Advertisement

আলজাজিরার কলাম/যুদ্ধের পরে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে

সাহার মারানলু
যুদ্ধের পরে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, অব্যাহত সামরিক চাপ তেহরানের অভ্যন্তরে ফাটল সৃষ্টি করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানি সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই যোগাযোগ প্রমান করে চুক্তির পক্ষে থাকা এবং কট্টরপন্থী কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে।

তেহরানের অভ্যন্তরীণ এই মতভেদ অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে ওয়াশিংটন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে যেভাবে দেখছে, বাস্তবতা তার চেয়ে ভিন্ন। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ এই মতভেদগুলোকে আড়ালে রেখেছে। তবে যুদ্ধ থেমে গেলে বা তীব্রতা কমলে ইরানের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের নীতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ লড়াই তীব্র রূপ নেবে।

নিরাপত্তা বাহিনী ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তি দেবে যে, ইরান টিকে রয়েছে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে, তাই এখন অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত সামরিক শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে, নির্বাচিত সরকার বাণিজ্য, তেল রাজস্ব, পুনর্গঠন এবং কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে চাইবে।

বিপরীতমুখী নীতি ও চিন্তাধারাকে একটি সর্বজনগ্রাহ্য যুদ্ধোত্তর জাতীয় কৌশলে রূপান্তরিত করাই হবে মোজতবা খামেনির প্রথম বড় পরীক্ষা।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিভাজন

ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত ও অনির্বাচিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিভক্ত, যদিও নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতার হাতে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ভূমিকা ছিল বিতর্ক ও মতভেদের অবসান ঘটানো। তার ক্ষমতার মধ্যে ছিল জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদন, জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিয়োগ এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যবর্তী বিরোধ মীমাংসা করা।

তার মৃত্যুর ফলে নীতি নির্ধারণের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বময় ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় কর্তৃত্বের এই আনুষ্ঠানিকতা বজায় থাকলেও, আলী খামেনি কয়েক দশক ধরে যে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক এবং প্রতীকী গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, তা রাতারাতি মোজতবার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।

ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও গভীর হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়, যার মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং তাদের স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’, নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ) এবং তাদের পদাতিক, বিমান, নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী, এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা। আইআরজিসি রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলেও ইরানের নিরাপত্তা সক্ষমতা মূলত একাধিক প্রতিষ্ঠান এবং কমান্ড চেইনের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।

মোজতবা তার পদ গ্রহণ করেছেন আইআরজিসির শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বহুদিনের সম্পর্কের ওপর ভর করে, যা তাকে একটি বড় শক্তির ভিত্তি দেয়। তবে এই সম্পর্কগুলো সরাসরি গোটা সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে না।

অন্যদিকে রয়েছে নির্বাচিত সরকার। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অর্থনীতি, পুনর্গঠন এবং কূটনীতি পরিচালনাকারী মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্বে রয়েছেন, কিন্তু সশস্ত্র বাহিনী বা যুদ্ধ ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে সুপ্রিম লিডার এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বেঁধে দেওয়া নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে থেকে দেশকে সচল রাখা এবং বিদেশে আলোচনা চালানোর পুরো দায়ভার বহন করতে হয় তার সরকারকেই।

পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্ষেত্রে একটি ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। তার বেসামরিক ও সামরিক উভয় বলয়েই শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে। এর ফলে সংবেদনশীল নীতি এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় ঐক্যমতে পৌঁছাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মধ্যস্থতা করা এবং সামরিক রেড লাইনগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য সরকারি নীতিতে পরিণত করার ক্ষমতাই তার প্রধান শক্তি।

এই বিভাজন কেবল সরকার ও আইআরজিসির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত এবং প্রত্যেকটি পক্ষের আলাদা স্বার্থ ও লক্ষ্য রয়েছে।

মোজতবা খোমেনির সুবিধা হলো তিনি অনভিজ্ঞ বা বহিরাগত হিসেবে যাত্রা শুরু করছেন না, কিন্তু তার সম্পর্কের বলয়ই তার সীমাবদ্ধতার কারণ হতে পারে। এছাড়া যেহেতু তার ক্ষমতা নির্দিষ্ট একটি অংশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, তাই তার জন্য প্রেসিডেন্সি, পার্লামেন্ট, সেনাবাহিনী এবং আইআরজিসি ভিন্ন ভিন্ন দিকে অবস্থান নিলে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রতিদ্বন্দ্বীতামুলক দৃষ্টিভঙ্গি

সাময়িকভাবে যুদ্ধের এই তীব্রতা ইরানের অভ্যন্তরে একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা তৈরি করতে পেরেছে, ফলে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

প্রতিটি শিবিরই এই ধারণায় একমত যে এটি ‘ট্রাম্পের যুদ্ধ’—যে নীতি পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেছিল, চাপ বৃদ্ধি করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের ওপর সংঘাতের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল, এটি তারই চূড়ান্ত রূপ। সেতু, রাস্তাঘাট এবং জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার ঘটনাকে তারা জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।

