logo
Advertisement

আলজাজিরার কলাম/ইসরায়েলের ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ প্রযুক্তিতে কেন ভরসা রাখছে গ্রিস?

ইসরায়েলের ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ প্রযুক্তিতে কেন ভরসা রাখছে গ্রিস?
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আমির বারাম ও তার গ্রিক সমকক্ষ ইয়োয়ানিস বুরাস করমর্দন করছেন। ছবি: রয়টার্স

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের জেরে এই অঞ্চলের মিত্রতার সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তি বড় এক পদক্ষেপ।

Advertisement

গ্রিস ও ইসরায়েল গত সপ্তাহে ৩৫০ কোটি (৩.৫ বিলিয়ন) ডলারের একটি বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো গ্রিসের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড সুরক্ষায় একটি সমন্বিত এবং বহুস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’।

এই প্রতিরক্ষা প্যাকেজের আওতায় থাকবে ডেভিডস স্লিং ও স্পাইডার ইন্টারসেপ্টর, বারাক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বহুমুখী রাডার ব্যবস্থা। এছাড়া গ্রিসের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ড্রোনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ‘ড্রোন ডোম’ সিস্টেম সরবরাহের জন্য পৃথক একটি চুক্তিও করা হয়েছে।

এটি দুই দেশের মধ্যে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি। একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি চুক্তি।

এই চুক্তির সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক হলো, এমন এক সময়ে এটি সই হলো যখন বৈশ্বিক পর্যায়ে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তলানিতে ঠেকেছে। গ্রিসের নাগরিকেরাও এর ব্যতিক্রম নন। দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষই ইসরায়েলকে নেতিবাচক চোখে দেখেন। এমন রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও অ্যাথেন্স কেন প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সাথে প্রকাশ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে গেল?

এর প্রথম কারণ হলো ইরানের সাথে ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের প্রভাব। গত মার্চের শুরুর দিকে গ্রিসের প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাইপ্রাসে একটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এই ঘটনা গ্রিসের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরায়েল যখন ইরানের প্রায় ৩০০টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছিল, তখনই গ্রিসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিকোস ডেনডিয়াস নিজস্ব অ্যান্টি-ড্রোন ‘ডোম’ বা গম্বুজ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ড্রোনের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামরিক সমাধানের খোঁজ করছে। ফলে এই চুক্তিকে গ্রিসের এক ধরনের বাস্তবসম্মত নিরাপত্তা প্রয়োজনের অংশ বলা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে ইউক্রেনের কাছ থেকে অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি সংগ্রহ করছে। কারণ ইউক্রেন তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারছে।

রাজনৈতিকভাবে ইমেজ সংকটে থাকলেও সামরিক প্রযুক্তিতে ইসরায়েল বেশ এগিয়ে রয়েছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ‘অস্ত্র কূটনীতি’ বা আর্মস ডিপ্লোম্যাসি অনুশীলন করে আসছে। তারা তাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা খাতকে ব্যবহার করে সম্ভাব্য ক্রেতা দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর করছে।

গ্রিসের সাথে এই চুক্তির পেছনে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের আরেকটি কূটকৌশল কাজ করছে, যাকে ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’ বা প্রান্তিক তত্ত্ব বলা হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, নিকটবর্তী আরব দেশগুলোর শত্রুতা মোকাবিলা করতে ইসরায়েল লেভান্ট অঞ্চলের বাইরে থাকা অ-আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। মূলত যৌথ নিরাপত্তা হুমকি অনেক সময় দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব তৈরি করে। ইসরায়েল ও গ্রিসের ক্ষেত্রে এই সাধারণ নিরাপত্তা হুমকির নাম হলো তুরস্ক।

কৌতুকের বিষয় হলো, একসময় মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রবেশদ্বার এবং অ-আরব দেশ তুরস্কই ছিল ইসরায়েলের এই প্রান্তিক তত্ত্বের প্রধান অংশীদার। ১৯৪৯ সালে তুরস্কই প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী বছরগুলোতে আঙ্কারা এবং তেল আবিবের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ও গোপন নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

ইসরায়েলের এই কৌশল বেশ সফল হয়েছিল। এর ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও উন্মুক্ত ও বিস্তৃত হয়। ২০০২ সালে তুরস্কে ইসলামপন্থী দল একে পার্টি ক্ষমতায় আসার পরও এই ধারা অব্যাহত ছিল।

