Advertisement

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন/হিজবুল্লাহর পুনরুত্থান: ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ভেতরের গল্প পর্ব ২

ড্যানিয়েল হিলটনঅ্যাডাম শামসেদ্দিন
হিজবুল্লাহর পুনরুত্থান: ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ভেতরের গল্প পর্ব ২
ছবি: সংগৃহীত

এই বছরের মার্চে মার্কিন-ইসরায়েলি জোট যখন ইরানের ওপর হামলা চালায় এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে, তখন হিজবুল্লাহ এই নতুন মডেলের পরীক্ষা হয়। শিয়া মতাদর্শী হিজবুল্লাহর কাছে খামেনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক নেতা। তার মৃত্যুর জবাবে সীমান্তের ওপারে ছয়টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়। তবে হিজবুল্লাহর দাবি, ইরান যুদ্ধের আড়ালে ইসরায়েল লেবাননে আরেকটি বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তা বুঝতে পেরে হিজবুল্লাহ আগাম আক্রমণ শুরু করে। পরে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরেও হিজবুল্লাহর এই অনুমানের সত্যতা মেলে।

Advertisement

নাসরুল্লাহর উত্তরসূরি ও বর্তমান প্রধান নাইম কাসেমের একক সিদ্ধান্তেই মার্চে ওই রকেট হামলা চালানো হয়। তবে ইরান এই সিদ্ধান্তে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল। আরেকটি সূত্র জানায়, ইরানের পরামর্শ ছিল খামেনির মৃত্যুর অনেক আগেই যেন ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব দেওয়া হয়। তবে হিজবুল্লাহ তাদের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করছিল।

ভিডিও গেমাররাই এখন ড্রোন চালক

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখন গেমিং ক্যাফেগুলো বেশ জনপ্রিয়। জেরুজালেম, তেহরান কিংবা কায়রোর অন্ধকার রুমে তরুণদের ফিফা বা অ্যাকশন ঘরানার ফার্স্ট পারসন ভিউ (এফপিভি) গেম খেলতে দেখা যায়। দাহিহার প্রবীণ হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা তরুণ প্রজন্মের এই গেম খেলাকে সময়ের অপচয় বলে মনে করতেন। মাঠের পরীক্ষিত যোদ্ধাদের ধারণা ছিল, প্রযুক্তির মোহে নতুন প্রজন্ম অলস ও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেননি যে এই গেমিংয়ে আসক্ত ছেলেরাই পরবর্তী যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীকে টেক্কা দেবে।

২০২৬ সালের মার্চে আবারও যখন যুদ্ধ শুরু হয়, ইসরায়েলি সৈন্যরা লিতানি নদীর দক্ষিণে লেবাননের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তারা বসতবাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটিসহ প্রায় ৩০০ জায়গায় অবস্থান নেয়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী হিজবুল্লাহ সহজেই বিন্ত জবিল-এর মতো এলাকাগুলো ইসরায়েলকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী কোথাও শান্তিতে থাকতে পারেনি। হিজবুল্লাহ চোরাগোপ্তা হামলায় গত ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে অন্তত ২০ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলিরা যেন স্থায়ী ঘাঁটি গাড়তে না পারে, সেটাই ছিল হিজবুল্লাহর মূল লক্ষ্য। আর এই মিশনেই তারা ড্রোনের ব্যবহার শুরু করে।

ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতি যুদ্ধেই হিজবুল্লাহ নতুন কোনো চমকপ্রদ অস্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার জানান দেয়। ২০০৬ সালে সেটি ছিল ‘কর্নেট’ ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এবার তারা ব্যবহার করেছে এফপিভি ড্রোন, যা ফাইবার অপটিক কেবলের সাহায্যে পরিচালিত হয়। ফলে জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্নিত করার কোনো সুযোগ থাকে না।

নেতানিয়াহু এই ড্রোনগুলোকে অন্যতম প্রধান হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অত্যন্ত সস্তা অথচ প্রাণঘাতী এই ড্রোনগুলো নিখুঁতভাবে নিশানা ভেদ করে এবং একই সঙ্গে হামলার ভিডিও রেকর্ড করে পাঠায়। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো লেবাননেও এই ড্রোন ওড়ানোর কাজে গেমারদের দক্ষতা কাজে লাগানো হয়েছে। হিজবুল্লাহ বেশির ভাগ ড্রোন পাইলটই মূলত পেশাদার গেমার।