নিরাপত্তা বাহিনী তাদের প্রতিরোধ নীতিকে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরছে, আর সরকার দাবি করছে যে, পুনর্গঠনের সুরক্ষায় আলোচনা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রচেষ্টা সমান প্রয়োজনীয়। এই বার্তার ফলে মতভেদ কমেছে, তবে অভ্যন্তরীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হয়নি।

তবে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জাতীয় ঐক্য যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিপুল মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষত মুছে দেয় না। এছাড়া যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করা হবে বা আলোচনা কোন পথে এগোবে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছেই।

যুদ্ধ শেষ হলে বা স্থবির হয়ে পড়লে তেহরানের এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন মূল আলোচনায় উঠে আসবে।

যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের লড়াইয়ে রূপ নেবে। নীতিগতভাবে, যুদ্ধবিরতি এবং শান্তির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা নির্বাচিত সরকারেরই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মূল দায়িত্বে থাকা উচিত। তা ছাড়া, একটি নির্বাচিত সংস্থা হিসেবে সরকারের জনগণের কাছে জবাবদিহিতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ফলাফল পুরোপুরি নির্ধারণের মতো একক ক্ষমতা পেজেশকিয়ান সরকারের নেই।

আইআরজিসি ইতোমধ্যেই দেশের জ্বালানি, নির্মাণ এবং কৌশলগত অবকাঠামো খাতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তাদের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পেজেশকিয়ান এবং তার অর্থনীতিবিদদের দল হয়তো যুক্তি দেবে, পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতি। বাণিজ্য পুনরায় চালু করা, তেলের রাজস্ব ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের ওপর জীবনযাত্রার চাপ কমানোকে অগ্রাধিকার দিতে পারে দেশটির নির্বাচিত সরকার।

অন্যদিকে, নিরাপত্তা বাহিনী চাপ দেবে এমন এক পুনর্গঠন ব্যবস্থার জন্য যাতে নতুন যেকোনো আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়া যায়। তাদের মূল যুক্তি হবে সামরিক প্রস্তুতি। বিস্তৃত আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের কারণে ইরান এই যুদ্ধে টিকে থাকতে পেরেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই পুনর্গঠনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, বিগত মডেল পুনর্বিবেচনা করা নয়।

আইআরজিসির কোনো পুনর্গঠন বাস্তবায়িত হলে তা কেবল চুক্তির বন্টনই নয়, যুদ্ধোত্তর রাষ্ট্রের গতিপথও নির্ধারণ করে দেবে। এর ফলে কোন খাতটি আগে পুনর্গঠিত হবে, সীমিত সম্পদ কীভাবে বণ্টন করা হবে, কোন বিদেশি অংশীদারদের আনা হবে এবং অর্থনৈতিক উন্মুক্ততাকে কৌশলগত সুযোগ নাকি নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হবে তার মীমাংসা হবে।

আইআরজিসি এবং তাদের অনুগত নেটওয়ার্ক যদি এই সিদ্ধান্তগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে, তবে নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধকালে গড়ে ওঠা কাঠামোগুলোই আরও শক্তিশালী হবে, যা জ্বালানি, অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির শর্তাবলীতে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তৃত্ব বাড়াবে।

মোজতবা খোমেনি যদি একটি সমন্বিত রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন, তবে সামরিক বাহিনী হয়তো সহনশীলতা ও শত্রুকে দেওয়া আঘাত দিয়েই সাফল্য পরিমাপ করতে থাকবে, আর মুদ্রাস্ফীতি, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক আলোচনা এবং জীবনযাত্রার মান পতনের দায়ভার বহন করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে।

এর ফলে হয়তো সরাসরি কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটবে না। প্রেসিডেন্সি, পার্লামেন্ট এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল স্বাভাবিক নিয়মেই কাজ করবে, তবে তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিধি ক্রমশ সংকুচিত হতে পারে। কারণ কূটনীতি, বিনিয়োগ এবং পুনর্গঠনের শর্তগুলোকে দিনশেষে নিরাপত্তা অগ্রাধিকার দিয়েই পরিচালিত হতে হবে। মোজতবা খোমেনি সাংবিধানিকভাবে সুপ্রিম লিডার হিসেবেই বহাল থাকবেন, তবে নিরাপত্তা বলয়ের ওপর তার বর্তমান নির্ভরশীলতা তার শাসনকালের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যুদ্ধের ফলে সর্বোচ্চ নেতা নিজের কর্তৃত্ব জাহির করার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু যুদ্ধ থামার পর তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দেশের অর্থনৈতিক পুনঃগঠন নাকি সামরিক অবকাঠামো, কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলো যদি মোজতবার আগেই এসব প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে ফেলে, তবে এই উত্তরাধিকারের পরিবর্তন শুধু নামমাত্র হবে। ইরানের আসল ক্ষমতা হস্তান্তর হবে না।


আলজাজিরা থেকে অনূদিত। নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।

লেখক: সাহার মারানলু বর্তমানে রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। তিনি একজন ইরানি আইনবিদ, যার গবেষণার ক্ষেত্র মূলত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার, পুলিশিং এবং আইন সংস্কার।