কিন্তু ২০০৮ সালের শেষের দিকে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় আগ্রাসন চালালে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরে। ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলি নীতির ঘোর বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে ধীরে ধীরে তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভেঙে যায়।

২০২৪ সালে তুরস্ক ইসরায়েলের ওপর সম্পূর্ণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ধসে পড়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কোনো সরাসরি বিমান যোগাযোগও নেই। গত জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণেই তুরস্ক ইরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়নি। এই দাবি অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি প্রমাণ করে যে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যকার দূরত্ব কতটা বেড়েছে। তারা এখন একে অপরকে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী ও হুমকি হিসেবে দেখছে।

এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তুরস্কের সরে যাওয়ার পর তৈরি হওয়া শূন্যতা গ্রিস অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পূরণ করেছে। অতীতে তুরস্কের সাথে অংশীদারত্বের কারণে গ্রিসের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি ইসরায়েল। তবে এখন আর সেই বাধা নেই। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ইসরায়েল, সাইপ্রাস ও গ্রিস একটি ‘যৌথ কর্মপরিকল্পনা’ স্বাক্ষর করে, যা সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে দুই পক্ষকে বাধ্য করে।

জ্বালানি খাতও এই কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বিশাল গ্যাস ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়ার পর পাইপলাইন নির্মাণ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইসরায়েল, গ্রিস এবং সাইপ্রাস পারস্পরিক সহযোগিতা শুরু করে।

নিরাপত্তা সহযোগিতার হাত ধরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সামাজিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৮ সালে যখন তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক চূড়ায় ছিল, তখন সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৫৮ হাজার ইসরায়েলি পর্যটক তুরস্ক সফর করেছিলেন। অথচ ২০২৫ সালে প্রায় ৭ লাখ ৪৪ হাজার ইসরায়েলি পর্যটক গ্রিস ভ্রমণ করেছেন।

আঞ্চলিক বিভাজন এবং বিভিন্ন জোটের মধ্যকার রেষারেষিও গ্রিস-ইসরায়েল সম্পর্ককে ত্বরান্বিত করছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি ‘ষড়ভুজ জোট’-এর প্রস্তাব দেন। এই জোটে ইসরায়েল, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ভারতের পাশাপাশি কয়েকটি আরব ও আফ্রিকান দেশকে রাখার কথা বলা হয়েছে।

এর ঠিক ওপরে অর্থাৎ প্রায় ছয় মাস পর সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান যৌথভাবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটটি মূলত একসময়ের বহুল আলোচিত ‘ইসলামিক কোয়ালিশন’-এরই একটি নতুন রূপ।

এই জোটগুলোর সমীকরণ প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। তবে এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে বিশ্বস্ততার সংকট দিন দিন বাড়ছে। এটি এখন আর কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরস্পরের প্রতিযোগী এই দেশগুলো সবাই কিন্তু আবার যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ফলে এই জোট গঠন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুতরাং, ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ চুক্তিটি মূলত ইসরায়েলের বহু পুরোনো কূটকৌশলের একটি নতুন রূপ মাত্র, যা ইরানের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের কারণে আরও গতি পেয়েছে। গ্রিসের জনগণের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে হয়তো তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কিছুটা জটিল হতে পারে। তবে ইতিহাস বলে, তুরস্কের জনগণের তীব্র ইসরায়েল-বিরোধী মনোভাব থাকা সত্ত্বেও কয়েক দশক ধরে তাদের দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সম্পর্ক কিন্তু বেশ শক্তিশালী ছিল।

সহজ কথায়, পূর্ব ভূমধ্যসাগরসহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানে ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে জনরোষ থাকলেও উচ্চপর্যায়ে তাদের দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা সমান্তরালভাবে চলতে থাকবে। পরিহাসের বিষয় হলো, যে সংঘাতগুলো ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক মর্যাদার ক্ষতি করেছে, সেগুলোই আবার তার সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।


লেখক পরিচিতি: রব গিস্ট পিনফোল্ড কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ের প্রভাষক। এছাড়া তিনি জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন অধ্যাপক এবং গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের জ্যেষ্ঠ নন-রেসিডেন্ট ফেলো হিসেবে কর্মরত।