেদনশীলতা আর দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ—দুটিকে একসঙ্গে রাখার এক অনন্য ক্ষমতা ছিল তার।
আর তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার? সম্ভবত তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও সিনেমার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সম্পর্কের ভাঙনও গল্প। একটি মায়ের অভিমানও গল্প। একজন নারীর অপমানও গল্প। একজন মানুষের নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামও গল্প। এমনকি একা একটি ঘরে বসে থাকা মানুষটির নীরবতাও গল্প।
ওপারের জীবনটা ঠিক কেমন, জানি না।
কিন্তু আমার সবসময় মনে হয়—আমার সমস্ত ভালো লাগার মানুষগুলো ওপারের জীবনে তাদের এপারের সব না-মেটা ইচ্ছে, সব অসমাপ্ত আনন্দ, সব অপূর্ণ গল্প নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়।
হয়তো ঋতুপর্ণও সেখানে নতুন কোনো সিনেমার গল্প লিখছেন। হয়তো সেখানে কোনো চরিত্রের শেষ দৃশ্যটা তিনি এখনও ঠিক করে উঠতে পারেননি।
হয়তো সেখানে আবার কেউ বলছে—‘থ্রি, টু, ওয়ান… অ্যাকশন!’ আর ঋতুপর্ণ হাসছেন। ক্যামেরা চলছে। জীবন চলছে।
শুধু আমাদের এপারে তার জন্য একটু বেশি মন খারাপ।
তাই পহেলা সেপ্টেম্বরেও, ৩১শে আগস্ট পেরিয়ে যাওয়ার পরও, আমার সেই প্রত্যাশাটা মরে যায়নি—তাকে নিয়ে কিছু একটা লিখব।
সুপ্রিয় ঋতুপর্ণ, আপনি নেই—এটা এখনও বিশ্বাস হয় না। আপনার সিনেমাগুলো আছে। আপনার চরিত্রগুলো আছে। আপনার সংলাপ আছে। আপনার দেখিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আছে। আর আমার ঘরে আছে—আপনার ‘তিতলি’র কাছে ঋণী হয়ে রাখা আরেকটি তিতলি। আমার প্রিয়তম কন্যা।
তাই আপনাকে মনে রাখা আমার কাছে শুধু একজন প্রিয় চলচ্চিত্রকারকে স্মরণ করা নয়। এটা আমার নিজের জীবনের একটি অংশকে স্মরণ করা। ওপারের আমার সেই কাল্পনিক জীবনে ভালো থাকুন, ঋতুপর্ণ।
সুপ্রিয় ঋতুপর্ণ—জন্মদিনের শুভেচ্ছা আপনাকে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট।