এই প্রযুক্তি একেবারেই নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এবার তারা উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এগুলোকে শক্তিশালী বিস্ফোরক বহন উপযোগী করে তুলেছে। এখন এই ড্রোনগুলো ইসরায়েলের শক্তিশালী মারকাভা ট্যাংকের জন্যও বড় বিপদ। ভাগ্যবশত, ড্রোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিজবুল্লাহর কাছে আগে থেকেই মজুত ছিল।

২০২৪ সালে হিজবুল্লাহ ‘আলমাস-১’ নামের একটি আধুনিক ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। তারা মূলত একটি ভূপাতিত ইসরায়েলি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের অনুকরণে এটি তৈরি করেছিল। কিন্তু সেটির ফাইবার অপটিক কেবলের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার। তাই সীমান্ত সংঘর্ষে এটি খুব একটা কাজে লাগেনি। ২০২৬ সালের যুদ্ধে লড়াই যখন লেবাননের মাটির ভেতরে চলে আসে, তখন এই রেঞ্জের সমস্যাটি আর রইল না। আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য রাখা বিপুল পরিমাণ ফাইবার অপটিক কেবল তখন এফপিভি ড্রোনে ব্যবহার করা শুরু হয়।

হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলে, ‘দলটি আগে ইসরায়েলের সঙ্গে লড়াইয়ে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এখন তারা কৌশল বদলে প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছে। ড্রোনের ব্যবস্থাপনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।’

কাগজে-কলমে ১৬ এপ্রিল থেকে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চলছে। কিন্তু বাস্তবে সীমান্তে বিচ্ছিন্ন হামলা থামেনি। লেবানন সরকার মার্কিন-ইসরায়েলি ও ইরান সংঘাতের প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার চেষ্টা করছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি মূলত ইরানের হুমকিতেই টিকে রয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে হরমুজ প্রণালীতে ইসরায়েলি ও মার্কিন জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। দক্ষিণ লেবাননে জনজীবন কবে স্বাভাবিক হবে, তা কেউ জানে না। হিজবুল্লাহ এবং লেবাননের কর্মকর্তাদের ধারণা, এটি যুদ্ধের অবসান নয়, কেবল একটি সাময়িক বিরতি মাত্র।

শিয়াদের মনে সংশয় ও অসন্তোষ

লেবানন ও ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী এলাকার পরিবেশটা একটু অন্যরকম। লেবাননের দিকে তাকালে চোখে পড়বে লেবু আর তামাকের খেত। প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় তৈরি লাল ইটের সুন্দর সুন্দর ভিলা। অন্যদিকে দক্ষিণ সীমান্তে ইসরায়েলের বাড়িঘর আর ফসলি জমিগুলো একেবারে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো। পাহাড়ের উঁচুতে দাঁড়িয়ে দুই দেশের বাসিন্দারাই সীমানার ওপারে থাকা মানুষের প্রাত্যহিক জীবন দেখতে পারেন। এই দুই ভূখণ্ড যেন জমজ ভাই। কিন্তু ফিলিস্তিন বিপর্যয়ের পর আজ তাদের পরিচয় ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে।

এই অঞ্চলেই হিজবুল্লাহর প্রথম সদস্যরা এবং মূল সমর্থকেরা গড়ে উঠেছিলেন। আশির দশকে ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখে বাস্তুচ্যুত শিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ আমাল আন্দোলন ছেড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাকে হিজবুল্লাহতে যোগ দিয়েছিলেন। আজ এই মানুষগুলোই হিজবুল্লাহর বিগত দুটি যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে দলটির প্রতি তাদের পুরোনো আস্থা ও চুক্তি এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ছয় লাখ মানুষ এখনও গৃহহীন। গাজার মতো লেবাননেও শহর ও গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার নীতি নিয়েছে ইসরায়েল। ফলে বহু মানুষের ঘরবাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ। দলটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ‘শিয়া সমাজের ভেতরে এখন হিজবুল্লাহ নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।’

এমনকি দাহিহার কবরস্থানে নিহত যোদ্ধাদের স্বজনদের মুখেও চাপা ক্ষোভের কথা শোনা যায়। যেখানে এক একটি কবরে চারজন পর্যন্ত যোদ্ধার লাশ দাফন করা হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে স্বজনরা নীরবে কাঁদছেন। কবরস্থানে আসা এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুদের শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। কিন্তু যা কিছু ঘটেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’

৭৫ থেকে ৯০-এর দশকের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর শিয়া সম্প্রদায় এত বড় সংকটে আর কখনও পড়েনি। গাজা যুদ্ধে হিজবুল্লাহ সীমিত ভূমিকার প্রতি অনেকের সমর্থন থাকলেও মার্চে ইসরায়েলের ওপর তাদের হামলা করার সিদ্ধান্ত অনেককেই ক্ষুব্ধ করেছে। হিজবুল্লাহর ঘোর বিরোধী দলগুলোও এতে অবাক হয়েছে। লেবাননের উপপ্রধানমন্ত্রী তারেক মিত্রির ভাষায়, ‘এটি এমন এক যুদ্ধ, যা লেবাননের জনগণ কখনই চায়নি।’

তবে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ নেতা নওয়াফ মুসাভি মনে করেন, কেবল আলোচনার মাধ্যমে ইসরায়েলকে লেবানন থেকে তাড়ানো অসম্ভব। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহকে দোষারোপ করা মূলত একটি অপপ্রচার। তিনি বলেন, ‘দখলদারিত্ব যে আসল সমস্যা, তা আড়াল করে প্রতিরোধকারীদের খলনায়ক বানানোর চেষ্টা চলছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘ধরে নিলাম হিজবুল্লাহ নেই। তবুও লেবাননের ভূমি মুক্ত করার জন্য অন্য কোনো সংগঠন তৈরি হত। তখন শত্রু পক্ষ তাদেরও একই উপাধিতে ভূষিত করত।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো, লাখ লাখ শিয়া এখনও গৃহহীন। আলোচনা বা শক্তি প্রদর্শন কোনো উপায়েই তাদের ঘরে ফেরানো সম্ভব হয়নি। এর ওপর হিজবুল্লাহ আগের মতো সমাজকল্যাণমূলক সেবা দিতে পারছে না। তীব্র আর্থিক সংকট এবং সামরিক খাতে সমস্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়ায় সামাজিক কাজে তাদের তহবিল কমে গেছে।

একটি সূত্র জানায়, ‘আগে দলটির পক্ষ থেকে ঘর ভাড়া বা পুনর্বাসনের টাকা দেওয়া হত। এখন তা বন্ধ। সিরিয়া দিয়ে স্থলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় এই দশা হয়েছে। এখন শিয়াদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দাতব্য উদ্যোগের মাধ্যমেই এই অভাব মেটানোর চেষ্টা চলছে।’

এই ক্ষোভ ভবিষ্যতে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো বড় শিয়া রাজনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ইসরায়েল যখন দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের ‘শিয়া শত্রু’ হিসেবে অভিহিত করে নির্বিচারে হামলা চালায়, তখন সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষোভ ভুলে আবার হিজবুল্লাহর ছায়াতলে এসে আশ্রয় নেয়। এর ওপর লেবাননের অন্য ধর্মের কিছু দল ও নেতার শিয়াদের প্রতি চরম অনীহা এবং হিজবুল্লাহ পতনে আনন্দ প্রকাশ শিয়াদের নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়।

‘শিয়াদের মনে এখন টিকে থাকার ভয় কাজ করছে,’ বলেন হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক। তিনি স্পিকার নাবিহ বেরির দল আমাল আন্দোলনের সাম্প্রতিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাল মতাদর্শগতভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ নয়। কিন্তু খামেনির মৃত্যুতে নাবিহ বেরি আমাল ও ইরানের কৌশলগত অংশীদারত্বের কথা বলেছেন। এটি কেবল কথার কথা ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত আলাপে হয়তো তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তবে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বড় কোনো গণজোয়ার বা নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণ আমরা এখনও দেখতে পাচ্ছি না।’

আজকের হিজবুল্লাহ ও ট্রাম্পের মরিয়া চেষ্টা

২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহ এখন কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে? তাদের সামরিক পুনর্গঠন কিছুটা কার্যকর হলেও দলটির সামগ্রিক সামরিক শক্তি আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। দুটি যুদ্ধে হিজবুল্লাহ কতজন নিহত হয়েছেন, তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে দলীয় সূত্রগুলো ধারণা করছে, এই সংখ্যা চার হাজার থেকে দশ হাজারের মধ্যে হতে পারে। এর বড় অংশই মারা গেছেন ২০২৪ সালের হামলায়।

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেন, ‘২০২৩ সালের সেই শক্তিশালী দল এখন আর নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘হিজবুল্লাহর একসময় বিশাল রকেট বহর ছিল। সীমান্তজুড়ে তাদের উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি ছিল। আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত এক সরবরাহ পথ ছিল তাদের।’ ইসরায়েলের গালিলি অঞ্চল জয় করার পুরোনো স্বপ্ন এখন ধূসর অতীত। দলের স্লোগান এখন জেরুজালেম মুক্ত করা নয়, বরং নিজেদের মাতৃভূমি লেবাননকে রক্ষা করা।

তবে এত ঝড়ঝাপটার মধ্যেও দলটির বর্তমান নেতৃত্ব বেশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। নাইম কাসেম যখন দলের মহাসচিব হন, তখন অনেকেই তাকে নিয়ে উপহাস করেছিলেন। নাসরুল্লাহর মতো জনমোহিনী ব্যক্তিত্ব বা সাফিউদ্দিনের মতো আধ্যাত্মিক প্রভাব তার নেই। তা সত্ত্বেও তিনি চরম সংকটে হিজবুল্লাহর হাল ধরেছেন। ইসরায়েলের নিয়মিত হত্যাচেষ্টা এড়িয়ে তিনি সংগঠনটিকে সুসংগঠিত রাখছেন।

কাসেম চলতি বছরের শুরুতে দলে একটি বড় ধরনের রদবদল ঘটান। অনেক প্রভাবশালী নেতাকে সরিয়ে তিনি নিজের পছন্দের লোক বসিয়েছেন। পুরো প্রক্রিয়াটি কোনো বড় ঝামেলা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। দলটির রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘কাসেমের ব্যক্তিত্ব নিয়ে যত কথাই থাকুক না কেন, এই ক্রান্তিকালে তিনি সংগঠনটিকে নতুন রূপ দিয়েছেন।’ তিনি প্রমাণ করেছেন যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শক্ত হাতে হাল ধরা সম্ভব।

যদিও প্রায় সব জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন, তবে নাইম কাসেম বা মোহাম্মদ রাদের মতো প্রথম প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতারা এখনো অক্ষত আছেন। একই সঙ্গে হাসান ফাদলুল্লাহর মতো দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতারা এখন বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। নওয়াফ মুসাভি বলেন, ‘যেহেতু আমরা একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন, তাই প্রতিটি পদের জন্যই আমাদের বিকল্প লোক প্রস্তুত রাখতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের অনেক নেতা হয়তো শহীদ হয়েছেন। কিন্তু প্রতিরোধ থামেনি।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইসরায়েলিদের কাছে আমাদের পুরোনো প্রজন্মের নেতাদের সমস্ত তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তাদের লড়তে হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজন্মের সঙ্গে, যাদের তারা চেনে না।’

হিজবুল্লাহর এই দুর্বলতার সুযোগে অনেকেই ভাবতে পারেন যে ইরান হয়তো তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু সূত্রগুলো বলছে, লেবাননের মাটিতে বর্তমানে ইরানি সামরিক উপদেষ্টাদের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কম। সিরিয়া পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিমান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ইরানি কর্মকর্তাদের যাতায়াত কমে গেছে। বর্তমানে ইরানিদের উপস্থিতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্তরে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ এখন সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। এক পর্যবেক্ষক মনে করেন, হিজবুল্লাহ ও এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দেনদরবারের ওপর। ইরান যুদ্ধ হিজবুল্লাহর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক আরও মজুবত করেছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, লেবানন সংকটের সমাধান না হলে তারা কোনো চুক্তিতে যাবে না।

পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক দৃশ্যপট

লেবানন সরকারের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে। ২ মার্চের রকেট হামলা, প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের হিজবুল্লাহর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা এবং প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের ইসরায়েলপন্থি অবস্থান দলটিকে সরকার থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ২০২৪ সালের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে এই আলোচনাও শুরু হয়েছিল যে, তারা কি অস্ত্র ছেড়ে কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে?

হিজবুল্লাহ এখন লেবাননের পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল এবং দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। একসময়ের সমাজ বা শাসনব্যবস্থা বিরোধী দলটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা এমন অনেক সমঝোতা করেছে, যা তারা অতীতে ঘৃণা করত। ২০১৯ সালের গণবিক্ষোভের সময় হিজবুল্লাহ বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে মাঠে নেমেছিল। আন্দোলনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে তারা নিজেদের সমর্থকদের বিক্ষোভকারীদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, হিজবুল্লাহ আবারও বদলে যেতে পারে। ‘দলটির ভেতরে নীরবে অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে যুদ্ধের এই উত্তপ্ত মুহূর্তে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়,’ এক সূত্র জানায়। ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাসেমের কোনো অনমনীয় অবস্থান বা রেড লাইন নেই।’

তবে দলের ভেতরে এমন অনেকেই আছেন, পশ্চিমা বা লেবানন সরকারের কাছে মাথা নত করা বা অস্ত্র ছাড়ার চরম বিরোধী। দলটির একজন কর্মী বলেন, ‘এটি আমার ব্যক্তিগত মত। আমার মনে হয় হিজবুল্লাহ আবার আশির দশকের সেই চরমপন্থি রূপে ফিরে যাওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে তা এখন আর সহজ নয়। আমরা এখন লেবানিজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছি।’

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ইসরায়েল ও কিছু পশ্চিমা দেশ লেবাননের সেনাবাহিনীকে হিজবুল্লাহ মুখোমুখি দাঁড়াতে বলছে। অনেক লেবানিজের ভয়, এতে দেশটিতে নতুন করে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। সম্প্রতি ব্রিটিশ সাময়িকী 'দি ইকোনমিস্ট'-ও লেবানন সেনাবাহিনীকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সাময়িকীটি লিখেছিল, ‘ভয় থাকা স্বাভাবিক। তবে নিষ্ক্রিয়তার কোনো অজুহাত চলে না। সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে।’

তারেক মিত্রির মতে, ইসরায়েলিরা হয়তো গৃহযুদ্ধ দেখেই খুশি হবে। তবে লেবানন সেনাবাহিনী বা হিজবুল্লাহ কেউই এই ফাঁদে পা দিতে চায় না। নওয়াফ মুসাভি বলেন, ‘লেবাননে এমন কেউ নেই যে দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়া প্রতিরোধ বাহিনীর ওপর অস্ত্র তোলার সাহস দেখাবে। তেমন কিছু হলে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই তারা নিজেরা ধ্বংস হয়ে যাবে।’

শত আঘাত আর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার নানা গুজবের পরও হিজবুল্লাহ ও প্রতিরোধ অক্ষ এখনো টিকে আছে। তারা এখনও সশস্ত্র ও প্রভাবশালী। লেবাননের মাটিতে ইসরায়েলি সৈন্যদের উপস্থিতির মুখে তারা এক নতুন ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি, যা নেতানিয়াহু নিজেই উপহাস করেছেন, হিজবুল্লাহকে এক ধরনের রাজনৈতিক স্বস্তি এনে দিয়েছে। একটি সূত্র জানায়, ‘এই চুক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হিজবুল্লাহ সরকারের সমালোচনা করছে, যা তাদের অবস্থানকে মজুত করেছে।’

হিজবুল্লাহ এখনও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এমনকি মার্কিন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসও তাদের এড়িয়ে চলতে পারছে না। হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র ও লেবাননের একজন কূটনীতিক জানান, সম্প্রতি এক যুদ্ধবিরতি আলোচনার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তিনি ওয়াশিংটনে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূতকে সরাসরি ফোন করে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের নাম্বার চান।

এক সূত্র দাবি করে, ‘রাষ্ট্রদ্বতের ফোনের পর লেবাননের কর্মকর্তারা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা হিজবুল্লাহর নাম্বার খুঁজতে শুরু করেন। পরিচিত শিয়া সম্প্রদায়ের লোক থেকে শুরু করে সাধারণ শিয়া আলেমদেরও ফোন করতে থাকেন। তারা ট্রাম্পের জন্য একটি যোগাযোগের নাম্বার জোগাড় করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।’ তবে ওই তিনটি সূত্রই নিশ্চিত করেছে যে শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিল হিজবুল্লাহ।


লেখক পরিচিতি:

ড্যানিয়েল হিলটন

ড্যানিয়েল হিলটন মিডল ইস্ট আই-এর স্পেশাল করেসপনডেন্ট এবং সংস্থাটির প্রাক্তন হেড অব নিউজ। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাংবাদিকতা করেছেন; যার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে রয়েছে সুদান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং পশ্চিম সাহারা।

অ্যাডাম শামসেদ্দিন

অ্যাডাম শামসেদ্দিন বৈরুতভিত্তিক একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং বাদিল পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অ্যাডভাইজার। মিডল ইস্ট আই-এর নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি পূর্বে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর হয়ে প্রতিবেদন করেছেন এবং ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ অবদান রেখেছেন। এছাড়া তিনি লেবাননের আল-জাদিদ টিভির সিনিয়র করেসপনডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের দুর্নীতি প্রকাশ করেছিল।